ত্রি বঙ্গাশ্চর্য পরিচয়

নাম উল্লেখ করব না। নাম উল্লেখ করার বিপদ না থাকুক একটা অন্যরকম সমস্যা আছে। কাউকে নাম ধরে কিছু বললে মানুষ মনে করতে পারে তার সঙ্গে লেখকের একটা বিরোধ আছে, তাই তিনি সংবাদপত্রের পাতায় ঝাল প্রকাশ করতে উদ্যত হয়েছেন। তারপরেও এ রচনায় কিছু ভদ্রলোকের প্রসঙ্গ আসবে। আমার এ রচনাটি পাঠ করলে পাঠক ভদ্রমহোদয় এবং মহিলারা তাদের চিনে নিতে পারবেন।

আমি জনপ্রিয় লেখক নই। সুতরাং এই লেখা পাঠ করে কোন কোন পাঠক-পাঠিকা মনে করতে পারেন, নিজের মনের সুপ্ত ঈর্ষাবৃত্তি চরিতার্থ করার জন্য অপরকে দোষারোপ করছেন। এধরনের কথা যদি ওঠে, আমি প্রতিবাদ করব না। মানুষ তো কতগুলো মনস্তাত্ত্বিক তাড়না দ্বারাই চালিত হয়ে থাকে। মনস্তত্ত্ববিদদের অনেকেই বলেন, তৈমুর লং খোড়া ছিলেন বলেই বিশ্বজয়ের পরিকল্পনা করেছিলেন। নেপোলিয়ন দেখতে খাটো ছিলেন বলেই তাঁর শারীরিক দৈর্ঘ্যের হ্রস্বতার পরিমাপে সমগ্র ইউরোপকে নোয়াতে চেয়েছিলেন। আমি পাঠকদের অপ্রিয় লেখক, সেই কারণটাই যদি এ রচনার মুখ্য হেতু হয়ে থাকে, আশা করি কারো কিছু বলবার থাকবে না। মানুষের কাজ করার পেছনে কোন না কোন কারণ বর্তমান থাকে। কাজটা যখন শেষ হয় লোকে ফল দিয়ে বিচার করে। কারণের কথা কেউ মনে রাখে না।

আপনারা দেখতে পাচ্ছেন একটুখানি ভণিতা করলাম। ভণিতার প্রয়োজন বোধ করেছি এ কারণে যে আপনি যখন কোদালকে কোদাল বলতে পারবেন না, বদমাশকে বদমাশ বলতে পারবেন না, অথচ ভাবাবেগটি প্রকাশ করতে হবে, তখনই এই ভণিতা বস্তুটি এসে পড়তে বাধ্য। ভণিতার আবার রকমফের আছে। একটা উল্লেখ করব। নাভিতে সর্ষের তেল দিয়ে ভারতচন্দ্র একবার কৃষ্ণনগরে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের চণ্ডীমণ্ডপে চিৎ হয়ে নিদ্রা দিচ্ছিলেন। সেই সময়ে দেবী অন্নপূর্ণা স্বপ্নে দর্শন দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, বাবা ভারত, তুমি কী কর? ভারতচন্দ্র  বললেন, মা আমার কাজ দুইটা। এক, রাজার তোষামোদী করা, আর বেলাবেলি নিদ্রা দেয়া। দেবী বললেন, রাজানুগ্রহ মন্দ জিনিস নয়, ওই বস্তু পেতে হলে তোমাকে তোষামোদী করতেই হবে। কিন্তু বাবা যখন তখন নিদ্রা দেয়াটা ভাল কাজ নয়। কথাটা ভেবে দেখবে। ভারত বললেন, মা, আমি মদ-গাঁজা খাই না, রেণ্ডি বাড়ি যাই না, এই যে বিপুল অফুরন্ত সময় আমার সামনে পড়ে আছে, সেটা যাপন করব কিভাবে! দেবী বললেন, ভারত তুমি বোকা, কিভাবে সময় ভক্ষণ করবে এটা জান না, এত বয়স হল। ভারতচন্দ্র বললেন, মা, এত বয়সে যখন জানা হয়নি, ভবিষ্যতেও জানা হবে না। তুমি যখন অনুগ্রহ করে সন্তান সম্বোধন করছ, দয়া করে বলে দাও আমাকে কী কাজ করতে হবে।

দেবী তুষ্ট হয়ে বললেন, বেটা,  তুমি আমার মনের গহন কথাটি ধরে ফেলেছ। এই বঙ্গভূমিতে তুমি আমার পূজার প্রচলন কর। ভারত বললেন, মা, সেটি হবার নয়। তুমি তো ভাল করেই জান আমি পূজারী বামুন নই, আমি কী করে পূজার প্রচলন করব। দেবী বললেন, ভারত, তোমার বোকামি গেল না। তুমি আমার নামে ভক্তিরস মিশিয়ে কেতাব লেখ। পূজা আপনি চালু হবে। একটু বেশিই বলে ফেললাম। তোমার পক্ষে নির্ভেজাল ভক্তিরস সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। কারণ নবদ্বীপের নাগর সমাজে এটি খুব সুলভ বস্তু নয়, তবে তোমার ক্ষমতা আছে। আমি জানি তুমি কেতাব লিখতে গেলে আরবি-ফারসি আসবে, খিস্তি-খেউর আসবে, তুমি জিলিপি খেতে যে রকম পছন্দ কর, তারও চাইতে বেশি পছন্দ কর অশ্লীলতা। এই বস্তু তুমি বাদ দিতে পারবে না, তথাপি তোমার শক্তির প্রতি অগাধ আস্থা আছে। তুমি লিখে যাও, লিখলে আমার পূজা আপনিই চালু হবে।

ভারতচন্দ্র এ যুগে জন্মালে কী রকম ভণিতা করতেন বলতে পারব না। আগের যুগে জন্মেছিলেন বলে ভিন্ন রকম ভণিতা লিখেছিলেন। কৃত্তিবাস, কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম, আলাওল সকলেই তাঁদের কাব্যের ভণিতা রেখে গেছেন। ভণিতার গীত গাইতে গেলে আমার বক্তব্য বিষয়টি বলা হবে না।

আমার কথায় চলে আসি। আমাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের তিনটি আশ্চর্য জিনিসের নাম করুন দেখি। কেউ আমাকে এ পর্যন্ত জিজ্ঞেস করেনি। তাই বলাও হয়নি। কথাটা হরিণশিশুর শিঙের মত মনের মধ্যে গুতো দিচ্ছে, তাই ফাঁস করতে যাচ্ছি।

আমার বিচারে স্বাধীন বাংলাদেশের সর্বোত্তম আশ্চর্য বস্তু হল হযরত মাওলানা আলহাজ্ব দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী। তাঁকে কী কারণে এ দুর্লভ সম্মানে ভূষিত করতে হল সেটা একটু ব্যাখ্যা করার দাবি রাখে। গত ফাল্গুনে আমি গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখি আমার ভাতৃবধূ কে-টু সিগারেট পান করছেন এবং ক্যাসেটে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী সাহেবের মিলাদ শুনছেন। আমার বাবা-মা যদ্দিন বেঁচেছিলেন ওই মহিলাকে জোর করে একবারও নামাযের পাটিতে দাঁড় করাতে পারেননি। আমার ভাইও অনেক চেষ্টা করে ক্ষান্ত দিয়েছিলেন। আমি দেখলাম হযরত সাঈদী এই মহিলার অন্তরে ধর্মপিপাসা জাগ্রত করতে সক্ষম হয়েছেন। তারপরেও যদি তাঁর প্রতিভার স্বীকৃতি দিতে আমি রাজি না হই, নিজের উৎকৃষ্ট অংশের প্রতি আমি অবিচার করব। ভাবীর এই রূপান্তর দেখে আমি নিজেও হযরতের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছি। তার কারণ আছে। অন্য মাওলানার মিলাদ আমি শুনেছি। তাঁরা ধর্মকথা পুণ্যকথা বলেন। কিন্তু সেগুলো বোরিং লাগে। মাওলানা সাঈদীর ক্যাসেট যখন শুনলাম, বুঝতে পারলাম মিলাদ কাকে বলে। এখনে ধর্ম অর্থ মোক্ষ কাম সব মল। হযরত সাঈদী যদি গান করতেন, মাইকেল জ্যাকসনের কাছাকাছি পৌঁছুতেন। অভিনয় করলে ছবি বিশ্বাসকে ছাড়িয়ে যেতেন। নাচ করলে বুলবুল চৌধুরীর রেকর্ড ম্লান হয়ে যেত। নাচ গান অভিনয় এবং তার ওপর ধর্মকথা এই একের ভেতর চার তিনি সমন্বয় করেছেন। তাঁকে কী করে আমি সামান্য মানুষ বলব, সুতরাং বরণীয় স্মরণীয়দের তালিকায় আমি সাঈদী সাহেবকে একটা জায়গা দিয়ে বসে আছি।

একটা আশ্চর্য বস্তুর কথা বললাম। এখন দ্বিতীয়টিতে আসি। সেটা হল টঙ্গির তুরাগ নদীর পাড়ের তাবলিগ জামাত। এইবার পত্র-পত্রিকার হিসাবে পঞ্চাশ লক্ষ লোক সমাগম ঘটেছিল। অর্থাৎ হজ্বের তিনগুণ। এর একটি বিরাট অংশ এসেছে দুনিয়ার নানা মুসলিম দেশ থেকে। ভবিষ্যতে যদি এই বিদেশাগত অতিথিদের ওপর ট্যাক্স ধার্য করি এবং এই পুণ্যতীর্থে আসার জন্য কিঞ্চিৎ দক্ষিণা আমরা দাবি করি, আশা করি উম্মাহভক্ত মুসলমান ভাইরা সেটা দিতে রাজি হবেন। সৌদি আরব তেল পাওয়ার আগে হাজী দোহন করে সংবৎসরের জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ করত। আমাদের সামনে সে রকম একটি সুবর্ণ সুযোগ সমাগত, আমরা চিংড়ি, পোশাক — এইসব রফতানি করে কিছু টাকা ঘরে আনছি। আমার ধারণা ধর্মপ্রাণ মুসলমান ভাইদের নিমন্ত্রণ করে এনে তারও চাইতে বেশি টাকা পয়সা আয় করতে পারব। স্বাধীন সার্বভৌম ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের সব চাইতে বড় কীর্তি হল এই তাবলীগ জামাত। জনান্তিকে কিন্তু একটা কথা বলে রাখব। ধর্মপ্রাণ মুসলমান ভাইরা যেন আমার ওপর অনর্থক চটে না যান। আমি বাংলাদেশের বড় ঘটনা হিসেবে তাবলীগ জামাতের এই আশ্চর্য কীর্তির কথা ঘোষণা করলাম। স্বাধীন বাংলাদেশের শেখ মুজিবের মৃত্যু ছাড়া এর চেয়ে বড় ঘটনা ঘটেনি।

দুটো আশ্চর্য বিষয়ের কথা বিবৃত করলাম। এখন তৃতীয় বিষয়ে আসি। এটা একটু বিব্রতকর। কারণ এই বিষয়টির সঙ্গে আমার পেশার প্রত্যক্ষ না হলেও একটা নেপথ্য যোগাযোগ রয়েছে। তবু বলে ফেলি। কম তাৎপর্যসম্পন্ন হালের তৃতীয় আশ্চর্য বিষয়টি হল আমাদের তিন-চারজন লেখক। এই রচনার শুরুতেই পাঠককে প্রতিশ্র“তি দিয়েছি তাদের নাম উল্লেখ করব না। এখন দেখছি কাজটা ভাল করেছি। কারণ এই লেখকদের প্রতি পাঠক-সাধারণের যে আকর্ষণ, যে ভক্তি-শ্রদ্ধা রয়েছে, সেটা যদি আমি জখম করি তাহলে আল্লার দরবারে গোনাহগার বান্দা হিসেবে চিহ্নিত হব। আমি লিখে দুধভাত না হোক অন্তত নুনভাত তো খাচ্ছি। যখন দেখতে পাই আমার পেশার কোন ব্যক্তি নিজ নিজ প্রতিভাবলে দেশের চিত্ত জয় করেছেন সেটা আমারও গৌরবের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাঁরা শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথের সত্তরতম জন্মবার্ষিকীতে যে অভিনন্দনপত্রটি রচনা করেছিলেন তার বয়ান ছিল এই রকম — কবিগুরু তোমার দিকে চাহিয়া আমাদের বিস্ময়ের অবধি নাই। বাণীর দেউল আজি গগন স্পর্শ করিয়াছে। ইহার নির্মাণকল্পে কত কবি কত শিল্পী কত সাহিত্যিক যুগ যুগ ধরিয়া অর্ঘ্যসম্ভার বহন করিয়া আসিয়াছে। তোমার সাধনার মধ্যে তাহাদের সকলের সাধনা পূর্ণতা লাভ করিয়াছে। তোমাকে প্রণাম করিতে গিয়া তাঁহাদের সকলকে প্রণাম করিতেছি।

আমার মত প্রায় ব্যর্থ লেখক, যারা লিখে উজ্জ্বলভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন পণ্ডিত রামনারায়ণ তর্কালঙ্কারের সময় থেকে দেখে আসছিল, তার ফলবান প্রকাশ ঘটেছে আমাদের এই প্রিয় দেশটির তিন-চারজন কীর্তিমান লেখকের অঘটনঘটনপটিয়সী উৎপাদন ক্ষমতার মধ্যে। সুতরাং তাদের প্রতি যুক্ত করে যদি সালাম নিবেদন না করি, আমরা নিজের উপরই অবিচার করব এরকম আশঙ্কা জাগে। পাঠক-পাঠিকা ভাইবোনেরা, আপনারা যদি কখনো বাংলাবাজার যান, আমি কেন শ্রদ্ধা নিবেদন করছি তার কারণটি নিজের চোখে দেখতে পাবেন। একটি কিংবদন্তী আছে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলে একজন মানুষ বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতিকে পৃথিবীর চূড়ায় দাঁড় করাতে পেরেছিলেন। হালের এই তিন-চারজন লেখক রবীন্দ্রনাথের বিচরণক্ষেত্রটি একেবারে সংকুচিত করে দাড়িঅলা ছবিটি কাঁচের ফ্রেমের মধ্যে আটকে ফেলতে সক্ষম হয়েছেন। এখন বাংলাবাজারে আপনি যদি রবীন্দ্রনাথ কিংবা অন্য কোন বড় লেখকের নাম উচ্চারণ করেন প্রকাশকরা আপনাকে মৃত্যুদণ্ড দিতে তেড়ে আসবেন। বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার অনেক দুর্নাম আছে। তথাপি প্রকাশকদের হাতে মৃত্যুদণ্ড দানের ক্ষমতাটি দেওয়া হয়নি বলে অনেক পাঠক পৈতৃক প্রাণটা বাঁচাতে সক্ষম হন। এই লেখকদের একচ্ছত্র প্রতাপ-প্রতিপত্তির কীর্তন করার ক্ষমতা আমার কলমের থাকার কথা নয়। কেননা আমিও তো লেখক। গুণকীর্তন করতে গেলে ঈর্ষার ভাবটি আপনি এসে পড়ে।

আবেগ অনুভূতি যথাসম্ভব চাপা দিয়ে এঁদের মাহাত্ম্যের কথাটি প্রকাশ করা আমার একটি কর্তব্য। এঁদের পারঙ্গমতার কথা আর কী বলব। তরুণ তরুণ বাচ্চা ছেলেরা সংবাদপত্রে চিঠিপত্র প্রকাশ করেন। অমুক লেখন ভাই, দেশে বন্যা হচ্ছে, খরা হচ্ছে, আপনি এ দিকটা দেখবেন। আল্লাহতালার কাছে লোকে যে সমস্ত আবদার অনুরোধ করতে সাহস পায় না, সে সকল দাবি ওই লেখকদের কাছে করা হয়। আমরা একটা অপূর্ব যুগে বাস করছি। এ সময়ে বাংলাদেশে অনেক আশ্চর্য ঘটনা ঘটে গেছে। তার অনেকগুলোই প্রচারযন্ত্রের কল্যাণে আপনারা জানতে পেরেছেন। আপনারা জেনেছেন, খলিলুল্লাহ নামের এক তরুণ মরা মানুষের কলিজা ভক্ষণ করে। মাদারীপুরে আবু নসর মিয়ার কাঁঠাল গাছে খেজুরের রস পাওয়া যাচ্ছে। ফরিদপুরে রিকশাচালকের চার বৎসরের ছাওয়ালের জননেন্দ্রিয়ের দৈর্ঘ্য গিনেস বুকে রেকর্ড করা হয়েছে। এক ভদ্রমহিলা একটি ক্লিনিকে একসঙ্গে সাতটি বাচ্চা প্রসব করেছেন। সংবাদপত্রে আরো প্রকাশ, সুদখোরের কবর ফেটে লকলকে আগুনের শিখা জ্বলে উঠেছে এবং তিনজন মাওলানা সেই দৃশ্য অবলোকন করেছেন। তাঁরা এখন আসন্ন কেয়ামতের কথা ঘোষণা করে যাচ্ছেন। এই সমস্ত ঘটনা ঘটেছে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশে। যেখানে প্রভাতকালে শাপলা-পদ্ম ইত্যাকার পুষ্প আকাশের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকে। বাংলাদেশের এই যে নানাবিধ সম্ভাবনা নানা আলামতের মধ্য দিয়ে প্রকাশমান হচ্ছে, তার মূর্ত প্রকাশ ঘটছে আমাদের এই লেখকদের রচনায়। এঁদের সবচাইতে বড় কৃতিত্ব লেখার ভাববস্তু এবং কথাবস্তুর মধ্যে ফারাক চিহ্নটা মুছে ফেলতে পেরেছেন। আজকের দিনের ফিজিক্সে যেমন বস্তু এবং ভাবের ভেদরেখা ঘুচে গেছে তেমনি, এই লেখকেরা সাহিত্যের সঙ্গে বাংলাদেশের যেসব আশ্চর্য অবিশ্বাস্য ঘটনারাজি ঘটেছে তার চমৎকার মিশেল দিতে পেরেছেন। এই ধরনের ব্যাপার ইতোপূর্বে আর কখনো ঘটেনি। সাঈদী সাহেব যে পরিমাণ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন, দেশে সাক্ষর জনসংখ্যা শতকরা একশ ভাগ হলে এরকম একেকটি আসন এইসব লেখকরাও দখল করে নিতে পারতেন। পরিতাপের কথা হল দেশটির আশি ভাগ লোক মূর্খ এবং বর্ণপরিচয়হীন। মূর্খ থাকাটা দুঃখের কথা নয়। কিন্তু মূর্খ থাকার কারণে যে তাঁরা আমাদের এই প্রতিভাশালী লেখকদের কথামৃত পাঠ করা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, সেটাই জাতির মস্ত বড় লোকসান। পাঠক-পাঠিকা ভাই-বোনেরা, ইতিহাসে কখনো কখনো আশ্চর্য সময় আসে, যখন অদ্ভুতকর্মা মানুষেরা জন্মগ্রহণ করতে থাকেন। আমাদের দেশে সেই সময়টি এসে গেছে। আমি যথেষ্ট ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি হলে বলতাম, হযরত ইমাম মেহেদী সাহেব একা নন, দলে বলে আমাদের বঙ্গভূমিতে অবতীর্ণ হয়েছেন। তাঁদের কেরামত এত অধিক যে মাতৃজঠরের শিশুকেও তারা মুরিদ বানিয়ে ফেলতে পারছেন। উল্লেখ করেছি, দেশটি অশিক্ষিত, তাই আমাদের সমাজে এই লেখকদের চিন্তা-চেতনা ক্রিয়াশীল হতে পারছে না। পাঠক-পাঠিকা ভাইবোনেরা আসল গল্পটা করা হল না। যতটুকু বিবৃত করলাম তাতে ব্যর্থ লেখকের কৃতিত্ব এই, হযরত মাওলানা সাঈদী, তুরাগ পাড়ের অভূতপূর্ব জনসমাগম এবং অদ্ভুতকর্মা লেখকদের আমি যুগলক্ষণ হিসেবে দেখিতে পেরেছি। আগামীতে যদি কোনদিন…।

(সূত্র: নূরুল আনোয়ার সম্পাদিত, আহমদ ছফা রচনাবলি, ৫ম খণ্ড, পৃ. ১৯৮-২০২)
পুনর্মুদ্রণ: সর্বজন, বুলেটিন ২৬, ৬ মার্চ ২০১৩

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*