বাঙ্গালি মুসলমানের মন (মূল পাঠ ১৯৭৬) — ৩

মুসলমান সমাজের কোন অংশের সামাজিক চাহিদা পূরণ করার জন্য এই পুঁথিসমূহ লেখা হয়েছিল এবং যাঁরা লিখেছিলেন তাঁদের বিদ্যাবত্তা এবং সাংস্কৃতিক অগ্রগতি কতদূর ছিল তলিয়ে বিচার করলে কতিপয় বিষয় স্পষ্টভাবে ধরা পড়বে। মূলত বাঙ্গালি সমাজের যে শ্রেণীটি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন এবং নতুন ধর্ম গ্রহণ করার কারণে—অধিকতর খোলাসা করে বলতে গেলে মুসলিম রাজশক্তি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার দরুন—যাদের মধ্যে নতুন আকাক্সক্ষার উন্মেষ ঘটেছিল সেই শ্রেণীটিতেই ছিল পুঁথিসাহিত্যের আদর সীমাবদ্ধ। তাঁরাই এর লেখক, পাঠক এবং সমঝদার। তাছাড়া রোসাঙ্গ ইত্যাদি রাজ দরবারে বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের যে চর্চা হয়েছে, তাতে যে সকল মুসলিম কবি-সাহিত্যিক আশাতিরিক্ত সাফল্য প্রদর্শন করেছেন জনগণের দৈনন্দিন জীবনধারার সঙ্গে তার সংযোগ খুব নিবিড় কিংবা গভীর ছিল না।

রাজসভার বিদ্যাবত্তা, মার্জিত রুচি, বিলাসবহুল জীবনযাত্রার ধরনই অধিকাংশ ক্ষেত্রে আলাওল প্রমুখ শক্তিমন্ত কবির কাব্য-ভাবনাকে নিয়ন্ত্রণ করেছিল। আর কবিরাও ছিলেন বহুদর্শী পণ্ডিত। আরবি, ফারসি এবং সংস্কৃত ভাষাতে ছিলেন সমান পারদর্শী। তাঁদের সাধনার মধ্যে কাব্যের ঔচিত্যবোধ জখম হয়নি বটে কিন্তু জনগণের জীবনধারার সমতলে এসে চাহিদামত কাব্যরচনা তাঁদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। জনগণের সঙ্গে অনেকটা সম্পর্কহীন জ্যোৎস্নাভুক সৌন্দর্যবিলাসী ছিলেন বলেই তাঁদের কাব্যের সামাজিক আদর্শ নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাতে হয়নি। আরবি, ফারসি থেকে যে কোন কাহিনী অনুবাদ করে রসসমৃদ্ধ ভাষায় প্রকাশ করতে পারলেই তাঁদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যেত এবং তাঁদের সে যোগ্যতায় ঘাটতি ছিল না।

দোভাষী পুঁথিলেখকদের সমস্যা ছিল ভিন্নরকম। তাঁরা ছিলেন একই সঙ্গে জনগণের শিল্পী এবং শিক্ষক। পুঁথিসমূহের অনেকগুলোর রচনার পেছনে সক্রিয় ছিল সামাজিক প্রয়োজন। এই প্রয়োজন পূর্ণভাবে পালন করার জন্য তিনটি উপাদান অপরিহার্যভাবে প্রয়োজনীয় ছিল। যে সামাজিক আদর্শটি তাঁরা প্রচার করেছিলেন সেই বিশেষ সমাজটির লোকসাধারণের সাংস্কৃতিক চেতনার মান বিমূর্তভাবে নতুন সামাজিক আদর্শ ধারণ করার মত মানসিক সাবালকত্ব অর্জন করেছে কিনা সে সম্বন্ধে একটা প্রাক-ধারণা, এবং পূর্বের শিল্পাদর্শের অগ্রসর ধারাটির বিষয়ে তাঁদের উপযুক্ত জ্ঞান, আর সেই ধারাটিকে সামাজিক প্রয়োজনের দিকে লক্ষ্য রেখে সম্পূর্ণ নতুন একটি খাতে প্রবাহিত করার ক্ষমতা ছিল কিনা—এই তিনটি মৌল বিষয়ের কোনটিই পর্যাপ্ত পরিমাণে পুঁথিলেখকদের সপক্ষে ছিল না। সামাজিক বীর এবং নায়ক সৃষ্টির মাধ্যমে ইসলাম ধর্মের মহিমাকীর্তন করার উদ্দেশ্যেই তাঁদের বেশির ভাগ কাব্যসাধনায় প্রবৃত্ত হয়েছিলেন। কিন্তু ইসলাম সম্বন্ধে তাদের জ্ঞান কিছু লোকশ্রুতি, জনশ্রুতি, আউলিয়া দরবেশদের অলৌকিক ক্রিয়াকাণ্ড ইত্যাদির মধ্যেই সীমিত ছিল।

আরবি ফারসি ভাষায় দখলের অভাবে অধিকাংশেরই মনে ইসলাম বলতে একটা পাঁচমিশালি ঝাপসা ধারণার সৃষ্টি হয়েছিল এবং তাঁদের রচিত সাহিত্যে সেই ধারণারই অভিব্যক্তি ঘটেছে। তাছাড়া যে সমাজের লোকসাধারণের কাছে [তাঁরা] নতুন ধর্মের সারল্য এবং সৌন্দর্য ব্যাখ্যা করছিলেন সেই সমাজটির মানসিক পরিসর অত্যন্ত সংকীর্ণ এবং সংকুচিত ছিল। কেননা নিম্নবর্ণের অধিকাংশ হিন্দুই যুগ যুগ ধরে আর্থিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে নিপীড়িত হওয়ার ফলে মুক্তির আশায় প্রথমে বৌদ্ধ এবং পরে ইসলাম ধর্ম কবুল করেন। নতুন ধর্ম গ্রহণ ছিল একটি নির্যাতিত মানবগোষ্ঠীর আত্মরক্ষার অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত একটা ব্যবহারিক পদক্ষেপ। সুতরাং পূর্ববর্তী সমাজেও যে গরিয়ান একটা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ছিল তারা তার মর্মমধু পান করা থেকেও বঞ্চিত ছিলেন। আবার ইসলামি সমাজ এবং সংস্কৃতির যে একটা উন্নত উদার আদর্শ ছিল ঐতিহাসিক কারণে তাও তারা অধিগত করতে পারেননি। এই অনগ্রসর জনসমাজ ইসলামের নামে যে সকল কাহিনী চাইতেন, সেই রকম কাহিনীই তাদের শোনাতে হত। আর পুঁথিলেখকরা ছিলেন এই জনগণেরই কণ্ঠ।

এই সকল কারণে বাঙ্গালি মুসলমান রচিত পুঁথিসাহিত্যে উদ্ভট রসের অতি বেশি ছড়াছড়ি। হিন্দু মহাকাব্য এবং পুরাণসমূহের বীরবীরাঙ্গনা চরিত্রের অপভ্রংশ মুসলিম কবিদের সৃষ্ট বীরদের মধ্যে নতুন করে জীবনলাভ করেছে। তাই পুঁথিসাহিত্যে অগ্রসরমানতার চাইতে প্রতিক্রিয়ার জের অধিক। মনের হীনম্মন্যতাবোধ থেকেই এই প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি। এর পেছনে একগুচ্ছ ঐতিহাসিক কারণ বর্তমান। মুসলমান পুঁথিলেখকেরা সচেতনভাবে এক সামাজিক আদর্শ থেকে বেরিয়ে এসে আরেক সামাজিক আদর্শ, একটি শিল্পাদর্শের বদলে আরেকটি শিল্পাদর্শ নির্মাণের প্রয়াস গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু নতুন শিল্পাদর্শটির চেহারা কি রকম হবে, জীবনের কোন মূল্যচেতনার বাহন হবে, অতীতের কতদূর গ্রহণ করবে, কতদূর বর্জন করবে সে সম্বন্ধে তাঁদের মনে কোন পরিচ্ছন্ন ধারণা ছিল না। তাই তাঁরা অনেক সময় বহিরঙ্গের দিক দিয়ে নতুন সৃষ্টি করলেও আসলে তা ছিল গলিত অতীতেরই রকমফের।

উপলব্ধির বদলে বিক্ষোভ, পরিচ্ছন্ন চিন্তার বদলে ভাবাবেগই তাঁদের শিল্পদৃষ্টিকে কুয়াশাচ্ছন্ন করে রেখেছে। একসময় এই মুসলমানদের পূর্বপুরুষেরা যে উঁচুবর্ণের হিন্দুদের দ্বারা নির্যাতিত হয়েছিলেন এই অপমানজনক দূরস্মৃতি বাইবেলের ‘অরিজিন্যাল সিন’ বা আদিপাপের ধারণার মত তাঁদের মনে নিরন্তর জাগরুক থেকেছে। মুসলমান রচিত পুঁথিসাহিত্যের প্রতিক্রিয়াশীলতা আসলে সামাজিক প্রতিক্রিয়াশীলতারই সাহিত্যিক রূপায়ন। সে বিষয়ে কোন স্পষ্ট ধারণা পোষণ করতে হলে এই অপমানজনক দূরস্মৃতির বিষয়টি স্মরণে রাখার প্রয়োজন আছে।

মুসলিম শাসনের অবসানের পর এই সামাজিক প্রতিক্রিয়া আরো গভীর এবং অন্তর্মুখী রূপ পরিগ্রহণ করে। এই প্রতিক্রিয়ার জের বাঙ্গালি মুসলমান সমাজে এত সুদূরপ্রসারী হয়েছে যে উনবিংশ শতাব্দীর অন্যতম শক্তিশালী গদ্যলেখক মীর মশাররফ হোসেনের সুবিখ্যাত ‘বিষাদসিন্ধু’ গ্রন্থটিতেও ‘শহীদে কারবালা’ পুঁথির ব্রাহ্মণ আজরকে একই চেহারায়, একই পোশাকে, একই স্থানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। সময়ের পালাবদলের ব্যাপারটি এই অত্যন্ত শক্তিধর লেখকের মনে সামান্য আঁচড়ও কাটতে পারেনি। পুঁথিলেখকের কাণ্ডজ্ঞানহীনতাকে তিনিও বরণ করে নিয়েছেন।

 

আহমদ ছফা বিদ্যালয়, সলিমুল্লাহ খান সম্পাদিত, প্রথম বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা, অক্টোবর-নবেম্বর ২০১৪

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*