বাঙ্গালি মুসলমানের মন (মূল পাঠ ১৯৭৬)—৭

বাঙ্গালি মুসলমান কারা? এক কথায় এর উত্তর বোধ করি এভাবে দেয়া যায়: যারা বাঙ্গালি এবং একই সঙ্গে মুসলমান তাঁরাই বাঙ্গালি মুসলমান। এঁরা ছাড়াও সুদূর অতীত থেকেই এই বাংলাদেশের অধিবাসী অনেক মুসলমান ছিলেন—যাঁরা ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক এবং নৃতাত্ত্বিক ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যানুসারে ঠিক বাঙ্গালি ছিলেন না। আর্থিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক সুযোগসুবিধা তাঁদের হাতে ছিল বলেই [তাঁরা] বাঙ্গালি মুসলমানের সঙ্গে কৃষ্টি-সংস্কৃতিগত ভেদরেখাসমূহ অনেকদিন পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছিলেন। শুধু তাই নয়, এই প্রভুত্বশীল অংশের রুচি, জীবনদৃষ্টি, মনন এবং চিন্তনপদ্ধতি অনেকদিন পর্যন্ত বাঙ্গালি মুসলমানের দৃষ্টিকেও আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। বাঙ্গালি মুসলমানের যে ক্ষুদ্র অংশ কোন ফাঁকফোকর দিয়ে গলে যখন সামাজিক প্রভুত্ব এবং প্রতাপের অধিকারী হতেন তখনই বাঙ্গালি মুসলমানের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক চুকে যেত এবং উঁচুশ্রেণীর অভ্যাস, রুচি, এমনকি জীবনদৃষ্টির ভ্রমাত্মক প্রবণতাসমূহও [তারা] কর্ষণে-ঘর্ষণে নিজেদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অঙ্গীভূত করে নিতেন।

মূলত বাঙ্গালি মুসলমানেরা ইতিহাসের আদি থেকেই নির্যাতিত একটি মানবগোষ্ঠী। এই অঞ্চলে আর্যপ্রভাব বিস্তৃত হওয়ার পরে সেই যে বর্ণাশ্রম প্রথা প্রবর্তিত হল এদের হতে হয়েছিল তার অসহায় শিকার। যদিও তারা ছিলেন সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ, তথাপি সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রণয়নের প্রশ্নে তাদের কোন মতামত বা বক্তব্য ছিল না। একটি সুদীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলার মৃত্তিকার সাক্ষাৎসন্তানদের এই সামাজিক অনুশাসন মেনে নিতে হয়েছিল।

যেমন কল্পনা করা হয় অত সহজে এই বাংলাদেশে আর্যপ্রভাব বিস্তৃত হতে পারেনি। বাংলার আদিম কৌমসমাজের মানুষেরা সর্বপ্রকারে যে ওই বিদেশি উন্নতশক্তিকে বাধা দিয়েছিলেন—ছড়াতে, খেলার বোলে [তার] অজস্র প্রমাণ ছড়ানো রয়েছে। এই অঞ্চলের মানুষদের বাগে আনতে অহংপুষ্ট আর্যশক্তিকেও যে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে তাতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স বেবার তাঁর বিশ্ববিশ্র“ত ‘ভারতের ধর্ম’ গ্রন্থে একটি চমৎকার মন্তব্য করেছেন। আর্য অথবা ব্রাহ্মণ্যশক্তি যে সকল জনগোষ্ঠীকে পদদলিত করে এদেশে শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে, তাঁদের একেবারে চিরতরে জন্মজন্মান্তরের দাস বলে চিহ্নিত করেছে। আর যে সকল শক্তি ওই আর্যশক্তিকে পরাস্ত করে ভারতে শাসনক্ষমতার অধিকারী হয়েছেন, তাঁদের সকলকেই মর্যাদার আসন দিতে কোন প্রকারের দ্বিধা বা কুণ্ঠাবোধ করেনি। শক, হুন, মোগল, পাঠান, ইংরেজ যাঁরাই এসেছেÑএ দেশে রাজ্যবিস্তারে প্রশাসনে—তাঁদের সহায়তা করতে পিছপা হয়নি। কিন্তু নিজেরা বাহুবলে যাদের পরাজিত করেছিল তারাও যে মানুষ একথা স্বীকার করার প্রয়োজনীয়তা খুব অল্পই অনুভব করেছে।

তবু ভারতবর্ষে এমনকি এই বাংলাদেশেও যে কোন কোন নিচুশ্রেণীর লোক নানাবৃত্তি এবং পেশাকে অবলম্বন করে ধীরে ধীরে উপরের শ্রেণীতে উঠে আসতে পেরেছেন তা অন্যত্র আলোচনার বিষয়। বাংলাদেশের এই পরাজিত জনগোষ্ঠী—যাদের রাজশক্তি পাশবিক শক্তির সাহায্যে অন্ত্যজ করে রাখা হয়েছিল তাঁদেরই সকলে—একসময়ে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করে সে প্রাথমিক পরাজয়ের কিঞ্চিত প্রতিশোধ গ্রহণ করেছিলেন। শঙ্করাচার্যের আবির্ভাবের ফলে প্রাচীন আর্যধর্মের নবজীবন প্রাপ্তির পর বৌদ্ধদের এদেশে ধনপ্রাণ নিয়ে বেঁচে থাকা যখন অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল তার অব্যবহিত পরেই এদেশে মুসলমান রাজশক্তির প্রতিষ্ঠা হয় এবং ভীতসন্ত্রস্ত বৌদ্ধরা দলে দলে ইসলাম ধর্মের আশ্রয় গ্রহণ করে।

হিন্দু বর্ণাশ্রম প্রথাই এ দেশের সাম্প্রদায়িকতার আদিমতম উৎস। কেউ কেউ অবশ্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকেই সাম্প্রদায়িকতার জনয়িতা মনে করেন। তারা ভারতীয় ইতিহাসের অতীতকে শুধু ব্রিটিশ শাসনের দুশ বছরের মধ্যে সীমিত রাখেন বলেই এই ভুলটা করে থাকেন।

 

আহমদ ছফা বিদ্যালয়, সলিমুল্লাহ খান সম্পাদিত, প্রথম বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা, অক্টোবর-নবেম্বর ২০১৪

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*