বাঙ্গালি মুসলমানের মন (মূল পাঠ ১৯৭৬)—৯

উনবিংশ শতাব্দীতে হিন্দু মধ্যবিত্তের উত্থানযুগে ইউরোপীয় ভাবধারা, জ্ঞানবিজ্ঞান এবং নানা আধুনিক সামাজিক, সাংস্কৃতিক চিন্তারাশি বঙ্গীয় হিন্দুসমাজের একাংশের মধ্যে যে তরঙ্গ তুলেছিল তা মুসলমান সমাজকে স্পর্শও করতে পারেনি। আধুনিক যুগের দাবির সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষা করে যে সকল ধর্মীয় এবং সামাজিক আন্দোলন ও সাংস্কৃতিক মূল্যচেতনার নেতৃত্ব হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণী দান করেছিলেন মুসলমান সমাজে তা একেবারে প্রসার লাভ করেনি। জগৎ এবং জীবনের যে সকল অত্যাবশ্যকীয় প্রশ্ন নবযুগের আলোকে তারা ঝালিয়ে নিচ্ছিলেন মুসলমান সমাজ তার কিছুই গ্রহণ করেনি। সে সময়ে স্যার সৈয়দ আহমদ, সৈয়দ আমির আলী, নওয়াব আব্দুল লতিফ প্রমুখ যে সকল মুসলিম চিন্তানায়ক মুসলমানদের হয়ে কথা বলছিলেন এবং চিন্তা করছিলেন [তাঁরাও বাঙ্গালি] মুসলমান সমাজের প্রকৃত দাবি কি হওয়া উচিত সে সম্বন্ধে চিন্তা করার কোন অবকাশই পাননি। শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং সংস্কার বলতে তাঁদের মনে প্রভুত্ব হারানো উঁচুকোটি মুসলমানদের কথাই জাগরুক ছিল।

স্থানীয় মুসলমানদের মধ্যে বাংলা ভাষাকে আশ্রয় করে যে অধিকারচেতনা অপেক্ষাকৃত পরে জাগ্রত হয় আসলে তা ছিল উনবিংশ শতাব্দীর হিন্দু মধ্যবিত্তের আন্দোলন এবং অগ্রগতির সম্প্রসারণ মাত্র। তাদেরকে তা করতে গিয়ে দুই ধরনের বাধার সম্মুখীন হতে হয়। লেখাপড়া, শিক্ষা-সংস্কৃতি, অর্থ-স্বার্থের দিকে অনেকদূর অগ্রসর হিন্দুমাজের সঙ্গে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হত এবং অন্যদিকে উঁচুতলার মুসলমানদের মূল্যচেতনা এবং জীবনদৃষ্টিকে স্বীকার করে নেয়া ছাড়া তাদের গত্যন্তর ছিল না। এই দুইমুখী প্রতিবন্ধকতা অগ্রাহ্য করতে হলে যে শক্ত সামাজিক ভিত্তিভূমির প্রয়োজন ছিল তাদের পেছনে তা ছিল না। তাই বাঙ্গালি মুসলমানদের মধ্যে থেকেও ইংরেজি শিক্ষাদীক্ষার সুযোগ নিয়ে যাঁরা উপরে উঠে আসতেন উঁচুতলার মুসলমানদের জীবনদৃষ্টির সঙ্গে তাঁরা নিজেদের সংযুক্ত করতেন। স্যার সৈয়দ আহমদের আলিগড় আন্দোলন থেকে শুরু করে জামালুদ্দিন আফগানির ‘প্যান ইসলামিজম’ পর্যন্ত পশ্চিম দিক থেকে আসা সমস্ত আন্দোলন প্রবর্তনার সঙ্গে নিজেদের অংশীদার করে নিতেন।

কিন্তু স্যার সৈয়দের আলিগড় আন্দোলন একান্তভাবে উত্তর প্রদেশের মুসলমানদের—সংখ্যালঘিষ্ঠ মুসলমান সামন্তশ্রেণীর—স্বার্থরক্ষার উদ্দেশ্যেই করা হয়েছিল। আবার এই সামন্তশ্রেণীর সঙ্গে জনগণের শ্রেণীগত তফাৎ ছাড়া ভাষা-সংস্কৃতিগত পার্থক্য যে ছিল না এ কথা বিংশ শতাব্দীতেও ইংরেজিশিক্ষিত মুসলমানেরা খুব কমই উপলব্ধি করতে পেরেছেন। তাঁরা বাঙ্গালি মুসলমানের মধ্যে অনুরূপ সমাজচেতনা এবং মূল্যবোধ সঞ্চারের চেষ্টা করতেন কিন্তু [তা] বাঙ্গালি জনগণের [সঙ্গে] এতটা সম্পর্ক বিরহিত ছিল যে ভাবাদর্শিক কোন জাগরণ আনতেই পারেনি। ধর্মীয় বদ্ধমত এবং সংস্কারকে আঘাত করে এমন কোন সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলন মুসলমান সমাজের ভেতর থেকে জেগে উঠতে পারেনি। মুসলমানদের দ্বারা সংগঠিত প্রায় সমস্ত সামাজিক কর্মকাণ্ড তাই ধর্মীয় পুনর্জাগরণভিত্তিক।

হিন্দুসমাজে যে ধর্মীয় পুনর্জাগরণমূলক আন্দোলন হয়নি এমন কথা বলা আমাদের উদ্দেশ্য নয় কিন্তু তাদের একাংশের মধ্যে অন্তত কিছুসংখ্যক মানুষ মৌলিক চিন্তা করেছিলেন এবং সামাজিক অনেকগুলো বদ্ধমতকে শাণিত আক্রমণ করেছিলেন। বাস্তবে না হলেও তত্ত্বগত দিক দিয়ে বেশ কিছুদূর যুক্তিবাদিতার চর্চা তাদের মধ্যে হয়েছে। তাদের কৃত আন্দোলনসমূহও যে সমুদ্রতরঙ্গের শীর্ষে ফসফরাসের মত জ্বলেছে—সমাজের গভীরে প্রবিষ্ট হতে পারেনি—তার নিশ্চয়ই কারণ রয়েছে। মুসলমান সমাজে যুক্তিবাদিতার চাষ একেবারে হয়নি। মৌলিক চিন্তাভাবনা করেছেন এমন মানুষ মুসলমান সমাজে খুব বেশি জন্মাতে পারে নি। নতুন যুগের আলোকে জগৎ এবং জীবনকে ব্যাখ্যা করে সমাজের সামনে তুলে ধরেছেন এমন মানুষ সত্যই বিরল। মুসলমান সমাজে যে কোন মনীষী জন্মাতে পারেননি কারণ সামাজিক লক্ষ্যের দ্বি কিংবা ত্রিমুখিনতা। সামাজিক এবং ধর্মীয় সংগঠনসমূহের মধ্যেই বিভিন্নমুখী লক্ষ্যের কারণসমূহ সংগুপ্ত ছিল।

 

আহমদ ছফা বিদ্যালয়, সলিমুল্লাহ খান সম্পাদিত, প্রথম বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা, অক্টোবর-নবেম্বর ২০১৪

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*