বাঙ্গালি মুসলমানের মন (মূল পাঠ ১৯৭৬)—১০ [শেষ অংশ]

বাঙ্গালি মুসলমান বলতে যাঁদের বোঝায় তারা মাত্র দুটি আন্দোলনে সাড়া দিয়েছিলেন এবং অংশগ্রহণ করেছিলেন। তার একটি তিতুমীরের অনুসারীদের দ্বারা পরিচালিত ওয়াহাবি আন্দোলন, অন্যটি হাজি দুদু মিয়ার ফরায়েজি আন্দোলন। এই দুটি আন্দোলনেই বাঙ্গালি মুসলমানেরা মনেপ্রাণে অংশগ্রহণ করেছেন। কিন্তু উঁচুশ্রেণীর মুসলমানেরা এই আন্দোলন সমর্থন করেছেন তার কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। আসলেও কৃষক জনগণই ছিলেন এই আন্দোলন দুটির হোতা। আধুনিক কোন রাষ্ট্র কিংবা সমাজদর্শন এই আন্দোলন দুটিকে চালনা করেনি। ধর্মই ছিল একমাত্র চালিকাশক্তি। সে সময়ে বাংলাদেশে আধুনিক রাষ্ট্র এবং সমাজ সম্পর্কিত বোধের উন্মেষ ঘটেনি বললেই চলে। সমাজের নিচুতলার কৃষক জনগণকে সংগঠিত করার জন্য ধর্মই ছিল একমাত্র কার্যকর শক্তি। রাজনৈতিক দিক দিয়ে এই আন্দোলন দুটির ভূমিকা প্রগতিশীল ছিল সন্দেহ নেই কিন্তু সামাজিক দিক দিয়ে পশ্চাদগামী ছিল, তাতেও কোন সন্দেহ নেই।

এই আন্দোলন দুটি ছাড়া অন্য প্রায় সমস্ত আন্দোলন হয়ত উপর থেকে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে, নয়ত হিন্দু সমাজের উদ্যোগ এবং কর্মপ্রয়াসের সম্প্রসারণ হিশেবে মুসলমান সমাজে ব্যাপ্তিলাভ করেছে। সমাজের মৌলধারাটিকে কোনকিছুই প্রভাবিত করেনি। তার ফলে প্রাগৈতিহাসিক যুগের আদিম কৃষিভিত্তিক কৌমসমাজের মনটিতে একটু রঙ্গ-টঙ্গ লাগলেও কোন রূপান্তর বা পরিবর্তন হয়নি। আমরা দেখেছি ‘শহীদে কারবালা’র ব্রাহ্মণ আজর উনবিংশ শতাব্দীর মীর মোশাররফ হোসেনের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘বিষাদসিন্ধু’তেও একই পোশাকে একই চেহারায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। মধ্যখানের কয়েকটি শতাব্দীর পরিবর্তন কোন ভাবান্তর আনতে পারেনি।

বিংশ শতাব্দীতেও এই মনের বিশেষ হেরফের ঘটেনি। বাঙ্গালি মুসলমান রচিত কাব্য-সাহিত্য-দর্শন-বিজ্ঞান পর্যালোচনা করলেই এ সত্যটি ধরা পড়বে। কোন বিষয়েই তাঁরা উল্লেখ্য কোন মৌলিক অবদান রাখতে পারেননি। সত্য বটে কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দীন প্রমুখ কবি কাব্যের ক্ষেত্রে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। একটু তলিয়ে দেখলেই ধরা পড়বে উভয়েরই রচনায় চিন্তার চাইতে আবেগের অংশ অধিক। তাছাড়া এই দুই কবির প্রথম পৃষ্ঠপোষক ও গুণগ্রাহী ছিল হিন্দু সমাজ, মুসলমান সমাজ নয়।

মুসলমান সাহিত্যিকদের রচনার প্রধান বৈশিষ্ট্য হল হয়ত চর্বিতচর্বণ—নয়ত ধর্মীয় পুনর্জাগরণ। এর বাইরে চিন্তা, যুক্তি এবং মনীষার সাহায্যে সামাজিক ডগমা বা বদ্ধমতসমূহের অসারতা প্রমাণ করেছেন তেমন লেখককবি মুসলমান সমাজে আসেননি। বাঙ্গালি মুসলমান সমাজ স্বাধীন চিন্তাকেই সবচেয়ে [বেশি] ভয় করে। তার মনের আদিম সংস্কারগুলো কাটেনি। সে কিছুই গ্রহণ করে না মনের গভীরে। ভাসাভাসাভাবে অনেক কিছুই জানার ভান করে [সে] আসলে তার জানাশোনার পরিধি খুবই সংকুচিত। বাঙ্গালি মুসলমানের মন এখনো একেবারে অপরিণত। সবচেয়ে মজার কথা, একথাটা ভুলে থাকার জন্যই সে প্রাণান্তকর চেষ্টা করতে কসুর করে না।

যেহেতু আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞান এবং প্রসরমান যান্ত্রিক কৃৎকৌশল স্বাভাবিকভাবে বিকাশলাভ করছে এবং তার একাংশ সুফলগুলোও ভোগ করছে, ফলে তার অবস্থা দাঁড়িয়ে যাচ্ছে ইঁচড়ে পাকা শিশুর মত। অনেক কিছুরই সে সংবাদ জানে কিন্তু কোন কিছুকে চিন্তা দিয়ে, যুক্তি দিয়ে, মনীষা দিয়ে আপনার করতে জানে না। যখনই কোন ব্যবস্থার মধ্যে কোনরকম অসঙ্গতি দেখা দেয় গোঁজামিল দিয়েই সবচেয়ে বেশি আনন্দ পায় এবং এই গোঁজামিল দিতে পারাটাকে রীতিমত প্রতিভাবানের কর্ম বলে মনে করে। শিশুর মত যা কিছু হাতের কাছে, চোখের সামনে আসে তাই নিয়েই সে সন্তুষ্ট। দূরদর্শিতা তার একেবারেই নেই। কেননা একমাত্র চিন্তাশীল মনই আগামীকাল কি ঘটবে সে বিষয়ে চিন্তা করতে জানে। বাঙ্গালি মুসলমান বিমূর্তভাবে চিন্তা করতেই জানে না এবং জানে না এই কথাটি ঢেকে রাখার যাবতীয় প্রয়াসকে তার কৃষ্টি-কালচার বলে পরিচিত করতে কুণ্ঠিত হয় না।

বাঙ্গালি মুসলমানের সামাজিক সৃষ্টি, সাংস্কৃতিক সৃষ্টি, দার্শনিক এবং বৈজ্ঞানিক সৃষ্টিসমূহের প্রতি চোখ বুলালেই তা প্রতিভাত হয়ে উঠবে। সাবালক মন থেকেই উন্নত স্তরের সাহিত্য দর্শন ও বিজ্ঞানের উদ্ভব এবং বিকাশ সম্ভব। এই সকল ক্ষেত্রে তার মনের সাবালকত্বের কোন পরিচয় রাখতে পারেনি [বাঙ্গালি মুসলমান]। যে জাতি উন্নত বিজ্ঞান দর্শন এবং সংস্কৃতির স্রষ্টা হতে পারে না অথবা সেগুলো উপযুক্ত মূল্য দিয়ে গ্রহণ করতে পারে না তাকে দিয়ে উন্নত রাষ্ট্রসৃষ্টিও সম্ভব নয়। যে নিজের বিষয়ে নিজে চিন্তা করতে জানে না, নিজের ভালমন্দ নিরূপণ করতে অক্ষম, অপরের পরামর্শ এবং শোনা কথায় যার সমস্ত কাজকারবার চলে তাকে খোলা থেকে আগুনে কিংবা আগুন থেকে খোলায়, এইভাবে পর্যায়ক্রমে লাফ দিতেই হয়। সুবিধার কথা হল, নিজের পঙ্গুত্বের জন্য সবসময়ই দায়ী করবার মত কাউকে না কাউকে পেয়ে যায় সে। কিন্তু নিজের দুর্বলতার উৎসটির দিকে একবারও দৃষ্টিপাত করে না।

বাঙ্গালি মুসলমানদের মন যে এখনো আদিম অবস্থায় তা বাঙ্গালি হওয়ার জন্যও নয় এবং মুসলমান হওয়ার জন্যও নয়। সুদীর্ঘকালব্যাপী একটি ঐতিহাসিক পদ্ধতির দরুন তার মনের উপর একটি গাঢ় মায়াজাল বিস্তৃত রয়েছে, সজ্ঞানে তার বাইরে সে আসতে পারে না। তাই এক পা যদি এগিয়ে আসে তিন পা পিছিয়ে যেতে হয় [তাকে]। মানসিক ভীতিই এই সমাজকে চালিয়ে থাকে। দুই বছরে কিংবা চার বছরে হয়ত এ অবস্থার অবসান ঘটানো যাবে না কিন্তু বাঙ্গালি মুসলমানের মনের ধরনধারন এবং প্রবণতাগুলো নির্মোহভাবে জানার চেষ্টা করলে এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার একটা পথ হয়ত পাওয়াও যেতে পারে।

 

আহমদ ছফা বিদ্যালয়, সলিমুল্লাহ খান সম্পাদিত, প্রথম বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা, অক্টোবর-নবেম্বর ২০১৪

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*