পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রক্রিয়া: কতিপয় বিবেচনা—২

ভারতের সাতটি গোলমেলে রাজ্য, যেমন ত্রিপুরা, মেঘালয়, মিজোরাম নাগাল্যান্ডে সকল অঞ্চল যে ভৌগোলিক সংলগ্নতার বলয়ভুক্ত, পার্বত্য চট্টগ্রামের অবস্থান তার সাথে অনেকখানিই সংযুক্ত। ভূপ্রকৃতি এবং নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য অনুসারে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগোষ্ঠির সাথে ভারতের পূর্বাঞ্চলের সাতটি পাশাপাশি রাজ্যের ততোখানিই মিল খুঁজে পাওয়া যায়, যতখানি জীবিকা এবং জীবনযাপন পদ্ধতির দিক দিয়ে একের সাথে অন্যের সামঞ্জস্য রক্ষা করে। ভারতের এই পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যসমূহে পরস্পরের মধ্যে ঐক্যের বোধটি যতোদূর জোরালো অনৈক্যের ভাবটিও তার চেয়ে কম নয়। তারা আলাদা আলাদাভাবে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে লঢ়াই চালিয়ে যায়, কিন্তু নিজেরা ঐক্যবদ্ধভাবে একটা সম্মিলিত সংগ্রামের পাটাতন তৈরি করতে এ পর্যন্ত সক্ষম হয়নি। তথাপি ওই পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যসমূহের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য, বৃহত্তর ভারতীয় ইতিহাস ঐতিহ্যের পরম্পরাগত প্রক্রিয়া থেকে এই রাজ্যসমূহ অতি সাম্প্রতিককাল ছাড়া বরাবরের মতোই বিচ্ছিন্ন থেকে গেছে।

ভারত স্বাধীন হবার পরেও এই রাজ্যসমূহ ভারতীয় রাজনীতির মূল স্রোতের সাথে ঐতিহাসিক ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতাবোধ কাটিয়ে মিশে যেতে পারেনি। নাগা, মিজো এবং অন্যান্য জনগোষ্ঠির লোকেরা কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম চালিয়ে আসছে। নানারকম ছাড় দেয়ার পরও ভারতের শাসকেরা এই রাজ্যসমূহের ওপর পুরো নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। অথচ ওই অঞ্চলটির সামরিক গুরুত্ব অপরিসীম। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় জাপানিরা সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বাধীন আজাদ হিন্দ ফৌজের সহযোগিতায় নাগাল্যাণ্ডের রাজধানী কোহিমা অবধি ধাওয়া করেছিল। ষাটের দশকের প্রথম দিকে ভারত-চীন যুদ্ধের সময় নেফার সীমানা রেখা অতিক্রম করে ওই অঞ্চলে চীনা সৈন্যের হামলার সম্ভাবনা প্রকট হয়ে উঠেছিল।

নাগাল্যাণ্ড, মিজোরাম এই সকল রাজ্যে খ্রিস্টান মিশনারিরা দীর্ঘকাল ধরে এমন নিবিড় প্রচারকার্য চালিয়েছে যে, এই দুটি রাজ্যের প্রায় সব অধিবাসী খ্রিস্টধর্মে দীক্ষা করে ফেলেছে। নিজেদের ভাষার বদলে তারা ইংরেজিকে মাতৃভাষা হিশেবে গ্রহণ করে ফেলেছে। এভাবে ইংরেজি ভাষা এবং খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করার মাধ্যমে এ সকল জনগোষ্ঠির মধ্যে এমন একটা রাজনৈতিক আকাক্সক্ষা জাগ্রত করানো সম্ভব হয়েছে, যা ভারতীয় রাজনীতির চিরাচরিত বৈশিষ্ট্যের সাথে কোনো সামঞ্জস্যই রক্ষা করে না। এ সকল কারণে ভারতের এই পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে নতুন একটি রাজনৈতিক বাস্তবতার জন্ম সম্ভাবিত হয়েছে। ভারত স্বাধীন হবার পর থেকেই এই জনগোষ্ঠির লোকেরা ভারতের রাষ্ট্রীয় শাসন অমান্য করে বিদ্রোহ ঘোষণা করতে চেষ্টা করেছে।

ভারতের রাষ্ট্রীয় শাসনের প্রতিস্পর্ধী ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার পেছনে বৈদেশিক শক্তির উস্কানি এবং গোপন সহায়তা তাদেরকে অনেকখানিই বেপরোয়া করে তুলেছিল। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দিক দিয়ে ভারত সোভিয়েত রাশিয়ার খুব কাছাকাছি এসে গিয়েছিল। পশ্চিমা শক্তিবর্গ ভারতকে দুর্বল করে রাখার যাবতীয় প্রকাশ্য এবং গোপনীয় তৎপরতা চালিয়ে গেছে। মাঝখানে শোনা গিয়েছিল পশ্চিমা শক্তিবর্গ ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্যের সমন্বয়ে ‘নিউ এশিয়া’ নামে একটি নতুন রাষ্ট্র সৃষ্টি করার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে এবং এই নতুন রাষ্ট্র সৃষ্টি প্রক্রিয়ায় ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী একটি এশীয় শক্তিধর রাষ্ট্রের পুরো সমর্থন রয়েছে। জগতজোড়া কমিউনিজমের ভরাডুবির কারণে স্নায়ুযুদ্ধে গতিমুখ পরিবর্তিত হওয়ায় রাষ্ট্রসমূহের মধ্যবর্তী সম্পর্কের ধরনটিও পাল্টে গেছে। পশ্চিমা শক্তিবর্গ আরবদের নাকের ডগার ওপর যেমন ইসরাইলকে বসিয়ে গিয়েছিল, ভারত উপমহাদেশের পূর্বপ্রান্তে সেরকম একটি রাষ্ট্র তৈরি করার নীল নকশা আপাতত তারা হিমঘরে পাঠিয়ে দিয়েছে।

পাকিস্তান যখন টিকেছিল প্রেসিডেন্ট আয়ুব খান ব্যক্তিগত প্রযত্নে নাগা, মিজো ইত্যাদি বিদ্রোহী রাজ্যের অধিবাসীদের আমন্ত্রণ করে এনে সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে ভেতরে পাঠিয়ে দিতেন। বিদ্রোহী নাগানেতা লাল ডেংগা পাকিস্তানের সম্মানিত মেহমান হিশেবে মীরপুরের লালকুঠিতে দীর্ঘকাল অবস্থান করে গেছেন। পাকিস্তান সরকারের সক্রিয় সাহায্য বন্ধ হওয়ার কারণে নাগা মিজোদের বিদ্রোহাত্মক তৎপরতা অনেকখানিই থিতিয়ে এসেছে, কিংবা তারা পদ্ধতি পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে। অনেকের স্মরণ থাকার কথা, নাগা-মিজো জনগোষ্ঠির লোকেরা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ঘোরতর বিরোধিতা করেছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে একটা স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ সাম্প্রতিক সময়ে জোরালো হয়ে উঠেছে। সরকার এবং জনসংহতি পরিষদের নেতৃবৃন্দ একটি সমঝোতায় এসে পৌঁছেছেন বলে শোনা যাচ্ছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে বিরোধী দলও একটি নমনীয় অবস্থান নিতে যাচ্ছে। আমরা এ প্রয়াসকে অভিনন্দিত করি এবং সর্বান্তকরণে কামনা করি ওই অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হোক। কিন্তু আমাদের আশঙ্কার ব্যাপারটাও স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করতে চাই। সংকটের আসল প্রকৃতিটি অনুধাবন করতে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশের সরকার বা পাহাড়ি জনগোষ্ঠি কারো পক্ষে পার্বত্য অঞ্চলে স্থায়ী শান্তির ভিত রচনা করা সম্ভব হবে না।

একটা সুদীর্ঘ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পার্বত্য জনগোষ্ঠির ওপর শোষণ, তাদের সম্পদ লুণ্ঠন, কাপ্তাই বাঁধের কারণে তাদের ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি, নির্বাচন, সেনাবাহিনীর দমন-পীড়ন নীতি, লোগাং হত্যাকাণ্ডের মতো নৃশংস ঘটনা, পার্বত্য এলাকায় বাঙ্গালি জনগোষ্ঠির অভিবাসন এ সকল ঘটনা একযোগে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিরাজমান সংকটের একটা দিক মাত্র। এ সংকট সৃষ্টিতে ভারতের একটি বড় নেপথ্য ভূমিকা রয়েছে। সে জিনিসটি বাদ দিয়ে বাঙ্গালি জনগোষ্ঠি বা বাংলাদেশ সরকারের পথে পার্বত্য জনগোষ্ঠির বিরোধকে একমাত্র কারণ বলে ধরে নিলে আসল সংকটটি পাশ কাটিয়ে যাওয়া হবে এবং স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রয়াস বাধাগ্রস্ত হবে। ভৌগোলিক-রাজনৈতিক দিক থেকে বিচার করলে একথা স্বীকার করতেই হবে, পার্বত্য চট্টগ্রামের সংকট ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যসমূহের মধ্যে বিরাজমান সংকটের একটি সম্প্রসারিত রূপ।

ভারত আমাদের নিটকতম প্রতিবেশী। ভারতের কাছে আমরা ঋণীও বটে। ভারতকে আমাদের বন্ধু রাষ্ট্র ভাবতে পারলে আমরা অনেকখানি আশ্বস্ত বোধ করি। প্রতিবেশির সাথে বিরোধ ভালো নয়। আমরা ক্ষুদ্র দেশ। আপোসের ব্যাপারে আমাদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করা উচিত। কারণ দুর্বলের অনেক দায়। শক্তিমান প্রতিবেশীর সাথে বিরোধ জিইয়ে রেখে আমরা লভবান হতে পারবো না। আমরা বাংলাদেশের ভূখ-টি উঠিয়ে নিয়েও আমাদের মনোমতো কোন দেশের পাশে স্থাপন করতে পাবো না। এটা নির্মম সত্য। পাশাপাশি একথাও মনে রাখা উচিত, আমরা আমাদের দেশটাকে ভারতের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতেও পারবো না। এরকম কোন প্রয়াস যদি কোন মহল থেকে দেখা দেয়, আমাদের দায়িত্ব হবে সর্বশক্তি দিয়ে তার প্রতিরোধ করা।

প্রস্তাবিত শান্তিচুক্তিতে আলোচিত হোক না হোক ভারত এ চুক্তির একটা শক্তিশালী পক্ষ। ভারতের প্রত্যক্ষ মদদ না পেলে পার্বত্য অঞ্চলের বিদ্রোহীরা পূর্ব থেকে শর্ত আরোপ করে বাংলাদেশকে আলোচনার টেবিলে আনতে বাধ্য করতে পারতো না। ভারতের অবস্থান যদি আমাদের মতো হতো, আমাদের অবস্থা হতো ভারতের মতো, আমরাও নাগা-মিজো কিংবা উলফা বিদ্রোহীদের আমাদের অঞ্চলে আশ্রয় দিয়ে আলোচনার টেবিলে বসিয়ে ভারতের সরকারকে নাগা-মিজো কিংবা উলফা বিদ্রোহীদের মধ্যবর্তী বিরোধ মীমাংসা করাতে বাধ্য করতে পারতাম।

যে শান্তিচুক্তির কথা সর্বত্র আলোচিত হচ্ছে তার দুটি দিক। একটিতে থাকতে হবে পার্বত্য জনগোষ্ঠি যেনো শান্তিপূর্ণভাবে তাদের এলাকায় বসবাস করতে পারে। তারা যেনো তাদের জমিজিরাতের ওপর পূর্ণ অধিকার ফেরত পায়। তাদের মধ্যে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তারা ক্ষতিপূরণ পায়। নিজেদের সংস্কৃতির অবাধ বিকাশ সাধন করতে পারে। মানবিক নাগরিক এবং জাতিগত সবগুলো অধিকার যেনো তারা ভোগ করতে পারে। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের জনগোষ্ঠির সাথে সামঞ্জস্য রক্ষা করে শিল্প বাণিজ্য এ সকল ক্ষেত্রে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তারা যেনো নিজেদের আর্থিক বুনিয়াদ শক্তিশালী করার সুযোগ পায়। এ চুক্তির দ্বিতীয় দিকটি হলো বাংলাদেশের আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়টি সুনিশ্চিত করা। এ চুক্তির মধ্যে এমন একটা ব্যবস্থা থাকতে হবে যাতে প্রতিবেশী ভারত পূর্ব ভারতীয় রাজ্যসমূহের সংকটের সাথে বাংলাদেশে পার্বত্য গোষ্ঠিকে জড়িত করে বাংলাদেশের ওপর অনাবশ্যক চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে তার ভেতরের সংকট বাংলাদেশের কাঁধে চাপিয়ে দেবার সুযোগ না পায়। পার্বত্য জনগোষ্ঠিকে ভারতের নিজস্ব রাজনৈতিক সংকটের গুটি হিসেবে ব্যবহার করার সামান্যতম অবকাশও যদি থাকে, পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ সুদূর পরাহত হয়ে উঠবে। বড়জোর একটা ব্যালেন্স অব টেরর হতে পারে। কিন্তু ভবিষ্যতে সেটা আরো মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে।

২০ নবেম্বর ১৯৯৭

শান্তি চুক্তি ও নির্বাচিত নিবন্ধ (ঢাকা: ইনফো পাবলিকেশনস্, ১৯৯৮)।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*