আহমদ ছফার গব্যপুরাণ–সলিমুল্লাহ খান

পরান আমার ভরে গেছে
সকল দুঃখ সফল মানি
হাকিম সাহেব আমার গরু
ধন্য ধন্য গুণবাখানি।
-আহমদ ছফা (২০০৮ : ২৫৩; ছফা ২০১০ : ১০৭)

When a true genius appears in the world, you may know him by this sign, that the dunces are all in confederacy against him.—Jonathan Swift (quoted in Ratcliffe 2010 : 120)
(দুনিয়ায় যখন কোন বড় মাপের প্রতিভার আবির্ভাব হয়, আপনি তাহা এই আলামত দেখিয়াও বুঝিতে পারিবেন: দেখিবেন দুনিয়ার সকল গো-শাবকই তাহার বিরুদ্ধে মহাজোট বাঁধিয়াছে।)

জীবনের শেষ দশকে আসিয়া আহমদ ছফা ‘গাভী বিত্তান্ত’ নামে একখানি উপাদেয় কাহিনী লিখিয়াছিলেন। সঙ্গত কারণেই এই কাহিনীটি জনপ্রিয় হইয়াছে। কোনো কোনো অধ্যাপক ইহাতে আমাদের জ্ঞানদায়িনী মাতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে সহি বড় আদি ও আসল উষ্মা প্রকাশ করিয়াছিলেন। আবার এক জগদ্বিখ্যাত বিদুষী নারীধর্ম-ব্যবসায়ী আমাকে শোনাইয়াছিলেন : ‘অশ্লীল, অশ্লীল, পাশে নাঙ্গ নিয়ে বসে পড়া যায় না।’  ইহারা বুঝিলাম একান্ত রাগের বশেই অনুরাগ হারাইয়াছিলেন। সম্প্রতি এলেমদার এক সমালোচক নাম অজিত রায় এই রচনার মধ্যে প্রসিদ্ধ ইংরেজ লেখক জোনাথন সুইফটের (১৬৬৭-১৭৪৫) প্রভাব আবিষ্কার করিয়াছেন। রায় মহাশয় রায় দিয়াছেন, আহমদ ছফার সাধনার প্রতিটি ক্ষেত্রই যদ্যপি ‘মননশীল ও মৌলিক’, তথাপি ‘আঙ্গিকের ব্যাপারে’ তাহার লেখায় ‘কিছুটা অনুকরণপ্রবণতা’ দেখা যায়। (রায় ২০১৯ : ৩৯৯)

সত্য বলিতে হইলে বলিতে হইবে এই প্রস্তাবটি ‘মননশীল ও মৌলিক’ আবিষ্কার বিশেষ। সমস্যার মধ্যে, শুদ্ধ ‘সাইটগাইস্ট’ বা যুগধর্মের চরিত্রটাই যে এই সমধর্মের মূলে তাহার হিশাবটা রায় মহাশয় লয়েন নাই। ড্রাইডেন, সুইফট, পোপ, কিংবা জনসন ইহারা ইংল্যান্ডের বিপ্লবী যুগের লোক। আহমদ ছফার সহিত ইহাদের সমকামিতার গোড়া এখানেই। অনেকেই জানেন, ‘গাভী বিত্তান্ত’ কাহিনীর কয়েক বছর আগে আহমদ ছফা ‘গাভীর জন্য শোকপ্রস্তাব’ নামে একপ্রস্ত মহান গদ্যও লিখিয়াছিলেন। একদা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ লন বা ঘাসক্ষেত্রে বিচরণরত একটি গাভী দুই দল লড়াকু মানুষের মধ্যখানে পড়িয়া গুলিবিদ্ধ হইয়াছিল। ব্যাজস্তোত্রস্বরূপ মহাত্মা ছফা লিখিয়াছিলেন, গাভীটি নিশ্চয়ই অপরাধী। তাহার জবানে যুক্তিটা এই ভাষা ধরিয়াছিল : ‘দেশের সেরা বিদ্যাপীঠে গরুর বেটির অনুপ্রবেশ তাও পেটে বাচ্চা নিয়ে অবশ্যই একটি [অমার্জনীয়] অপরাধ। গরুর বেটি মনুষ্য ছাওয়ালের বিদ্যাশিক্ষার কারখানায় পা দিয়ে সীমানা লঙ্ঘন করেছে, এটা অবধারিত সত্য। গাভীটির পক্ষেও কিছু যুক্তি দাঁড় করানো যেত। গাভীটির মা-বাপ দুজনেই অস্ট্রেলীয়। বাংলাদেশে সে ছিল নবাগত মেয়েশিশু। ঘাসক্ষেত্র এবং জ্ঞানক্ষেত্রের পার্থক্য বুঝে নেয়ার মতো পূর্বধারণা তার ছিল না। অজ্ঞতা অপরাধ নয়, কিন্তু অজ্ঞতার অপরাধও অপরাধ।’ (ছফা ২০০০ : ৪০)

আকলমন্দ মাত্রেই বুঝিবেন, আহমদ ছফা বিরচিত ‘গাভী বিত্তান্তের’ একফোঁটা প্রাণ একদিন এই দ্বিগুণ অস্ট্রেলীয় গাভীর রক্তকণিকা হইতেই গজাইয়াছিল। সে সত্যের যথেষ্ট ইশারা এখানে  আছে। অনেকের হয়তো মনে নাই, ইংরেজি ১৯৭৭ সালে আহমদ ছফা সরল পদ্যে ‘গো-হাকিম’ নামে একটি কাহিনীও লিখিয়াছিলেন। একই বছরে ‘একটি প্রবীণ বটের কাছে প্রার্থনা’ নামে একটি নাতিদীর্ঘ কবিতাও তিনি ছাপাইয়াছিলেন। আহমদ ছফার প্রতিভা তত দিনে ষোলোকলা পূর্ণ করিতেছে। ১৯৭৭ সালের একটু আগে-পিছে তিনি একদিকে তাহার শ্রেষ্ঠ গদ্যরচনা ‘বাঙালী মুসলমানের মন’ প্রবন্ধটি লিখিতেছেন, অন্যদিকে তদ্রচিত জার্মান ট্রাউয়ারস্পিয়েল ‘ফাউস্টে’র তর্জমাও একটি নামকরা সাময়িকীযোগে ছাপা হইতেছে। আমার তখন অল্প বয়স। সদ্য নীলক্ষেতের বড় বিশ্ববিদ্যালয়টিতে হাজিরা শুরু করিয়াছি। লেখার হাত কাঁচা। তবু তখন তখনই ‘প্রবীণ বটের’ একটি এঁচড়ে পাকা সমালোচনা লিখিয়াছিলাম। কারণ তত দিনে আহমদ ছফার সাক্ষাৎ লাভ করিয়া আমিও ধন্য হইয়াছি। দুঃখের মধ্যে, আহমদ ছফার ‘গো-হাকিম’ কবিতাটি লইয়া অন্য অনেকের কথা ছাড়িয়া দিলাম আমি নিজেও কখনো বড় দুই কথা লিখিবার অবসর পাই নাই। এই কবিতায় আহমদ ছফার বুদ্ধির দীপ্তি, অনসূয়াম-িত ব্যাজস্তুতি প্রতিভা একটা উচ্চকোটিতে উঠিয়াছিল। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে যে গাভীটি নিহত হইয়াছে সে কি নিতান্তই গাভী! তাহার নাম কি খোদ জ্ঞানদায়িনী মা বিশ্ববিদ্যালয়ও হইতে পারিত না! আমাদের এই সবুজ বিশ্ববিদ্যালয়টিও একদা বিলাতের আদলে তৈয়ার হইয়াছিল। বিদেশাগত এই গাইগরুটি স্বদেশের মাটিতে ঘাস খাওয়া বিদেশি জ্ঞান-গরিমার প্রতীকও বৈকি! আর এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উঠানেই কিনা এহেন অবলা প্রাণী অর্থাৎ জ্ঞান-গরিমা হত্যা?

তো এই হত্যাকাণ্ডের, এই অবিদ্যার শিকড় কোথায়? আরও ভালো কোনো শব্দের অভাবে যে পদার্থকে আমরা ‘দেশ’ বলি তাহা তো মাত্র কয়েক হাজার বর্গমাইলের জমিদারি নহে। দেশ মানে মানুষ। মানুষের সহিত গরুর তুলনা কাটিয়া আহমদ ছফা কি গরু জাতির কোনো প্রকার অসম্মান করিয়াছিলেন? দেশ মানে আবার রাষ্ট্রও। যাহা আইনের জোরে জমাট তাহাই রাষ্ট্র, তাহাই দেশ। কাজেই আইন নাই তো রাষ্ট্রও নাই। আইনের সাক্ষী আদালত। তাই বলিতেছি, ‘গো-হাকিম’ কাহিনীযোগে আহমদ ছফা আমাদের জাতীয় সংকটের গোড়ায় হাত দিয়াছিলেন। তিনি দেখাইয়াছিলেন, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাটি যেন মানুষের জন্য নহে, হয়তো গরু প্রভৃতি অবলা প্রাণীরই উপযোগী। আমাদের দেশের বিলাতফেরত বিচারব্যবস্থা এই শিক্ষাব্যবস্থা হইতে কাঁচামাল সংগ্রহ করে। গরুর দেশে হাকিমও গরুই হইবেন, তবে গরু মাত্রেই হাকিম নহে- এ কথা নিশ্চিত। আহমদ ছফা ভাগ্যবান। অকালে মৃত্যুবরণ করিয়াছিলেন তিনি। বাঁচিয়া থাকিলে হয়তো এত দিনে তাহার নামেও দুই-চারিটি আদালত অবমাননার মামলা হইতো। তিনি কিন্তু হাকিম মাত্রেই যে গরু হইবেন তাহা বলেন নাই। আহমদ ছফার লেখায় প্রয়োজনের অতিরিক্ত একটি পংক্তিও নাই। তাহার রচনায় অকারণ শব্দ একটিও আপনি হাতড়াইয়া পাইবেন কিনা সংশয়। এমন অসূয়ামুক্ত নির্মল অথচ এমন অব্যর্থ শরের মতো লক্ষ্যভেদী গদ্য বা পদ্য আজিকালি খুব বেশি পাওয়া যায় না।

‘গো-হাকিম’ কাহিনীটা বাংলাদেশের হালফিল সাংস্কৃতিক মানদ- অনুসারে একটি দীর্ঘ কবিতা। আহমদ ছফা রচনাবলি সম্পাদক নূরুল আনোয়ার আহমদ ছফার আত্মীয়, তাহার পুত্রস্থানীয় সাহিত্য সাধক। ‘গো-হাকিম’, আনোয়ার লিখিয়াছেন, ‘শিশুতোষ ছড়াগ্রন্থ’। আর অজিত রায় লিখিয়াছেন, ছড়া মনে হইলেও কাহিনীটি নিছক ছড়া নহে। বিলক্ষণ ছক আছে ইহার। এই লেখকের মতে, এই লেখায় ইংরেজ কবি আলেকজান্ডার পোপ (১৬৮৮-১৭৪৪) কিংবা জন ড্রাইডেনের (১৬৩১-১৭০০) প্রভাব দেখা যায়। মানে শিশুতোষ ছড়ার আড়ালে এখানে আহমদ ছফা বড়তোষ ব্যবসায়ে নামিয়াছেন। কথাটা পুরোপুরি অসার নহে। অজিত রায় ঠিকই ধরিয়াছেন, ‘একটি গো-শাবকের হাকিম হয়ে ওঠার কাহিনীই হচ্ছে গো-হাকিমের বিষয়বস্তু।’ তিনি শুদ্ধ একটি কথা বলিতে ভুলিয়াছেন। হাকিম হইবার পরও গো-শাবককে কবুল করিতে হইয়াছে, তিনি গো-শাবকই আছেন। গো-শাবকের হাকিম হইয়া ওঠা হইতেছে ‘আরোহ’, আর হাকিমের পুনরায় গো-শাবক হইয়া ওঠার যে কথাটি অজিত রায় ভুলিয়াছেন তাহার নাম ‘অবরোহ’। কবিতায় অবশ্য বিষয়বস্তুই শেষ কথা নহে। তাহার অঙ্গগঠনও স্বতন্ত্র সত্যবস্তু। ‘গো-হাকিম’ কবিতায় মোট ১৩২ জোড়া চরণ। প্রতি চরণই মাঝখানে ভাঙা। (ছফা ২০০৮ : ২৪১-৬০; ছফা ২০১০ : ৯৬-১১৪)

এই ধরনটি সতেরো কি আঠারো শতকের ইংরেজ কবিদের বিশেষ আলেকজান্ডার পোপের- হাতে বিকশিত হইয়াছিল। এই ইংরেজ কবিরা আবার বর্জিল, জুবেনাল, ওবিদ প্রভৃতি লাতিন কবির তর্জমা করিয়াছিলেন উহাদের আদর্শ অনুসরণও করিয়াছিলেন। শুদ্ধ এই বিদেশি কবিদেরই নহে, নিজ দেশের পুরানা কবি চসারের তর্জমাও সম্পন্ন করিয়াছিলেন জন ড্রাইডেন। আলেকজান্ডার পোপের উত্তরসূরি স্যামুয়েল জনসনও (১৭০৯-১৭৮৪) জুবেনালের কবিতার আদর্শে নতুন নতুন ব্যঙ্গকবিতা রচনা করিতে কসুর করেন নাই। (অ্যাডামস ১৯৮৬ : ২৩১-৩১৪)

এসব কথা অন্য কোথাও আলোচনা করিতে হইবে। এখানে আমরা আহমদ ছফার পুরাণেই নিজেদের আবদ্ধ রাখিতে পারি। আহমদ ছফা যাত্রা শুরু করিয়াছেন গ্রামীণ একটি পাঠশালা হইতে। গ্রামের নামটি বেশ- ‘ফাঁকতালা’। গ্রামের পাঠশালাটিও ঠিক পাঠশালা বলিতে এখন যাহা বোঝায় তেমন আহামরি নহে  একটি গ্রামীণ মাস্টার কিংবা গুরুমহাশয়ের আটচালা। জনৈক গ্রামীণ অভিভাবকের নজরে পাঠশালার যে ছবি আঁকিয়াছেন আহমদ ছফা তাহা এই রকম।

পেরিয়ে গেল ছোট্ট নদী
তারপর গ্রাম ফাঁকতালা
কলাপাতার ফাঁক ডিঙ্গিয়ে
দেখা গেল আটচালা।

মাস্টার বুড়ো ঘরে বসেই
শণের সুতো দোল দিয়ে
পাকাচ্ছিলেন শক্ত রশি
বড় বড় দম নিয়ে।

দেখেন চেয়ে দীপালোকে
ছাত্রসহ অভিভাবক
দাঁড়িয়ে আছে দোরগোড়াতে
মোড়ল পুত্তুর গো-শাবক।
(ছফা ২০০৮ : ২৪৭-৪৮; ছফা ২০১০ : ১০১-০২)

আটচালাতেই বিদ্যা বিতরণ, আর আটচালাতেই ভোজন-শয়ন। বাংলাদেশে পুরানা দিনের শিক্ষাব্যবস্থা কেমন ছিল, সে বিষয়ে আজ আমাদের বিশেষ ধারণা নাই। যৎসামান্য যে ধারণা আমাদের তাহাও বেশিদিন আগের নহে বড়জোর আধুনিক কালের গোড়ার। আধুনিক কালের গোড়া বলিতে আমি এখানে ইংরেজ আমলের কথা বলিতেছি না ইঙ্গিত করিতেছি নবাবি জমানার দিকে। ভুলিলে চলিবে না, ইংরেজ বিজয় কিংবা দখলদারির আমলেও এ দেশের শিক্ষাসত্রে অনেক দিন ধরিয়া নবাবি জমানার উত্তরাধিকারই জারি ছিল।

পূর্ব বাংলায় জন্ম লওয়া পন্ডিত চিন্তাহরণ চক্রবর্তীর বিবরণ অনুসারে, পূর্ব বাংলায় সেকালের পাঠশালা আহমদ ছফা বর্ণিত আটচালার অনুরূপই ছিল। এই বিবরণ বাংলা ১৩৬৬ সালের। চক্রবর্তী মহাশয় লিখিতেছেন, ‘কাহারও ঘরের বারান্দায়, চন্ডিম-পে বা আটচালায় পাঠশালা বসিত। পাঠশালার জন্য স্বতন্ত্র ঘর খুব কমই দেখা যাইত। গুরুমহাশয়কে ‘মশায়’ বলা হইত। পিতা-পুত্র এমনকি কোনও কোনও ক্ষেত্রে পৌত্র পর্যন্ত একই মশায়ের কাছে শিক্ষাপ্রাপ্ত হইতেন।’ চক্রবর্তী অধিক লিখিয়াছেন, ‘গুরুমহাশয়েরা সাধারণত ব্রাহ্মণেতর শ্রেণীর লোক হইতেন। ব্রাহ্মণ গুরুমহাশয় খুব কমই দেখা যাইত। পাঠশালায় এখনকার মতো শ্রেণীবিভাগ ছিল না। ছাত্রদের বিবরণ ও পরিচয় দিতে হইলে খাড়া লেখে, আখাড়া লেখে, বানান লেখে এইরূপ বলা হইত। অকারণে কেহ পাঠশালায় না গেলে ছাত্র পাঠাইয়া তাহাকে ধরিয়া আনিবার ব্যবস্থা ছিল।’ পন্ডিত মহাশয়ের আরও একটা কথা উদ্ধার না করিলে হয় না : ‘নানারকম কঠোর শাস্তির প্রচলন ছিল। রৌদ্রের মধ্যে চিৎ হইয়া শুইয়া দুই পা উঁচু করিয়া পায়ের পিছন হইতে হাত মাথার কাছে আনিয়া দুই কান ধরিয়া সূর্যের দিকে তাকাইয়া থাকার নাম ছিল “স্বর্গচিৎ”।’ (চক্রবর্তী ২০১০ : ১২৩)

আটচালার অধিপতি বুড়া মাস্টারের নাম উত্তম আলি। তাহার দোরগোড়ায় গো-শাবক ছাত্রসহ যে অভিভাবকটি এক্ষণে হাজির হইয়াছেন, তাহার নাম কানু মোড়ল। উত্তম আলি মহাশয়ের পাঠশালায় কেমন শিক্ষা দেওয়া হইত? এই উত্তম শিক্ষার গোটা তিনটা উদাহরণও দেওয়া হইয়াছে আহমদ ছফার কবিতায়। ইহার মধ্যে হাতের লেখার, মুখে মুখে গল্প বলার আর অল্প অল্প অঙ্ক বা হিসাব শেখানোর প্রমাণও পাওয়া যাইতেছে।

চোখ পাকালে প্রশ্ন জিগান,
‘বলত ওহে ছেলেরা
গরমকালে জোব্বা ঝোলায়
কোন সে দেশের লোকেরা?’

‘থ্যাবড়ানাকা চ্যাপ্টামুখো
মানুষ কোথায় বাস করে?
এই দেশের হালের বলদ
ইংলিশে কি নাম ধরে?’

‘পাঁচে ত্রিশে গুণ করে বল
ফল দাঁড়াবে কয় শত?
কোন পশুটি বাঘের মাসী
জবাব দেবে ঠিকমতো?’
(ছফা ২০০৮ : ২৪৩; ছফা ২০১০ : ৯৭)

সেকালের পাঠশালায় কী কী বিষয় পড়ান হইত সে বিষয়ে আজও আমাদের ধারণা নেহায়েত ভাসা ভাসা। উত্তম আলি মাস্টারের প্রশ্ন তিনটি শুনিলে মনে হয়, চিন্তাহরণ চক্রবর্তীর চিন্তাই সত্য বৈকি। সেকালে ‘পড়ার দিকে তেমন নজর দেওয়া হইত না।’ হয়তো ‘মুখে মুখে অনেক জিনিশ শেখানো হইত।’ (চক্রবর্তী ২০১০ : ১২২) উত্তম আলির উদাহরণ ধরিয়া ভাবিলে মনে হয়, সেকালে এ দেশে বাল্যশিক্ষার অবস্থা বড় অধম, বড়ই শোচনীয় ছিল। শিক্ষায় ছাত্রদের আগ্রহ ছিল না। আর শিক্ষকের কীর্তির মধ্যে ছিল একাধারে দৈহিক শাস্তিদান, দেয়ালে পিঠ ঠেকাইয়া বেঞ্চির ওপর দাঁড় করান, অন্য ধারে গালিগালাজ বিতরণ বা খিস্তি উচ্চারণ। আজিকালি এই অধম শিক্ষাই হয়তো স্বাধীন পরাধীনতার জোরে মধ্যম শিক্ষায় পরিণত হইয়াছে। দেশ স্বাধীন হইবার পর বিদেশি ভাষার দৌরাত্ম্য বাড়িয়া গিয়াছে। এখন খিস্তিটা অবশ্যই ইংরেজি ছাড়া দেওয়া চলিতেছে না!

এ রকম একদফা খিস্তিখেউড় হইতেই একদিন আহমদ ছফার ‘গো-হাকিম’ কবিতাটির জন্ম হইয়াছিল। ছাত্র সাধারণের উদ্দেশে একদিন মাস্টার মহাশয় কাচ্চি বিরিয়ানির মতো খিস্তির অমৃত বিতরণ করিতেছেন। সেদিনই কিনা ঘটনাচক্রে একটি গ্রাম্য মোড়ল- কানু তাহার নাম- আটচালা ঘরের পাশ দিয়া যাইতেছিলেন। উত্তম আলি মাস্টারের সদুক্তিকর্ণামৃত তাহার কর্ণাকর্ষণ করিল। কানু মোড়ল শুনিলেন, উত্তম আলি মাস্টার আওড়াইতেছেন :

মার কাট জবাই কর
মরি মরি চমৎকার,
এসব ছেলে ছেলে তো নয়
চামড়ামোটা জানোয়ার।

তার বদলে সকাল-বিকেল
গরুর কাছে পাঠ দিলে
বিদ্যা গিলে চতুষ্পদের
আক্কেল হতো ঝিলমিলে।

মোটাসোটা হাকিম হয়ে
আদালতের এজলাসে
প্যান্টালুন আর হ্যাট বাগিয়ে
দিন কাটাত মজাসে।
(ছফা ২০০৮ : ২৪৫; ছফা ২০১০ : ৯৯)

মাত্র পরাধীনতার রাতে কেন, এখনও আমাদের এই স্বাধীন অপরাধীনতার দিনেও- আমাদের উচ্চাবচ সকল বিদ্যালয়ের দৌড় আদালত পর্যন্তই। আমরা দেখিয়াছি উত্তম আলি একদা ছাত্রদের জিজ্ঞাসিতেছিলেন, ‘গরমকালে জোব্বা ঝোলায় কোন সে দেশের লোকেরা’। পরাধীন দেশের আদালতই কি সেই দেশ নহে যে দেশের লোকেরা গরমকালেও জোব্বা ঝোলায়? বাংলার দেশে ইংরেজি আদালত চালান আর গরমকালে জোব্বা ঝোলানোর মধ্যে প্রভেদটা কোথায়! উত্তম আলি সাহেবের প্রশ্নে আর খিস্তিখেউড়ে শিক্ষাদীক্ষা আর আইন-আদালত যুগপদ হাজির। বিদ্যালয় আর আদালত এই মণিকাঞ্চন সংযোগ ধুরন্ধর কানু মোড়লের কর্ণ এড়াইল না। এই ধরনের যোগাযোগকেই সচরাচর বলা হয় ‘অজ্ঞান’ যোগাযোগ। ইহা ফ্রয়েডের আবিষ্কার বলিয়া জগতে মশহুর।

চমকে গিয়ে ভাবল কানু
ভারি আজব কথা বটে
গো-বরাতে হাকিমগিরি
এমন কাণ্ড কেমনে ঘটে!

এই সে মানুষ গুণীর সেরা
দেখা হল শুভক্ষণে,
ঘরে রাঙা বাছুর আছে
সেই কথাটি এল মনে।

ভাগ্যগুণে পশুর বেটা
পেয়ে গেলে গুরুর দয়া,
আদালতে হাকিম হয়ে
মাথার উপর দেবে ছায়া।
(ছফা ২০০৮ : ২৪৫-৪৬; ছফা ২০১০ : ৯৯-১০০)

অসামান্য এই ব্যাজস্তুতি। হাকিমকে যদি আপনি গরু বলিয়া ডাকেন, লোকে বলিবে আপনি অগ্নিশর্মা, খামোকা রাগিয়া গালি দিতেছেন। কিন্তু আপনার অজ্ঞানলোকের বাসিন্দা গরুটিকে আদর করিয়া যদি হাকিম নামই দেন, কে আপনাকে তিরস্কার করিবে? আহমদ ছফা এক্ষণে এক ঘায়ে দুই জীব ঘায়েল করিতেছেন। কথাটা কতদূর সত্য আমরা পরীক্ষা প্রার্থনা করিতেই পারি। আমাদের হাকিমেরা হয়তো আদৌ গরু নহেন, কিন্তু আমাদের গো-শাবকদের হাকিম জ্ঞান আমরা করিতেই পারি। আহমদ ছফাও তাহাই করিয়াছেন। জাতীয় সমাজে ঘুণ না ধরিলে রাষ্ট্র কোনো দিন এতটা ভঙ্গুর হইতে পারে না। পরাধীন দেশ মাত্রেই পোড়া দেশ। সেখানে পাঠশালাও দূর অস্ত! কানু মোড়ল কবুল করিয়াছেন :

পোড়াদেশে কোথায় মেলে
যোগ্যমতো পাঠশালা!
কপালগুণে পেয়ে গেলাম
উত্তম আলির আটচালা।

উত্তম আলি মাস্টার বটে
আসল নিবাস খুলনা,
গরু পিটে হাকিম বানান
কোথায় এমন তুলনা!
(ছফা ২০০৮ : ২৫২; ছফা ২০১০ : ১০৬)

কানু মোড়ল ধুরন্ধর মানুষ। তিনি এক্ষণে আরজ করিতেছেন, তাহার বাছুরটিকে ভর্তি করিতে হইবে। তাহার চোখে উত্তম আলি বিদ্যাসাগর বিশেষ- আবার ঈশ্বরচন্দ্র শর্মার মতন যুগপদ ‘দয়ার সাগর’ও বটেন। তিনি যদি ‘একটুখানি কৃপার ভরে’ তাহার ‘ঘরের পোষা বাছুরটি’ মানুষ করিয়া দিতেন তো কানু হইতেন কৃতার্থ- তাহার কথায় ‘গরুর ভাগ্যে ভাগ্যমন্ত’ হইতেন। ভালোমতো বাঁচিয়া যাইতেন। শিক্ষকে-অভিভাবকে সামাজিক চুক্তি নির্দিষ্ট হইল। ছাত্রবেতন সাব্যস্ত হইল মাসে মাসে নব্বই টাকা। তাহা দেবেন অভিভাবক। শর্ত রহিল আরো কিছু। আহমদ ছফা যখন রচনাবলির এই অধ্যায়টি রচনা করিতেছেন তখনো বাংলাদেশে আধুনিক ইংরেজি মাধ্যম শিশু-কিশোর বিদ্যালয়ের প্রসার এতখানি হয় নাই। বেচারা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেও অব্যাহতি দেন নাই কবি। উত্তম আলি কহিতেছেন, বাছুরটিকে তিনি ‘সহজ পাঠ’ নসিব করিবেন।

খড়বিচুলি তুমিই দেবে
আমি দেব সহজ পাঠ;
বরাত যদি থাকে গরুর
হতে পারে লাট-বেলাট।

নিদেনপক্ষে হাকিম হবে
বলছি আমি খাস দিলে
ন’মাস অন্তে জানতে পাবে
আদালতে খোঁজ নিলে।
(ছফা ২০০৮ : ২৪৬-৪৭; ছফা ২০১০ : ১০০-০১)

নয় মাস পর কেন? মনুষ্যশিশুও মাতৃগর্ভে- লোকে বলে- নয় মাস থাকে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ- ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ হইতে ১৬ ডিসেম্বর তক- এই নয় মাস, শুমার করিয়া দেখিলে হয়তো দশ-পাঁচ দিন কমই হইবে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বছরও বলিতে নয় মাসেই। দেখিতে দেখিতে নয় মাস পার হইল। কানু মোড়ল ভাবিলেন, হয়তো গরুর গুণে তাহার গুণও কিছুটা বাড়িবে। জুটিয়াই যাইবে ‘বেবাক পাড়ার সর্দারী’। মোড়ল সাহেব এক দিন শুভক্ষণে মাস্টার মহাশয়ের আটচালায় আসিয়া হাজির হইলেন। খোঁজ নিলেন। দেখিলেন চারিধারে। কী দেখিলেন তিনি? দেখিলেন, বিধি বাম। তাহার বাছুরটি নাই সেখানে। বাছুর উধাও। সালাম-আদাব শেষে আসল কথাটি জিজ্ঞাসিলেন তিনি :

সেই যে আমি রেখে গেলাম
গরুর ব্যাটার কি হলো?

উত্তম আলির উত্তরও সমান উত্তম একান্তই ধবল :

কানুর কথায় দাঁত খেলিয়ে/মাস্টার দিলেন অট্টহাস,
‘খবর কিছু রাখো মিয়া
গরুর কিবা বিদ্যাভ্যাস?’

‘খোঁজ নাওগে আদালতে
হাকিম হয়ে বসেছে
গরুর মাথায় এলেমদারির
সাতশো মানিক জ্বলেছে।’
(ছফা ২০০৮ : ২৪৯; ছফা ২০১০ : ১০৩-০৪)

এই এক খোশখবরেই কানু মোড়লের পেট ভরিয়াছে। তাহার গরুটি গরুরত্ন বলা যায় রত্নগরু- বটে। আর তিনিই সেই গরুর কর্তা। তাহার আর তর সয় না। সটান আদালত পাড়ায় চলিয়া আসিলেন তিনি। সঙ্গে খড়বিচালি আর চটচটে গুড়ের একটা পুঁটুলি লইতেও ভুলিলেন না। আহমদ ছফা টিপ্পনী কাটিতে ভোলেন নাই, ছাত্রভর্তির সময় কানু মোড়ল কী কী কিনিয়াছিলেন? অন্যান্যের মধ্যে তিনি জাপান দেশের খাবারও কিছু কিনিয়াছিলেন। হাকিমের দরজায় পৌঁছিয়াই তিনি শুরু করিলেন হাঁকডাক।

অগত্যা তাই নামটি ধরে
বড় করে হাঁক দিল,
‘গরুর রাজা হাকিম গরু
তোমার সঙ্গে কাজ ছিল।

আমি তোমার পুরান মনিব
দেখলে তবে চিনতে পাবে,
যেথায় থাক ছুটে এসো
খড়বিচুলির নাস্তা খাবে।’
(ছফা ২০০৮ : ২৫০; ছফা ২০১০ : ১০৪)

হাকিম সাহেব তখন আপনকার খাস কামরায় দিবানিদ্রায় মশগুল। কানুর ওপর চোখ পড়িল হাকিমের একান্ত খাস পেয়াদা বা আর্দালির। আর্দালির নামটিও যথার্থ- নফর আলি। দ্রুতলয়ে বলিতে শোনায় ‘নফরালি’। নফরালিকে বাগে পাইয়া তাহার পোষা গো-শাবকটি কী করিয়া, কোন কলকাঠির জোরে, শেষ পর্যন্ত হাকিম হইল তাহার পুরা গল্পটি শুনাইয়া দিলেন কানু মোড়ল। তিনি সরাসরি জানাইয়াই দিলেন, একদা ‘তোমার মনিব আমার বাছুর’ ছিলেন।

‘আমার খবর লাভ কি জেনে
মাসে মাসে নব্বুই টাকা
খড়বিচুলির খরচসহ
যুগিয়ে গেছি একা একা।

পরান আমার ভরে গেছে
সকল দুঃখ সফল মানি
হাকিম সাহেব আমার গরু
ধন্য ধন্য গুণবাখানি।’
(ছফা ২০০৮ : ২৫২-৫৩; ছফা ২০১০ : ১০৬-০৭)

সেদিন খাস কামরায় হাকিম সাহেবের দিবানিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটাইলেন কানু মোড়ল নহে, ঘটাইল একান্ত বেরসিক একটি টিকটিকি। হাকিমের নাকডাকানির স্বরে ভয় পাইয়া টিকটিকিটি তাহার মুখের ওপর আছড়াইয়া পড়িল। তাহাতেই সাহেবের ঘুম টুটিল। ঘুম হইতে জাগিয়া হাকিম সাহেব যখন নফরালির খোঁজ লইলেন তখন তাহার অপেক্ষা করিতেছে অপার বিস্ময়। কানু মোড়ল লোকটি হাকিমের একান্ত অচেনা নহে।

বলেন হাকিম, ‘নফর আলি,
সুখের কথা নয় কিছু;
অনেক বছর এই মানুষটি
লেগে আছে আগপিছু।’
(ছফা ২০০৮ : ২৫৫; ছফা ২০১০ : ১০৯)

গল্পটার সংক্ষেপ এই রকম। জীবনসংগ্রামের এক পর্বে তিনি নবগ্রাম নামক কোনো এক মফস্বল শহরের উকিল ছিলেন। একবার এক গরুচোরের জামিন হইয়া তাহাকে দশ হাজার টাকা জরিমানা গুণিতে হইয়াছিলেন। মফস্বলের উকিলদের এ রকম জামিন হামেশাই হইতে হয়। ঘটনাচক্রে ওই সময় কানু মোড়ল ছিলেন উকিল সাহেবের প্রতিবেশী। ‘একলাগোয়া বাড়ি’ থাকায় দুই পরিবারের মধ্যে আরো রেষারেষি। হাকিম সাহেবের বয়ান যদি কিছুটাও সত্য হয় তো তাহার ‘গো-হাকিম’ অভিধার একটা ঐতিহাসিক বস্তুবাদী ব্যাখ্যাও এখানে পাওয়া গেল। তিনি একদা ছিলেন ‘গরু উকিল’। এখন হইয়াছেন ‘গো-হাকিম’। অসম্ভব কি!

‘ধূর্ত কানু সুযোগ বুঝে
আশেপাশের দশ গেরামে
গরু উকিল খেতাবখানি
রটিয়ে দিল আমার নামে।’
(ছফা ২০০৮ : ২৫৬; ছফা ২০১০ : ১১০)

আর এক্ষণে ‘ধুরন্ধর’ মানে বুদ্ধিজীবী লোকটি বুদ্ধিপূর্বক মাথার ওপর কয়েকখানা খড়ের আঁটি চাপাইয়া আদালতের মাঠে আসিয়া হাজির হইয়াছে। হাকিম সাহেবের ইজ্জত-শরম মাটি করিতেছে। বিজ্ঞ হাকিম সাহেব প্রথম ধাক্কায় আদেশ করিয়াছিলেন হারামি মোড়লটাকে লাঠির দুই ঘা লাগাইয়া ফাঁকাইয়া দেবেন। কিন্তু অভিজ্ঞ আর্দালির পরামর্শে তাহার সম্বিত ফিরিল। ফাঁকান নিতান্ত সহজকর্ম নহে। রাশিয়ার নেতা ব্লাদিমির লেনিন পর্যন্ত একদিন কবুল করিয়াছিলেন, জীবনে কখনো কখনো দুই কদম না পিছাইলে এক কদম আগান যায় না।

বললো, ‘হুজুর, জানলে আগে
খেদিয়ে দিতাম কোন কালে,
মাসে মাসে নব্বুই টাকা
ফেলছে একটু গোলমালে।’

‘কি জানি কোন বিপদ আসে
টাকা পয়সার গণ্ডগোল!
নইলে হুজুর অনেক আগে/উড়ে যেত মাথার টোল।’
(ছফা ২০০৮ : ২৫৭; ছফা ২০১০ : ১১১)

আগেপিছে ভাবিয়া-চিন্তিয়া, একান্তে বুঝিয়া-শুনিয়া হাকিম সাহেব সিদ্ধান্তটা বদলাইলেন। হাকিম না নড়ে তো কি হইবে, হুকুম তো নড়িবে অন্তত। হাকিম সাহেব স্থির করিলেন, এ যাত্রা হাজার টাকা গচ্ছাই দেবেন তিনি। ধূর্ত কানুর মুখ তাহাকে বন্ধ করিতে হইবে। এক্ষণে ব্যাজের চূড়ান্ত হইল। লোকে হাকিমের হাতে তোড়া তুলিয়া দেয়। আর আজ দশচক্রে হাকিমও ভূত। এখানে খোদ হাকিমই টাকার তোড়া পাঠাইলেন উমেদার বরাবর। ইহাকে কি ‘ঘুষ’ কিংবা উৎকোচ বলা চলিবে? ঘুষ শব্দটি ফারসি, আদি অর্থ ‘কান’। কানে ফিসফিস করিয়া যে টাকা গছাইয়া দেওয়া হয় তাহাকেই ‘ঘুষ’ বলে। এইক্রমে শব্দ কিংবা বাক্য যাহা ঘুষ পর্যন্ত পৌঁছায় তাহার নাম ‘ঘোষণা’। এমনকি ঘুষ অর্থাৎ কান বরাবর যে আঘাত তাহার নাম ‘ঘুষি’। পরিশেষে যে প্রাণীর ‘ঘুষ’ (বানানভেদে ‘গোশ’) খর বা খাড়া তাহার নামই ‘খরগোশ’। বাংলা ‘খরগোশ’ মানে তাই কানখাড়া প্রাণী। বাংলা ভাষায় আরবি ও ফারসির কারণে আদালতের সহিত ঘুষের নিকটাত্মীয় ভাব আজও জারি আছে।

এই যে ধর নগদ নগদ
বন্ধ করো কানুর মুখ
নিন্দুক বেটা সরলে পরে
শান্ত হয় ত্রস্ত বুক।
(ছফা ২০০৮ : ২৫৮; ছফা ২০১০ : ১১২)

শুদ্ধ হাজার টাকার তোড়ায়ও কাজ হইবে না। সঙ্গে একটি দুটি মিছা কথাও তোলা- অর্থাৎ ফাও- দিতে হইবে। নফর আলি জানাইল, গিন্নী মায়ের নামে কানু মোড়লের ঝোলায় আরও একপ্রস্ত আরজগোজার ছিল। হাকিম সাহেবকে একটিবারের জন্য পুরানা গ্রামের বাড়ি যাইতে হইবে। হাজার হৌক, ভালোবাসা বলিয়া একটা পদার্থ তো এই পৃথিবীতে রহিয়াই গিয়াছে। ছেলে পাঠ্যশালে আসার পর শোকে কানু গিন্নীর চোখ-কানা হইয়া গিয়াছে। মোড়লের এহেন নিবেদন উপেক্ষা করা তো সহজসাধ্য নহে। এই নিবেদন নফর আলি আর্দালিকে লক্ষ্য করিয়া পেশ করা। তবে ইহার আসল গন্তব্য যে খোদ হাকিম সাহেব তাহাতে সন্দেহ কি!

তুমি তো ভাই আপন মানুষ
রাখছি বলে আবডালে,
তোমার মনিব আড়াই বছর
ছিলেন আমার গোশালে।
(ছফা ২০০৮ : ২৫১; ছফা ২০১০ : ১০৫)

নফর আলি আর্দালির মধ্যস্থতায় মহান হাকিম জানাইলেন, এক্ষণে তাহার কোনো অবসরই নাই। তবে মায়ের কথা শুনিয়া তিনি বড়ই দুঃখ পাইয়াছেন। মাকে দেখিতে তিনি পরের বছর গ্রামে যাইবেন। আর সঙ্গে সঙ্গে নফর আলি আর্দালি যেন কানু মোড়লের হাতের ফাঁকে হাজার টাকার তোড়াটি গলাইয়া দিয়া কানে কানে এই ছড়াটি আওড়ায়।

খড়বিচুলির সামান্য দাম
ঋণ শোধে তার কি সাধ্য!
বাছুর আছে আগের মতো
হয়নি মোটেই অবাধ্য।
(ছফা ২০০৮ : ২৫৯; ছফা ২০১০ : ১১৩)

অবিশ্বাস করার জো নাই। গো-শাবক যদি হাকিম হইতে পারে, তো হাকিম কেন গো-শাবক যেমন বাধ্য তেমন বাধ্য হইবে না? আর উমেদারকেই বা হাকিম সাহেব কেন কিছু পারিতোষিক দিতে পারিবেন না? আহমদ ছফার এই খাঁটি গবিয়া পুরাণ যাহাদের চোখে অলৌকিক ঠেকিবে, তাহাদের দোহাই, আপনি যদি গরুর শাবক হইতে না চাহেন তো কালে আপনাকে হইতে হইবে বাঘের বাচ্চা। নতুবা লোকে আপনাকে কুত্তার বাচ্চা বলিবে। সাধ হয়, গো-হাকিমকে ঈর্ষা করি।

হাকিমের আর্দালিভাগ্যও কম ঈর্ষণীয় নহে। আর্দালির আত্মপরিচয়ও নিঃসন্দেহে অসামান্য। অতঃপর নফর আলি কহে :

বাঘা হাকিম শয়ন ঘরে
আমি হলাম আরদালি
বাপের ছিল চুরির পেশা
নিজের নাম নফ্রালি।
(ছফা ২০০৮ : ২৫১; ছফা ২০১০ : ১০৫)

৩. সম্প্রতি নবীন এক গো-হাকিম লিখিয়াছেন, ‘আহমদ ছফাকে ক্ষেপানোর উপায় ছিল সহজ। কথা প্রসঙ্গেও কেউ যদি তার সামনে বাংলাদেশের অন্য কোনো লেখকের প্রসঙ্গ তুলে একটু ভালো কিছু বলত, সঙ্গে সঙ্গে তার গায়ে আগুন জ্বলে উঠত। তিনি মনে করতেন তার চেয়ে ভালো এবং বড় লেখক কেউ বাংলাদেশে নেই।’ এই হাকিমটি নিছক লেখার হাকিম। তাহার কথাটি ধ্রুব সত্য নহে। শুদ্ধ এখানেই থামেন নাই তিনি। তিনি আরও দূরে গিয়াছেন, ‘শুধু অন্য কেউ বললেই ক্ষেপে যেতেন তা নয়, তিনি নিজেও বলতেন অন্যেরা কেউ লেখকই না। তিনিই একমাত্র এবং শক্তিশালী লেখক। বলে একটু বোকামির হাসি দিতেন।’ সাধ ছিল, এই নবীন হাকিমের কথা দিয়াই এই গব্যপুরাণের ইতি টানি : ‘আহমদ ছফা সব সময় এই ধারণাই অন্যদের দিতেন যে তিনি অনেক বড় মাপের লেখক ও দার্শনিক।’

কিন্তু পারিলাম কই! আমাদের নবীন গো-হাকিম সাহেব একটি গল্পও বলিয়াছেন। তাহা এই রকম : ‘প্রফেসর আবুল কাসেম ফজলুল হক আহমদ ছফার বন্ধু। তার ছেলে দীপন এবং মেয়ে সুচিতা শারমিন যখন ছোট ছিল সে সময় আহমদ ছফা নিয়মিতই তাদের বাসায় যেতেন। দীপন এবং সুচির সঙ্গে আহমদ ছফা গল্প করতেন। এক দিন প্রফেসর আবুল কাসেম ফজলুল হক মাও সেতুঙ্গের ওপর এক অনুষ্ঠান থেকে ফেরার সময় হাতে একটা লিফলেট নিয়ে আসেন। বাসায় এনেছেন এ জন্য যে ফ্রেশ হয়ে পড়বেন। বাসায় ফিরে তিনি সেটা টেবিলের ওপর রাখেন। দীপন দেখে, কাগজটার ওপর একটা লালটুপি পরা ছোট ছবিও আছে। ছবিটা দেখিয়ে দীপন তার পিতার কাছে জানতে চায় এই ছবিটা কার। তিনি বলেন, এটা মাও সেতুঙ্গের ছবি। মাও সেতুং চীন দেশের বড় নেতা ছিলেন। দীপন বলে, “আব্বু, ইনি কি ছফা কাকুর চেয়েও বড় কেউ?”’ (ইয়াসিন ২০১৯ : ৪)

বোঝাই যাইতেছে এই হাকিম সাহেব এই গল্পের বয়ানটি খোদ বড় অধ্যাপক সাহেবের কাছেই গ্রহণ করিয়াছেন। ইহাতে রিরংসার কথাটুকু ছাড়িয়া দিলে সত্যের লেশমাত্র নাই। এই গল্পটি শুনিয়া আমার মনে পড়িল ইংরেজি ১৭১১ সালে লেখা জোনাথন সুইফটের রচনা হইতে আহরিত একটি প্রবাদবাক্যের কথা। সুইফট সাহেব কহিয়াছিলেন, ‘দুনিয়ায় যখন কোনো বড় মাপের প্রতিভার আবির্ভাব হয়, আপনি তাহা এই আলামত দেখিয়াও বুঝিতে পারিবেন : দেখিবেন দুনিয়ার সকল গো-শাবকই তাহার বিরুদ্ধে মহাজোট বাঁধিয়াছে।’ (উদ্ধৃত, র‌্যাটক্লিফ ২০১০ : ১২০)

১৮ আগস্ট ২০১৯

দোহাই
১.  অজিত রায়, ‘গো-হাকিম : পর্যালোচনা’, চন্দন আনোয়ার সম্পাদিত গল্পকথা, বর্ষ ৯, সংখ্যা ১১ (রাজশাহী : ড্রিম প্যালেস, ২০১৯), পৃ. ৩৯৯-৪০২।
২. আহমদ ছফা, ‘গাভীর জন্য শোক প্রস্তাব’, আহমদ ছফার কবিতা (ঢাকা : শ্রীপ্রকাশ, ২০০০), পৃ. ৪০-৪২।
৩.  আহমদ ছফা, ‘গো-হাকিম’, নূরুল আনোয়ার সম্পাদিত, আহমদ ছফার কবিতাসমগ্র (ঢাকা : খান ব্রাদার্স, ২০১০), পৃ. ৯৫-১১৪।
৪. আহমদ ছফা, ‘গো-হাকিম’, নূরুল আনোয়ার সম্পাদিত, আহমদ ছফা রচনাবলি, ৮ম খ- (ঢাকা : খান ব্রাদার্স, ২০০৮), পৃ. ২৪১-৬০।
৫. চিন্তাহরণ চক্রবর্তী, ‘আধুনিকপূর্ব যুগের প্রাথমিক শিক্ষাপদ্ধতি’, নিবন্ধ সংগ্রহ ২ : ধর্ম সংস্কৃতি সমাজ (কলকাতা : গাঙচিল, ২০১০), পৃ. ১২০-২৪।
৬. তাহা ইয়াসিন, ‘লেখকদের ব্যতিক্রমী জীবন’, সাম্প্রতিক দেশকাল, বর্ষ ৬ সংখ্যা ২২ (১১ জুলাই ২০১৯), পৃ. ৪-৫।
৭. Robert M. Adams, The Land and Literature of England : A Historical Account, reprint (New York : WW Norton, 1986).
৮. Susan Ratcliffe, ed., The Oxford Dictionary of Quotations and Proverbs, vol. II, 21st ed. (Oxford : Oxford University Press, 2010).

 

২৭ আগস্ট ২০১৯ , দেশ রূপান্তর

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*