সময়ের আয়নায় আহমদ ছফা–মুস্তাফিজ সৈয়দ

অতীত ও আজকের চিন্তা ভাবনাই বর্তমানের আয়োজন এবং আগামীর প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ায় সময়স্রোতে, কালের স্রোতধারার জীবননদীর প্রমত্ত অববাহিকায়। আমরা সবাই চিন্তা করি নানা সময় নানা বিষয়ে। এসব চিন্তার কোনটি প্রয়োজনে আবার কোনটি অপ্রয়োজনে। কোনটি পরিণত হয় সীমাহীন আনন্দে আবার কোনটি হয়ে যায় বর্ণনাতীত কষ্টের সমুদ্রে। আমাদের সামগ্রিক চিন্তা ভাবনা বর্তমানের আয়োজনে হয়ে থাকে আর এই বর্তমানের আয়োজনই আগামী প্রজন্মের জন্য অনেক বেশি প্রয়োজন। আমি, আপনি এবং আমরা সবাই কেউই পৃথিবীতে স্থায়ী নই, উপর হতে ডাক এলেই চলে যেতে হবে পৃথিবীর সব মায়া মমতার বন্ধন, চিন্তার যুক্তিখন্ডন পিছনে ফেলে রেখে। মানুষ চলে গেলেও মানুষের চিন্তাভাবনা, বুদ্ধিবৃত্তির বিন্যাস উপস্থিত থাকে পৃথিবীর বুকে, মানুষের মস্তিকে।

গণবুদ্ধিজীবি, কথাসাহিত্যিক, শিক্ষক, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশাজীবি মানুষেরা উপহার দিয়ে যান বুদ্ধিবৃত্তির বিন্ন্যাসরেখা সময়ের আয়নায়।

বাংলা সাহিত্য ও আমাদের দেশের ইতিহাসে প্রগতিশীল লেখক ও বুদ্ধিবৃত্তির বিন্যাসে চিরজাগ্রত চিরবিপ্লবী সৈনিক আহমদ ছফা। ১৯৪৩ সালের ৩০ জুন চট্টগ্রাম জেলার চন্দনাইশ উপজেলার গাছবাড়িয়া গ্রামের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ছফার জন্মস্থান উর্বর এখানে অনেক জ্ঞানীগুণির জন্ম। যেমন আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ, আবুল ফজল, নেলী সেনগুপ্তা, প্রিন্সিপাল কাশেম, মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীসহ প্রমুখ। আহমদ ছফার শৈশব কৈশোর বেড়ে ওঠা সবারই কম বেশি জানা আছে এ বিষয়ে আর দৃষ্টিপাত করতে চাচ্ছি না। সময়ের আয়নায় আহমদ ছফা কেমন ছিলেন আর আমাদের সময়ের ব্যবচ্ছেদ সেটাই আজ তুলে ধরব। থমাস জেফারসন বলেন “সততা হলো জ্ঞানী হওয়ার বইয়ের প্রথম অধ্যায়।” এদিক থেকে আহমদ ছফা তার জীবনে সফল। সৎ মানুষের শত্রু,নিন্দুক বেশি হয়ে থাকে। সৎ সাহসী মানুষেরা কখনো দমে যায় না বরং লড়ে যায়। ছফা তাঁর জীবনে সফল হয়েছেন তবে ভুলে যাননি তাঁর আত্ম পরিচয় বরং সুদৃড়চিত্তে সুউচ্চ কন্ঠে বলেন “আমার পরিবার চাষা। আমার পক্ষে এটা ওভারলুক করা কষ্টকর, রঙ চড়িয়ে কিছু বলতে চাই না। আমার পূর্বপুরুষেরা সরাসরি কৃষি উৎপাদনের সাথে যুক্ত ছিল। এই পরিচয় আমার অহংকার।”
বর্তমান সময়ে দেখা যায় শিক্ষিত – অশিক্ষিত, ধনী-গরিব, সাদা-কালো, উঁচু-নিচুসহ সর্বমহলে এক শ্রেণিভুক্ত মানুষ আছে যারা হঠাৎ জাতে ওঠলে ভুলে যায় অতীত, ভুলে যায় আত্ম পরিচয়।

যে মানুষটি আত্মপরিচয় ভুলে যায় সে ব্যক্তিজীবনে যতই অর্থবিত্ত, যশখ্যাতির মালিক হোক না কেন সে কখনোই মানুষের মনমন্দিরে জায়গা করে নিতে পারে না বরং ঘৃণার পাত্ররূপে বিবেচিত হয় যেন ঐ মানুষটিই নর্দমার আবর্জনা বিশেষ। একজন মানুষ তার চিন্তা ও বন্ধুবান্ধব, পরিবেশ দ্বারা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়। আহমদ ছফা যে সময়ের মধ্যে বসবাস করেছিলেন সেই সময়টা তাঁর শ্রেষ্ঠ সময়। ইতিহাসের ভেতর হতেই ছফার উত্থান এবং বিচরণ। কলেজে ছাত্রাবস্থায় ছফা ও তাঁর বন্ধুরা মিলে বিপ্লবী লোকনাথ বলের বাড়ি ভাড়া করেছিলেন। এই বিপ্লবী আবার চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনের প্রধান পরিকল্পনাকারী। ছফা ও তাঁর বন্ধুদের ইচ্ছে হলো এরকম কিছু করবেন এবং চট্টগ্রাম রেললাইন তুলে ফেলেন। কতটা সাহস বুকে চলতেন এটি একটি জ্বলন্ত প্রমাণ, বিপ্লবীরাতো এমনই হয়।
আহমদ ছফার শৈশবেই পড়াশোনার হাতেখড়ি হয় তাঁর বাবার হাত ধরে। ১৯৬২ সালে চট্টগ্রাম নাজিরহাট কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষে সে বছরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হন তিনি। যদিও সেখানে খুব বেশি দিন ক্লাস করেননি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ইস্তফা দেন ছফা মান-অভিমান মনমালিন্যে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে ছফার সম্পর্ক কেমন সে সম্পর্কে ছফা একটি সাক্ষাতকারে বলেন ” ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল গ্র্যান্ডফাদারের নাতির মতই অর্থাৎ গ্র্যান্ডফাদারের কাছ থেকে যাবতীয় কিছু গ্রহণ করবো কিন্তু ডিসিপ্লিনটা মানবো না। এই জন্য প্রথমদিকে আমাকে লোকে খুব অপছন্দ করত। কিন্তু পরবর্তী পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধের আগে দিয়ে যখন আমি ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে এলাম প্রায় ৯০% টিচার আমাকে পছন্দ করতেন, এখনও ভালোবাসেন।” ছফা জানতেন কীভাবে গুরুজনের প্রিয়ভাজন হওয়া যায়, কীভাবে মানুষকে ভালোবাসা যায়,মানুষের উপকার করা যায়। জ্ঞানতাপস রাজ্জাক স্যার,মুনীর চৌধুরী, মফিজ চৌধুরী, এস এম সুলতান, কবি আবুল হাসান,গবেষক সলিমুল্লাহ খান, কবি আসাদ চৌধুরীসহ সমাজের নানা শ্রেণির মানুষের সাথে ছফার সম্পর্কের ধরন বলে দেয় কেমন ছিলেন ছফা।

১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজ থেকে প্রাইভেটে পরীক্ষা দিয়ে দ্বিতীয় শ্রেণীতে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। এ সময় ছফার পাশে ছিলেন বাংলা সাহিত্যের আরেক প্রদীপশিখা আসাদ চৌধুরী। বি.এ প্রাইভেটে পরীক্ষার ফিস সংগ্রহ করেছিলেন মফিজ চৌধুরীর কাছ থেকে। মফিজ চৌধুরী একটা পত্রিকা বের করতেন, তিনি নবীন লেখকদের বিকশিত করার সুযোগ দিতেন। আহমদ ছফা দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলের “সংশয় রচনাবলী” এর পান্ডুলিপিটি মফিজ চৌধুরীকে দিয়েছিলেন । ছফা দেখতে ছোট গড়নের হওয়ায় মফিজ চৌধুরী ভেবেছিলেন এটা চুরি করে নিয়েছেন ছফা। তখন আহমদ ছফা বললেন ” সব বুর্জোয়ারা একই রকম!” তখন মফিজ সাহেব বুঝলেন এবং ছফাকে ডেকে তাঁর গাড়িতে তুললেন। গাড়িতে ওঠার পর ইন্দিরা রোডে গাড়ি থেকে নামার সময় ছফা দেখলেন মফিজ সাহেবের পকেটে অনেক টাকা। ছফা মনে মনে ভাবলেন আমি পরীক্ষা দেবার টাকা পাচ্ছি না আর এই লোক এত টাকা পয়সা (একশ টাকার নোট,তখন পাঁচশত টাকার নোটের প্রচলন হয়নি) নিয়ে ঘুরছে! গাড়িটা থামার পরপরই একশ টাকা যতগুলি পেয়েছিলেন সব নিজেই নিয়ে নিলেন এবং তাঁর লেখা সংশয় রচনাবলীর পাণ্ডুলিপিটা জমা রেখে গেলেন। পেছন থেকে মফিজ চৌধুরী ডেকে বললেন আসো তোমাকে কিছু বলবো না। ছফা তখন বললেন আমি তো পাণ্ডুলিপিই রেখে যাচ্ছি, এর মূল্য দশহাজার টাকা। ঠিক এ সময় মফিজ চৌধুরীর স্ত্রী বের হয়ে এসে বললেন “আসো তোমাকে খাওয়াই একবেলা।” এভাবেই মফিজ সাহেবের সাথে ছফার একটা সম্পর্ক হলো। পরীক্ষায় ভালোভাবে পাশ করে ছফা মফিজ চৌধুরী বাড়িতে গেলেন এবং ঋন পরিশোধ করতে চাইলে মফিজ চৌধুরী বললেন “এগুলো কর্জে হাসানা।” একবার ভেবে দেখুন বর্তমানে কয়জন মানুষ পাবেন মফিজ চৌধুরীর মতো প্রকৃত মানবদরদী এবং ছফার মতো কৃতজ্ঞ মানুষ। ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে এমএ পরীক্ষা দেয়ার আগেই বাংলা একাডেমির পিএইচডি গবেষণা বৃত্তির জন্য আবেদন করেন এবং তিন বছরের ফেলোশিপ প্রোগ্রামের জন্য মনোনীত হন। গবেষণার বিষয় ছিল ‘১৮০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলার মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব, বিকাশ এবং বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে তার প্রভাব’। ১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে এম.এ ডিগ্রি অর্জন করেন ছফা। পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেননি বরং বিসর্জন দিলেন খেয়ালের আবেগে বৃহত্তর মহৎ উদ্দেশ্যে। জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক স্যারের সানিধ্য ছফাকে আরো বেশি নতুনরূপে জাগিয়ে তুলল। গুরু শিষ্যের সম্পর্ক এতটাই মধুর ও ভক্তির ছিল তাঁর গুরু জাতীয় অধ্যাপক রাজ্জাক স্যারকে নিয়েই ছফা লিখে ফেললেন যদ্যপি আমার গুরু। বর্তমানে এ বইটি সর্বমহলে বিশেষ করে বললে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়াদের পছন্দের তালিকায় প্রথমেই স্থান করে নিয়েছে।

ছফার লেখালেখির শুরুর কথা আর দশজন বাঙালির মতোই। বাঙালিরা অমুকের সাথে তমুকের সাথে তুলনা করতে পছন্দ করে, অন্যের সাথে প্রতিযোগিতা করে, নিজের সাথেও প্রতিযোগিতা করে তবে সেটা নিতান্তই কম। ছফার বাবাই মূলত শৈশবের দুরন্তপনার দিনগুলিতে তাঁকে লেখালেখিতে উৎসাহ দেন। ছফার লেখালেখি এক্সিডেন্টের ব্যাপার। খুব ছোটবেলা তিনি ক্লাস থ্রির ছাত্র।

ঐ সময় তাঁদের বাড়িতে বিভূতিরঞ্জন নাথ এসেছিলেন। বিভূতিরঞ্জন নাথ ক্লাস সিক্স অথবা সেভেনে পড়েন। তিনি ঐ বয়সে একটি কবিতা লিখলেন “জিন্নাহ”কে নিয়ে এবং লেখাটি ছাপা হয় একটি পত্রিকায়। এটি জানলেন আহমদ ছফার বাবা এবং বিভূতিরঞ্জনকে দশটাকা দিলেন উপহার হিসেবে। উনি চলে যাবার পর ছফাকে বললেন – ” আমি তোমার দুইটা মাষ্টার রাখছি, একটা ইংরেজি- বাংলা পড়াবার জন্যে, আরেকটা আরবি-ফারসি পড়াবার জন্য, তুমি পারো না কেন ? ”

ছফা বললেন- আমি ছোট মানুষ,পারবো কী করে? বিভূতিরঞ্জন কিন্তু ঐ সময়ের নামকরা কবিয়াল। তখন বাবার ইজ্জত রক্ষা করার জন্য ছফা বললেন- আমিও লিখব। এখন ‘পাকিস্তান’,’জিন্নাহ’ এগুলো অনেক বড় বড় জিনিস, আমি হ্যাণ্ডেল করতে পারি না। ছোট মানুষ তখন। ছফা তখন রামের গল্পটা শুনেছিলেন। মনমোহন পন্ডিতের মা, উনি রামায়ণ পড়াতেন,ছফা শুনতাম। রামের গল্পটা ছফার ভালো লেগেছিলো। তখন একটা কবিতা লিখলেন। কবিতার “রামের পিতৃভক্তি”। সেই কবিতার দুই লাইন হলো –
যেইজন পিতামাতার প্রতি নাহি করে ভকতি
পরকালে হবে তার নরকে বসতি।

ছফার বাবা “রামের পিতৃভক্তি” কবিতাটি শুনলেন এবং এটিকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দেবার জন্য শুক্রবারে মুসল্লিদের সামনে কবিতাটি পড়তে বাধ্য করেন। ঐদিন সমাজের প্রচলিত প্রথা অতিক্রম করলেন বাবার আদেশে। বর্তমানে সময়ে যদি কারো বাবা এইরকম প্রথাভাঙার সাহস করেন তাহলে একটা ঝড় ওঠবে সেই ঝড়ে কী ক্ষতি হবে কে জানে।

ছোটবেলা হতে এভাবেই লেখালেখির হাতেখড়ি হলো আহমদ ছফার। যখন স্কুলে এলেন তখন তাঁর মাঝে কবিতা লেখার ইচ্ছা হলো মানে তাঁর ভেতরে বসবাস করা ঘুমিয়ে থাকা কবি জাগ্রত হলো। জাগ্রত হওয়ার কারণ আহমদ ছফার স্কুলে শিবপ্রসাদ সেন বলে বাংলার টিচার ছিলেন। বাংলা ও ইংরেজি গ্রামার ট্রান্সলেশন পড়াতেন তিনি যাকে খুব পছন্দ করতেন তাকে শালা ডাকতেন এবং কানমলে দিতেন। কিছুদিনের মধ্য ছফাও ঐ শিক্ষকের শালা শ্রেণির মধ্য গণ্য হলেন। তিনি ছফাকে নবীন চন্দ্র সেন,হেমচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়, কায়কোবাদ, বঙ্কিম,মাইকেলের রচনাবলী পড়তে দিলেন। মাইকেল মধুসূদনের উপর ছফার অনুরাগ ছিল প্রবল। ক্লাস এইটে থাকা অবস্থায় অমিত্রাক্ষর ছন্দে লিখলেন-

হে বঙ্গ কবি কূল শিরোমণি শ্রী মধুসূদন
তোমার যাওয়ার পথে বায়ু সম বেগে
আমিও বাসনা করি যেতে,কিন্তু সদা ভয় জাগে
যদি যায় সংকল্প টলিয়া পারিপার্শ্বিক পৃথিবীর চাপে,
যেমতি নদী এসে বাধা পায় শিলাময় পাহাঢ়ের স্তরে
যদি কোনমতে তারে বারেক টলাতে নারে,
হয় প্রবাহিত ভূগর্ভের নিরপেক্ষ স্তরে।

এই ছিল আহমদ ছফার লেখালেখির শুরুর দিক। এখানে দুজন মানুষের অবদান -১। পিতা ২। শিক্ষক। আমাদের জন্য শিক্ষণীয় দিক হলো শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দিন, রচনা করুক যা মন চায়। লিখতে দিন দিন, বিকশিত হবে শিক্ষার্থীর মন- মানসিকতা এবং চিন্তার জগৎ। কোচিং প্রাইভেট টিউশন,পরীক্ষা, Gpa5 এর দুষ্টচক্র হতে মুক্তি দিতে হবে কোমলমতিদের তবেই মুক্তি মিলবে জাতির।

আহমদ ছফা বাংলা সাহিত্যের একজন যুগ সৃষ্টিকারী লেখক ও বুদ্ধিবৃত্তির জাগ্রত কাপ্তান। ছফার প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস সূর্য তুমি সাথী। এটি তিনি জামাল খানের সাথে বাজি ধরেই প্রকাশ করেন দৈনিক সংবাদে। ছফা জামিলকে বলেছিলেন আমি মানিক- নারায়ণের মতো লিখতে পারি। জামাল তখন বললেন যদি প্রকাশ করতে পারো তাহলে একশ টাকা পাবে। ছফাও বাজি ধরলেন এবং সূর্য তুমি সাথীর ফার্স্ট ইনস্টলমেন্ট দৈনিক সংবাদে জমা দিলেন। রণেশ দাশ ছফার লেখাটি প্রকাশ করলেন এবং নিজ বেতনের টাকা হতে সাতাশ টাকা দিলেন। একবার ভেবে দেখুন ঐ সময়ে লেখক, সম্পাদক কতটা উদারমনা ছিলেন। বর্তমান লেখক,সম্পাদক, প্রকাশকদের মধ্যে এরকম সম্পর্কের নজির খুব একটা নেই।

গবেষক সলিমুল্লাহ খান বলেন ” সংগত কারণেই আমরা জিজ্ঞাসা করিতে পারি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর নজরুল ইসলামের যুগ শেষ হইবার মানে ব্রিটিশ শাসন উঠিয়া যাইবার (খাস বিচারে ইংরেজি ১৯৪১-৪২ সালের) পরে কি আমাদের আর কোনো সাহিত্যাদর্শ জন্মায় নাই? এই সওয়ালের দুটি জবাব হইতে পারে। হইতে পারে তুলনীয় কোনো সাহিত্যাদর্শ ইহাদের পরে আর জন্মায় নাই। আবার এমনও হইতে পারে যে জন্মাইয়াছে কিন্তু আহমদ ছফা দেখিতে পান নাই। আপনাদের কাহারও কাহারও মনে পড়িতে পারে এমন একটা যুগও গিয়াছে আমাদের দেশে ‘রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্ত’ জয়ন্তী পালিত হইত। সকলেই পালন করিতেন এমন নয়, কমিউনিস্ট পার্টির কোনো কোনো সহযাত্রী সংঘ-সংগঠন এই মর্মে অঙ্গীকারবদ্ধ ছিলেন। আহমদ ছফা জন্মিয়াছিলেন ১৯৪২ কি ১৯৪৩ সালে। তত দিনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর ইহজগতে উপস্থিত আছেন এমন নহে। নজরুল ইসলামের কর্মজীবনও শেষ। ইহার মধ্যে শত শত সাহিত্য ব্যবসায়ী এই দেশে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন। এই শত শত ব্যবসায়ীর মধ্যে আহমদ ছফাকে আলাদা করিয়া দেখিবার কোনো সার্থকতা আদৌ কি আছে? থাকিলে তাহাই বা কোথায়? আহমদ ছফার যৌবনের প্রধান ঘটনা বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন আর স্বাধীনতা লাভ। বাংলার সাহিত্যের সহিত এই ঘটনার কোনো যোগসূত্র কি আছে? থাকিলে তাহা কোথায়? স্বাধীনতা লাভের পঞ্চাশ বছর পার হইতে চলিয়াছে। কিন্তু আমাদের সাহিত্যে স্বাধীনতা সংগ্রামের আরও গাঢ় ভাষায় বলিতে মুক্তিযুদ্ধের কোন ছায়াটা পড়িয়াছে? সাম্যের, মর্যাদার, ন্যায়ের ছায়াটা কোথায়? সাধের বাংলা ভাষাটা কোন জায়গায় আজ?”

নমস্য গবেষক সলিমুল্লাহ খান যথার্থ বলেছেন। ব্রিটিশ শাসনের অবসান হলো, রবীন্দ্র-নজরুল যুগ শেষ হবার বাংলা সাহিত্যে প্রতিশ্রুতিশীল কোন সাহিত্যের আদর্শ সৃষ্টি হয়নি বরং অগাছা,পঙ্গপালের মত জগাখিচুড়ির ভোজ বিলাসে দীর্ঘ হয়েছিল মৌসুমী লেখক ও প্রকাশকদের সারি।

মৌসুমী লেখক ও অসাধু প্রকাশদের উদ্দেশ্যে একচেটিয়া বইব্যবসা করা তাই এই দুই শ্রেণির কেউ আদর্শ সৃষ্টি করতে পারেনি বরং বলা যায় এই শ্রেণিভুক্ত লেখক-প্রকাশকরাই ডুবে গেছে অন্ধকারে, গহীন অতলে। ছফার যুবককাল আর বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন আর স্বাধীনতা অর্জন একসূত্রে গাঁথা এক মালা। আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের উল্লেখযোগ্য কারণ আমাদের মায়ের ভাষায় কথা বলা এবং স্বাধীন ভূখন্ডে বসবাস করা ইত্যাদি। স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে আমরা দুঃসাধ্য কাজই করেছি তবে আমরা জীবনের সাথে,দেশের সাথে ভাষা ও সাহিত্য যোগসূত্র স্থাপনে এক রকমের ব্যর্থ কেননা নাগরিক জীবনে নেই সত্যিকার স্বাধীনতা, উচ্চ আদালতে নেই বাংলা ভাষার ব্যবহার, উচ্চ শিক্ষায় নেই বাংলা ভাষার ব্যবহার। আদালতে রায় লিখতে বাংলা ভাষার ব্যবহার করা হয়না কারণ আইনের ভাষাগত শব্দ আর বাংলার আকাশ পাতাল ফারাক বা বাংলা ভাষার শব্দ, অর্থের জটিলতার কথা টেনে আনেন। এটা এক ধরনের অজুহাত মাত্র। মানুষের সদিচ্ছাই সব কাজের পথ খুলে দেয়। বাংলা ভাষার অনেক শিক্ষক আছেন, আরো আছে মেধাবী শিক্ষার্থী যাদের নিয়ে তো কাজ করা যায়। ভাষাগত জটিলতা নয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মনের জটিলতাই উচ্চ আদালতে, উচ্চ শিক্ষায় বাংলা ভাষা ব্যবহারে প্রতিবন্ধকতা। আমরা হলাম মৌসুমী ভাষাপ্রেমি, স্বাধীনতার মমি। ২১ ফেব্রুয়ারি, ২৬ মার্চ, ১৬ ডিসেম্বর মানুষের ঢল নামে রাস্তায় তখন মনে হয় ভাষাপ্রেমি দেশমাতৃকার জাগ্রত সৈনিকে ভরপুর রণাঙ্গণ অথচ দিবস শেষে দেখা যায় বাংলাদেশ যেন ধূসরতার নির্জনতায় উটৈর পিঠে চলছে স্বদেশ।

আমাদের দেশে শুধু নেই আর নেই এর দীর্ঘ সারি। আমাদের এটা নেই, ওটা নেই সবাই শুধু মুখেই বলে বাস্তবে স্বীকার করে না বরং দাম্ভিকতা প্রদর্শন করে। এ ব্যাপারে ছফা বলেন “আমাদের দেশের পূর্বসুরী বলতে যাদের বোঝায়, তাদের মধ্যে জ্ঞানে, গুণে – কবি, সাহিত্যিক, লেখক, শিল্পী, বিজ্ঞাণীদের মধ্যে এমন কোন বড় বিশ্বমাপের লোক নেই যাদের চিন্তাধারা অনুসরণ করে বেশিদূর এগিয়ে যাওয়া যাবে। সুতরাং “নেই” এটা মেনে নিয়ে কাজ করলে সুফল পাবার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ কুয়াশার চাইতে অন্ধকার ভালো।”

ছফা যে বললেন কুয়াশার চাইতে অন্ধকার ভালো এটি অনেকেই বুঝেন না এবং বুঝলেও মানতে পারেন না কিংবা নিজ জীবনে অনুসরণ করতে পারেন না বিভিন্ন অজুহাতে কেননা আমাদের শিরায় শিরায় অজুহাতের ভীষণ উৎপাত। কুয়াশার মাঝে চলাচল করা কঠিন একে আবার শীতের তীব্র প্রকোপ অন্যদিকে কুয়াশা কোন কিছুই স্বচ্ছতার সাথে দেখাই যায়, পথচলা তো দূরের কথা।

আমরা সবাই জানি মানুষ সৃষ্টির সেরা কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যায় মানুষের উত্থান-পতন,হিংসা বিদ্বেষ সবই প্রতিবেশির ন্যায় পাশাপাশি অবস্থান করে। মানুষ পরিবারে শিখে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিখে তবু কেন মানুষের সাথে মানুষের নেই সুসম্পর্ক বরং সময়সীমানায় গড়ে তুলে বিভেদের দেয়াল। এ যেন মানুষেরই চরম অসহায়ত্ব, নিজেরাই যেন স্বেচ্ছায় বরণ করেছে দাসত্ব।
আহমদ ছফা বলেন- “মানুষ খুব অসহায়। মানুষ সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হলেও কি হবে, মানুষ খুব মূল্যহীন। এগুলো নিয়ে খুব আস্ফালন করার কিচ্ছু নেই। মানুষ পৃথিবী থেকে অনেক কিছু শিখে। কিন্তু মানুষ আরেকটা জিনিস শিখে না, বিনীত হওয়া শিখে না।”

আমাদের সমাজ জীবনে দেখা যায় যেসকল মানুষ বিনীত তাদের দূর্বল ভাবা হয়, তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা হয়। আমরা দেখি মানুষ প্রতিনিয়ত শিখছে, প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে শিখছে। পরীক্ষা পাশের জন্য,চাকরি পাওয়ার জন্য শিখছে অথচ দেখা যায় বন্ধু মহলে, পারিবারিক পরিমণ্ডলে কিংবা বলা যায় সর্বত্রই মানুষ বিনয় শিখতে পারে না। প্রকৃত শিক্ষার অভাব যেখানে সেখানে বিনয় প্রত্যাশা করাটাও ভুল। আমাদের শিক্ষাকে এখন জীবনমুখী করা প্রয়োজন,পরীক্ষামুখী শিক্ষা শুধু পরীক্ষার্থী গড়ে তুলবে, বিনয়ী মানুষ গড়তে পারবে না। আদিতে বিনয়,মধ্যে বিনয়, অন্তে বিনয় এর চর্চা নেই আমাদের সমাজে বরং চর্চা আছে অন্যায় অবিচার, অপকর্ম, লাঞ্চনা বঞ্চনার।

গবেষক সলিমুল্লাহ খান বলেন, “আহমদ ছফাকে এখনো ৪র্থ দিক থেকে আমরা অবগাহন করিনি,আমরা শুধু ৩ দিক করেছি। দৈর্ঘ্য,প্রস্থ,উচ্চতা মেপেছি। মানুষের একটি ৪র্থ মাত্রা থাকে সেটার নাম সময়।”

আমার দৃষ্টিতে যেকোন মানুষই মূলত তার সময়েই বেঁচে থাকেন তার কর্মের মাধ্যমেই। আহমদ ছফা গত হয়েছিলেন ২০০১ সালের ২৮ জুলাই। জীবিত ছফার চেয়ে মৃত ছফার আবেদন নিবেদন বেশি। এখনো আমাদের মাঝে তিনি বেঁচে আছেন বেঁচে থাকবেন তাঁর ঐতিহাসিক সময়ে তাঁর মহৎ কর্মে আমাদের সময়ের আয়নায় জীবনের অলাতচক্রে পুষ্প বৃক্ষ বিহঙ্গ পুরাণে বুদ্ধিবৃত্তির বিন্যাসের নবধারায় জাগ্রত বাংলাদেশে।

লেখক:
মুস্তাফিজ সৈয়দ
শিক্ষার্থী, ব্যাচেলর অব এডুকেশন, সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, সিলেট।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*