পরিবর্ধিত সংস্করণের ভুমিকা: সাম্প্রতিক বিবেচনা: বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস

উৎসর্গ – আততায়ীর গুলিতে নিহত
কবি হুমায়ুন কবির-এর
স্মৃতির উদ্দেশ্যে

পরিবর্ধিত সংস্করণের ভুমিকাঃ সাম্প্রতিক বিবেচনা

‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ রচনাটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিলো উনিশশো বাহাত্তর সালে। এখন উনিশশো সাতানব্বই। এরই মধ্যে পঁচিশ বছর পেরিয়ে গেছে। যখন লেখাটি প্রকাশিত হয় আমার বয়স বড়জোর আটাশ। বিগত পঁচিশ বছরে এই লেখাটির অনেকগুলো সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে।

স্বাধীনতার অব্যবহিত পরবর্তী সময়ে তৎকালীন পরিবেশ পরিস্থিতি স্নায়ুতন্ত্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করে আমাকে এই লেখাটি লিখতে বাধ্য করেছিলো। দৈনিক গনকন্ঠ পত্রিকায় সতেরোটি কিস্তিতে আমি লেখাটা লিখি। পরে বই আকারে প্রকাশ করি। গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হওয়ার পর লেখাটি নানা লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়। বিশেষ করে রাজনীতি সচেতন তরুণদের কাছে লেখাটি আশাতীত জনপ্রিয়তা লাভ করে। এই পুস্তকে প্রকাশিত নানা মন্তব্য পাঠকদের মধ্যে এতো সাড়া জাগিয়ে তুলেছিলো, সেকালে যাঁরা তরুণ ছিলেন তাঁদের কারো সাথে দেখা সাক্ষাত হয়ে গেলে এই বইটির বিশেষ পংক্তি তাঁরা এখনো আমাকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে থাকেন।

এই রচনাটি লেখার পূর্বে বিশষ ভাবনা চিন্তা করার সুযোগ আমি পাইনি। স্বতঃস্ফুর্ত আবেগে বেবাক রচনাটি লিখে ফেলেছিলাম। লেখার সময় কখনো মনে হয়নি, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আশয় নিয়ে আমি সিরিয়াস একটা পর্যালোচনা হাজির করতে প্রবৃত্ত হয়েছি। যেহেতু এ লেখাটি লিখতে আমাকে কোনো বেগই পেতে হয়নি, তাই কি লিখলাম এ নিয়ে আমি বিশেষ মাথা ঘামাবার প্রয়োজনও বোধ করিনি। আমার অন্যান্য রচনার পেছনে যে শ্রম অভিনিবেশ এবং যত্ন আমাকে বিনিয়োগ করতে হয়েছে, তার ভগ্নাংশও এই রচনার পেছনে ব্যয় করতে হয়নি। তাই এ লেখার সঙ্গে আমার প্রাণের অনুভূতির সংযোগ অতোটা নিবিড় নয়। যদি লোক সমাজে বিশেষভাবে আলোচিত না হতো, হয়তো এই রচনাটির কথা আমিও ভুলে যেতে পারতাম। সৃষ্টিশীল আবেগের সঙ্গে সম্পর্ক রহিত হলেও এই রচনায় আমি এমন কিছু মতামত প্রকাশ করেছিলাম, সমাজ এবং রাজনীতি সচেতন মানুষ, সেগুলোর গুরুত্ব অনুধাবন করেছিলেন। এই বইয়ের পাঠকেরাই আমাকে বারংবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, এ বইটি যেহেতু আমার কলম থেকে বেরিয়েছে সুতরাং গ্রন্থ প্রকাশিত মতামতের দায়দায়িত্বও আমাকে বহন করতে হবে। এখানে আমি সবিনয়ে নিবেদন করতে চাই, আমার সাধ্যমতো সেই দায়দায়িত্ব আমি বহন করছি।

মাঝে মাঝে এমন চিন্তাও আমার মনে আসে, লেখাটি যদি না লিখতাম, হয়তো আমার জীবন অন্য রকম হতে পারতো। এই লেখাটির জন্যই আমাদের দেশের মধ্যবিত্ত শ্ৰেণীভূক্ত এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবীর রোষ আমাকে পেছন থেকে অভিশাপের মতো তাড়া করছে। অদ্যাবধি আমি জীবনে স্বস্তি কি বস্তু তার সন্ধান পাইনি। আগামীতে কোনোদিন পাবো, সে ভরসাও করিনে। তথাপি এই রচনাটি লেখার জন্য এক ধরনের গর্ব অনুভব করি। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরবর্তী বছরগুলোতে অবিচার, অনাচার নির্যাতন, রাষ্ট্রশক্তির সক্রিয় হস্তক্ষেপ যখন সামাজিক বিবেকের করুদ্ধ করে ফেলেছিলো, স্বৈরাচারের প্রবল প্রতাপে উদ্ধত অন্যায় যখন ন্যায়ের বসন পরে অসহায় সমাজের ওপর দ্রুকুটি নিক্ষেপ করেছিলো, রাজরোষের ভয়ে বিবেকবান মানুষ মুক হতবিহ্বল চণ্ড শাসনের সেই নিষ্ঠুর পরিস্থিতিতে আমি জ্বলে উঠতে পেরেছিলাম। এটা অহঙ্কারে স্ফীত হয়ে ওঠার মতো কিছু না হলেও নিতান্ত সামান্য বিষয় মনে করিনে। প্রতিটি দ্রোহ, প্রতিটি প্রতিবাদ, তার শাস্তির দিক যেমন আছে তেমন পুরস্কারেরও একটা ব্যাপার এতে রয়েছে। শাস্তির কথাটা বলেছি। এখন পুরস্কারের কথা বলি। ন্যায়ের পক্ষে যারা কথা বলে, কাজ করে মানবহৃদয়ের স্বতঃস্ফূর্ত সম্মানবোধ তাদের অভিমুখে ধাবিত হয়। এই ছিপছিপে গ্রন্থটি রচনা করার কারণে তরুনতরো প্রজন্মের মনে আমি একটা স্থান করে নিতে পেরেছিলাম। এই লেখাটা নিয়ে পঁচিশ বছর আগে যেভাবে আলোচনা হতো, এখনো নানা জায়গায় সেরকম আলোচনা হতে দেখি। সেই জিনিশটাকেই আমি পুরস্কার বলে ধরে নিয়েছি।

‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ প্রকাশিত হওয়ার পর যখন সকলে লেখাটির তারিফ করতে থাকেন, আমাদের দেশের কৃতবিদ্য লোকদের কেউ কেউ আগ্রহী হয়ে প্রতিবাদী বই পুস্তক লিখতে আরম্ভ করেন। সেগুলো যদি যথার্থ দ্রোহ এবং প্রতিবাদ ধারণ করতে পারতো তাহলে আমিই সবচেয়ে বেশী সন্তোষ বোধ করতে পারতাম। অন্ততঃ মনে করতে পারতাম আমি নেহায়েত অরণ্যে রোদন করিনি। আমার উত্তাপিত কণ্ঠস্বরে সাড়া দেয়ার লোক পাওয়া গেছে। আমি একা নই। কিন্তু আমাকে নিদারুণভাবে হতাশ হতে হয়েছে। এই ভদ্রলোকদের রচনাসমূহে বাকচাতুর্য আছে, কিন্তু প্রতিবাদের আগুন নেই। পণ্ডিতদের এই ধরনের ভাবের ঘরে চুরি করার কসরত দেখ দেখে আমি প্রায় স্থির সিদ্ধান্ত উপনীত হয়েছি, সম্মানের কাঙ্গাল মানুষেরা কি ধরনের সামাজিক উৎপাতের কারণ হতে পারেন। সম্পূর্ণ নিরাসক্ত দৃষ্টিতে যখন আমি বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাসের সঙ্গে পরবর্তীকালে পণ্ডিতদের প্রকাশিত পুস্তকগুলোর তুলনা করি, কেনো জানি আমার সেগুলোকে তাজা বোমার পাশে সার সার ভেজা পটকার মতো মনে হতে থাকে। বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস রচনাটির প্রতি আমার অন্য এক বিশেষ কারণে একটা বিরক্তি বোধ রয়েছে। যথেষ্ট না হলেও সাহিত্যের নানা শাখায় অবশ্যই কিছু দাহিকাশক্তিসম্পন্ন রচনা আমি লিখেছি । এই সকল রচনায় আমার মনন, মেধা এবং শ্রমের অধিকাংশ ব্যয় করেছি। কিন্তু মানুষ অনেক সময়ে আমার সাহিত্যকর্ম বলতে একমাত্র এই ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাসে’র উল্লেখ করে থাকেন। যদিও মুখ ফুটে কিছু বলতে পারিনি, এই জিনিশটি আমাকে খুবই আহত করে। আমি নিজেকেই প্রশ্ন করেছি, লোকে ওই লেখাটার কথা বলে কেনো? আমার অন্যান্য রচনার কি কোনো সাহিত্য মূল্য নেই। আমার অন্যান্য রচনাকে আড়াল করে রাখার জন্য এই বইটির প্রতি একটা চাপা নালিশ সবসময়ই পুষে আসছিলাম।

.

০২.

এই লেখার শুরুতেই জানিয়েছি ‘বুদ্ধিবৃত্তির নুতন বিন্যাস’ প্রথম প্রকাশিত হয়েছিলো উনিশশো বাহাত্তর সালে। এখন সাতানব্বই। মাঝখানে সিকি শতাব্দীর ব্যাবধান। তাৎক্ষণিক প্রয়োজনে কোনো রকমের পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়া লেখা একটি রচনা এই পঁচিশ বছর পরেও কতোটা প্রসঙ্গিক হতে পারে, বইটি পাঠ করতে গিয়ে নতুন করে টের পেলাম । বিশ্বাসই হতে চায় না যে রচনাটি আমি লিখেছিলাম। এই গ্রন্থে যে সকল মতামত প্রকাশিত হয়েছে সেগুলো বাহাত্তর সালে যতোটা প্রাসঙ্গিক এবং সত্য ছিলো, এই সাতানব্বই সালে তাদের তাৎপর্য ক্ষুণ্ণ না হয়ে বরং অনেকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। মুখ্যতঃ সে কারণেই নতুন একটি সংস্করণ প্রকাশের প্রক্কালে নতুন একটি ভুমিকা লেখার প্রয়োজন অস্বীকার করতে পারিনি।

সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশে জাতীয় মধ্যেশ্রেণীভূক্ত বুদ্ধিজীবীরা সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মনিরপেক্ষতা এই রাষ্ট্রীয় চতুঃস্তম্ভের জয়ধ্বনিতে আকাশ বাতাস মুখরিত করে ফেলেছিলেন। রেডিও টেলিভিশনে তোষামোদ, চাটুকারিতা, নিলজ্জ আত্মপ্রচার মানুষের সুস্থ কাণ্ডজ্ঞানকে এক রকম মুছে ফেলতে উদ্যত হয়েছিলো । সন্ত্রাস, গুম, খুন, ছিনতাই, দস্যুতা, মুনাফাখখারি, কালোবাজারী, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্বিচার হত্যা এগুলো একান্তই নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিলো । মানুষের হনন প্রবত্তি, লোভ রিরংসার এরকম নির্লজ্জ আত্মপ্রকাশের সিংহ দুয়ার খুলে দেয়ার ব্যাপারে তৎকালীন সরকার মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলো। এই ধরনের একটি মাৎস্যন্যায় পরিস্থিতিতে বুদ্ধিজীবীদের অবশ্যই একটি পালনীয় ভূমিকা ছিলো, একটা দায়িত্ব ছিলো। কিন্তু তারা সেদিন তাদের ওপর আরোপিত দায়িত্ব কর্তব্য বিস্মৃত হয়ে যাবতীয় অমানবিক কর্মকাণ্ডে সরকারের মদদ দিয়ে নিজেদের আখের গুছাবার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন।

স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে সামগ্রীক পরিস্থিতির এরকম অবনতির বহুবিধ গভীরতরো কারণ নিশ্চয়ই বর্তমান ছিলো এবং সেগুলোর উৎসও ছিলো জাতীয় রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সংস্কৃতির ধারাবাহিক ইতিহাসের গভীরে প্রোথিত। আমি চারদিকে যা ঘটছে খোলা চোখে দেখে প্রতিক্রিয়াগ্রস্ত হয়ে আমার শঙ্কা, সন্দেহ এবং ক্ষোভের অভিব্যক্তি ছাপার হরফে প্রকাশ করেছিলাম। আমি যা লিখেছিলাম, তার একটা বাক্যও আমাকে গবেষণা করে আবিষ্কার করতে হয়নি। আমার চারপাশে যা ঘটছে দেখে, চারপাশের মানুষের মুখের কথা শুনে আমার বয়ানটুকু তৈরি করেছিলাম। আমার মনে হয়েছিলো এ অবস্থা চলতে পারে না, এই মিথ্যার পাহাড় এক সময়ে ধ্বসে পড়তে বাধ্য। আমি এই বইটিতে যে সকল সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছিলাম, তার প্রতিটি বাক্য অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেছে।

শেখ মুজিবুর রহমান বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পথ পরিহার করে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা আরোপ করলেন এবং সর্বময় ক্ষমতার কর্তা হয়ে বসলেন। সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং জাতীয়তাবাদ এই চারটি প্রতীতিকে জাতীয় মূলনীতি হিসেবে নির্ধারণ করলেন বটে, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে সেগুলো একদলীয়, আরো সুনির্দিষ্ট করে বলতে গেলে এক ব্যক্তির শাসন ত্ৰাসনের হাতিয়ারে পরিণত হলো। তার মর্মান্তিক পরিণতি এই হলো যে, শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নিহত হতে হলো। রাষ্ট্রক্ষমতা বেসামরিক একনায়কের হাত থেকে সামরিক একনায়কের হাতে হস্তান্তরিত হলো। একের পর এক সমর নায়কেরা সমাজের পাতাল প্রদেশ থেকে পশ্চাদপদ ধ্যান ধারণা, ধর্মান্ধতা শুধু জাগিয়ে তুলে ক্ষান্ত হননি, সেগুলোর আইনগত স্বীকৃতি দান করে আমাদের জাতীয় জীবনের গন্তব্য অধিকতরো ধোয়াটে এবং কুয়াশাচ্ছন্ন করে তুলেছেন। স্বাধীনতার শুরু থেকেই বুদ্ধিজীবীরা একজোট হয়ে শেখ মুজিবের অগণতান্ত্রিক একদলীয় শাসনের বিরুদ্ধে যদি রুখে দাঁড়াতেন তাহলে আমাদের জাতিকে এতোটা পথ পশ্চাত প্রত্যাবর্তন করতে হতো না। যে কোনো দেশের বুদ্ধিজীবীরা যদি রাষ্ট্রযন্ত্রের অনাচার অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে অসম্মত হন সেই দেশটির দুর্দশার অন্ত থাকে না। বাংলাদেশ সেই রকম একটি দুর্দশাগ্রস্থ দেশ। এই দুর্দশা থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো উদ্যোগ, কোনো প্রয়াস কোথাও পরিদৃশ্যমান নয়।

বর্তমানে সরকার সমর্থক বুদ্ধিজীবীরা যে ভূমিকাটি পালন করছে, তা কিছুতেই বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তর পর্যন্ত সময়সীমার মধ্যে আওয়ামী বাকশালী বুদ্ধিজীবীরা যে কাপুরুষোচিত ভূমিকা পালন করছে, তার চাইতে বেশী আলাদা নয়। তাঁদের কথাবার্তা শুনে মনে হয় বাহাত্তর তেয়াত্তর সাল থেকে টাইম মেশিনে চড়ে তাঁরা এই সাতানব্বই সালে পদার্পণ করেছেন। বাহাত্তর সালে তারা যেভাবে যে ভাষায় অসাম্প্রদায়িকতার কথা বলতেন বাঙালী সংস্কৃতির কথা বলতেন, বাঙালী জাতীয়তাবাদের প্রতি অঙ্গীকার প্রকাশ করতেন; এই সাতানব্বই সালেও তাঁরা একই ভাষায় সেই পুরোনো বুলি গুলো উচ্চারণ করে যাচ্ছেন। পরিবর্তন যেটুকু হয়েছে তাঁদের কণ্ঠস্বর এখন অধিকতরো দ্বিধা এবং জড়িমাহীন। অনেকটা স্বৈরাচারী অবস্থানে দাঁড়িয়ে তাঁরা এই প্রত্যয়সমূহ উচ্চরণ করে যাচ্ছেন। সাজানো মঞ্চে দাঁড়িয়ে মাইনেভোগী নটনটীর মতো সেই পুরোনো কথা বলে যাচ্ছেন তাদের কণ্ঠস্বর থেকে অভব কিংবা উপলব্ধির কোনো তড়িৎ সঞ্চারিত হয় না। তাঁদের উচ্চারণ থেকে কোনো গাঢ় প্রত্যয়ের দীপ্তি জনমানসে বিকীরিত হয় না।

বাংলাদেশের মধ্যশ্রেণীভূক্ত এই ভাড়াখাটা বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে সকলের না হলেও কারো কারো অল্পস্বল্প শৈল্পিক অঙ্গীকার এবং সামাজিক সুকৃতি ছিলো। কিন্তু শাসক দলের চালকলা খেকো বামুনের ভূমিকা পালন করতে গিয়ে তাদের সমস্ত অঙ্গীকার এবং সুকৃতি প্রায় নিঃশেষ করে ফেলেছেন। বর্তমানে তাদের অবস্থা অনেকটা জয় জয় করিয়া বাড়ে রাজার ব্রাহ্মণের মতো । সরকারী বুদ্ধিজীবীদের কেউ কেউ একসময়ে শিল্পকলার নানা বিষয়ে প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। সরকারী সুবিধার বলয়ে প্রবেশ করার পর সর্বত্র তাদের কণ্ঠস্বর ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হতে থাকলো। প্রদর্শন করার যতোগুলো মাধ্যম আছে সবখানে তাদের পবিত্র মুখমণ্ডল আলো করে জ্বলতে থাকলো। সংবাদপত্রের পাতায় পাতায় অমৃতবর্ষী বাণী ছড়িয়ে দিতে লেগে গেলেন। সরকারী প্রচারযন্ত্রের অংশে পরিণত হওয়ার পর এই সকল সৃষ্টিশীল মানুষ সম্পূর্ণরূপে সুকুমার অনুভূতি এবং কল্পনাশক্তি রহিত রোবটে পরিণত হয়েছেন। তাদের অবস্থা দলীয় ক্যাডারের চাইতে অধিক শোচনীয়। কারণ ক্যাডারের কাজ চিন্তা করা নয়, নেতা বা দলের হুকুম তামিল করা। কিন্তু একজন বুদ্ধিজীবীকে চিন্তা করতে হয়। কিন্তু চিন্তার বদলে যদি তিনি চিন্তা করার ভান করেন পরিণতি ভয়ঙ্কর হতে বাধ্য। তাই সরকারী বুদ্ধিজীবীরা যখন বলেন আমরা বাঙালী জাতীয়তাবাদের বিকাশ সাধন করছি, তাদের এই উচ্চারণগুলো সত্য বলে মেনে নেয়ার কোনো যুক্তি নিজেরাও দাঁড় করাতে পারবেন না। সরকারী সুযোগ সুবিধা পাচ্ছেন বলেই যত্রতত্র তারা তোতা পাখির মতো এ বুলিগুলো উচ্চারণ করছেন। তাদের রচনার মধ্যেই মানসিক বন্ধ্যাত্বের চিহ্ন যে কেউ খুঁজে বের করতে পারেন। তারা যখন মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে কথা বলেন শুনে মনে হবে, আবাহনী মোহামেডান টীমের ভাড়া করা বিদেশী খেলোয়াড়দের মতো, তাঁদেরও ভাড়া করে আনা হয়েছে। তারা যখন বাঙালী জাতীয়তাবাদের কথা বলেন শুনে মনে হবে, টেক্সট বই থেকে কথাগুলো মুখস্ত করে হাজেরান মজলিশের শ্রোতাদের সামনে বমি করে দিচ্ছেন। তারা যখন মৌলবাদের বিরুদ্ধে হুঙ্কার তোলেন, সেটাকে গোদা পায়ের লাথির সঙ্গে তুলনা করা যায়। হুঙ্কার দিয়ে কি মৌলবাদ প্রতিরোধ সম্ভব? তাদের মধ্যে স্বচ্ছ চিন্তা কোথায়? চিন্তার সমর্থনহীন ঢোলা উচ্চারণ এবং শোরগোল কি মৌলবাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিষেধক বিবেচিত হতে পারে? এই সকল বুদ্ধিজীবীদের অতীত অত্যন্ত ঘৃণ্য এবং কলঙ্কিত। পাকিস্তান আমল থেকেই রাষ্ট্রশক্তির সহায়তায় তাঁরা ননী মাখন লুট করে এসছেন। তাদের আতীত দিনের কর্মকাণ্ড ঘেঁটে আসল পরিচয় উদ্ঘাটন করা হলে যে কেউ বুঝতে পারবেন তারা কিছুতেই আমাদের জনগণের বন্ধু হতে পারেন না। তাদের উচ্চ কণ্ঠ চিৎকারের মধ্য দিয়ে নির্লজ্জ সুবিধাবাদ ছাড়া অন্য কোনো প্রত্যয়ই ধ্বনিত হয় না। বাহাত্তর সালে তারা যা করেছেন, অধিক জোরের সঙ্গে তার পুনরাবৃত্তি করে চলেছেন মাত্র।

বাহাত্তর সাল আর ছিয়ানব্বই সাল এক নয়। বাহাত্তর সালে প্রতিক্রিয়ার শক্তি ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিলো। মৌলবাদের অবস্থান ছিলো তখন টলটলায়মান। এখন প্রতিক্রিয়ার শক্তি অনেক বেশি সুসংহত এবং সংগঠিত। মৌলবাদ অক্টোপাশের মতো ক্রমাগতভাবে আমাদের সমাজকে চারপাশ থেকে বেষ্টন করে ফেলছে। যারা মৌলবাদী তারা শতকরা একশো ভাগ মৌলবাদী। কিন্তু যারা প্রগতিশীল বলে দাবী করে থাকেন তাদের কেউ কেউ দশ ভাগ প্রগতিশীল, পঞ্চাশ ভাগ সুবিধাবাদী, পনেরো ভাগ কাপুরুষ, পাঁচ ভাগ একেবারে জড়বুদ্ধিসম্পন্ন। এই রকমের একটি সমীকরণের মধ্যে ফেললে বর্তমান সরকার দলীয় বুদ্ধিজীবীদের চিহ্নিত করা সম্ভব। দিনে দিনে প্রতিক্রিয়ার শক্তি যে হারে সংহত হচ্ছে এবং মৌলবাদের প্রতাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে, তথাকথিত প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীরা তার বিরুদ্ধে কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধই রচনা করতে পারেননি। আমাদের জনগণ তাদেরকে চরিত্রহীন, ভ্রষ্ট সুযোগ সন্ধানী এবং আগ্রাসী শক্তির সহায়ক হিসেবে এরই মধ্যে চিহ্নিত করে ফেলেছেন। মুখে তারা যাই বলুন না কেনো, আমাদের জনগণকে মুক্তির দিগন্তে পরিচালিত করার কোনো অনুপ্রেরণা তারা দিতে পারেন না যেমন তেমনি আমাদের জাতিকে আপন মেরুদণ্ডের ওপর থিতু হয়ে মাথা তুলে দাঁড়াবার কোনো কর্মপন্থার নির্দেশ করতেও তারা সত্যি সত্যি অক্ষম। সরকার সমর্থক বুদ্ধিজীবীরাই দেশের একমাত্র বুদ্ধিজীবী নন। যে সকল বুদ্ধিজীবী প্রধান বিরোধীদলটির প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করে মাঠে ময়দানে হুঙ্কার তুলেছেন, যখন তখন যে কোনো উপলক্ষে জমায়েত হচ্ছেন, ভাগে কম পড়ার বেদনাই চীৎকার করে তারা প্রকাশ করে থাকেন। তাদের মনন এবং চিন্তা পদ্ধতি আরো সেকেলে, আরো ভয়ানক। সরকারী বুদ্ধিজীবীদের সামনের দিকে তাকানোর সাহস নেই। কিন্তু এই সকল বুদ্ধিজীবীদের চোখ এবং পা দুই-ই পেছনের দিকে ফেরানো। এক কথায় রাষ্ট্রযন্ত্রের এপাশে ওপাশে যে সমস্ত বুদ্ধিজীবীর অবস্থান তারা জাতি এবং সমাজকে কিছু দেন না, বরং গবাদি পশুর গায়ের এটুলি পোকার মতো সমাজের মানুষের রক্তপান করে নিজেরা মোটা তাজা হতে থাকেন।

দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল এবং ছদ্মবেশী প্রগতিশীল এই উভয় গোষ্ঠীকে পরাজিত করতে না পারলে আমাদের দেশে প্রগতিশীল সংস্কৃতি এবং রাজনীতির উত্থান অসম্ভব। আমাদের দেশের প্রগতিশীল রাজনীতির যে অবস্থা তার সঙ্গে খাটে শোয়া মুমূর্ষ রোগীর তুলনা করা চলে। যার অস্তিত্ব আছে বলে শোনা যায়, কিন্তু তার নড়াচড়া নেই। বামপন্থী রাজনীতির এই করুণ পলায়মান এবং জরাজীর্ণ দশা আমাদের জাতীয় জীবনের সর্বাঙ্গীন দুর্ভাগ্যেরই ইঙ্গিত নির্দেশ করে। সুতরাং বর্তমান অবস্থা থেকে প্রগতিশীল রাজনীতি এবং সংস্কৃতিকে উঠে আসতে হলে ছদ্মবেশী প্রগতিশীল এবং মৌলবাদী উভয় গোষ্ঠিকেই পরাজিত করতে হবে। কিন্তু কাজটি সহজ নয়। এই সময়ের মধ্যে আমাদের সমাজ অনেক জটিল হয়ে পড়েছে, বিরাজমান রাজনীতি, অর্থনৈতিক সংগঠন, রাষ্ট্রের চেহারা সাংস্কৃতিক আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য,ধর্মীয় সামাজিক বদ্ধমত এবং সংস্কারের অনেক কিছু ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে সংগ্রামের গতিপথটি ছকিয়ে নিতে হবে। যে সকল বিষয় পঁচিশ বছর আগে স্পর্শ করার প্রয়োজন বোধ করিনি, নতুন একটি সংস্করণ প্রকাশ করার সময় সে বিষয়গুলো নতুন করে শনাক্ত করার চেষ্টা করছি।

.

০৩.

‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাসে’ তৎকালীন রাজনীতির ভালো মন্দ সম্পর্কে কোনো আলোচনাই করা হয়নি। কারণ এ ব্যাপারে আমার মনে সংশয় ছিলো। সেই পরিবেশ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের চরিত্র আলোচনার সুযোগও ছিলো না। বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির চরিত্র কি হবে জন্মলগ্নে তার একটি পরিচয় নির্ণয়ের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিলো। সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ এবং ধর্ম নিরপেক্ষতা এ চারটি মূলনীতির ভিত্তিতে রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হবে বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছিলো। বাংলাদেশের তৎকালীন সমাজের বাস্তব অবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় আদর্শের ফাঁকা বুলির মধ্যে পার্থক্যের পরিমাণ এতো অধিক ছিলো যে এক বছর সময়ের মধ্যেই আমার কাছে প্রতীয়মান হয়েছিলো, এ জিনিশ চলবে না, চালানো যাবে না। একটা বিপত্তি ঘনিয়ে আসছে। বাতাসে আমি তার গন্ধ শুঁকেছিলাম। কার্যকারণ সম্পর্ক বিচারের অবকাশ হয়নি। একজন লেখক হিসেবে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে এই সমূহ সর্বনাশের সংকেত আমার মনে জ্বলে উঠেছিলো।

পরবর্তীতে অল্পদিন না যেতেই দেখা গেলো শেখ মুজিবুর রহমান সংবিধান পরিবর্তন করে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর স্থলে রাষ্ট্রপতি হয়ে বসলেন। সংসদীয় গণতন্ত্রের পন্থা পরিহার করে একদলীয় শাসন কায়েম করলেন। তারপর মুজিবের শাসন তিন বছর পূর্ণ হওয়ার পূর্বেই তিনি সপরিবারে মর্মান্তিকভাবে নিহত হলেন। একজন বা একাধিক ব্যক্তির হত্যার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের পরিচয় পাল্টে যাওয়ার দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে অধিক নেই । অথচ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেই ব্যাপারটিই ঘটেছে। সমাজতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতার এই প্রত্যয় দুটো সংবিধান থেকে ঝরে পড়লো। বেশ কিছুদিন সামরিক শাসন চালু থাকার পর জিয়াউর রহমান যখন পুনরায় বহুদলীয় সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রবর্তনের উদ্যোগ গ্রহণ করলেন, সংবিধানের শিরোভাগে বিসমিল্লাহির রাহমানির রহিম এসে স্থান করে নিলো। রাষ্ট্রের চরিত্রের আমূল পরিবর্তন ঘটে গেলো। জিয়াউর রহমনের পর হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতায় এসে ইসলাম ধর্মকে বাংলাদেশের একমাত্র রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিয়ে বসলেন।

মুজিব পরবর্তী বাংলাদেশের শাসকবৃন্দ ঘোষণা দিয়ে রাষ্ট্রীয় সংবিধানের মধ্যে যেমন পরিবর্তন এনেছেন, তেমনি রাষ্ট্রায়ত্ব শিল্প-বাণিজ্যের প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক-বীমা এগুলো ব্যক্তি মালিকানায় ছেড়ে দেয়ার প্রক্রিয়া চালু করেন। জিয়াউর রহমান তার শাসনামলে শিল্প প্রতিষ্ঠান ব্যক্তির হাতে ছেড়ে দেয়ার প্রক্রিয়াটি শুরু করেন। এরশাদের আমলে এসে সেই প্রক্রিয়াটিই অত্যন্ত জোরে-শোরে অনুসৃত হতে থাকে। সামরিক শাসক এরশাদের পতনের পর জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে খালেদা এলেন। খালেদাকে পরাজিত করে হাসিনা। এই বারংবার ক্ষমতার হাত বদলের মধ্যেও রাষ্ট্রীয় পুঁজি ব্যক্তির হাতে স্থানান্তরের প্রক্রিয়াটি প্রতিটি নতুন সরকারের আমলে অধিকতরো বেগবান হয়েছে। বর্তমান শেখ হাসিনার আমলেও যে অল্পস্বল্প পুঁজির নিয়ন্ত্রণভার সরকারের হাতে আছে, ব্যাংক-বীমা ইত্যাকার যে প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিক খোদ সরকার, সেগুলো ব্যক্তি মালিকদের হাতে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য আই এমএফ, বিশ্বব্যাংক এই সমস্ত আন্ত র্জাতিক অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান নিরন্তর চাপ প্রয়োগ করে আসছে।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির আসল স্বরূপ নিয়ে যে বিতর্ক সাম্প্রতিককালে কতিপয় জাতীয় প্রতীককে ঘিরে ঘনীভূত হয়েছে মোটা দাগে সেগুলো এরকম। জাতি হিসেবে বাংলাদেশীদের পরিচয় কি হবে? বাঙালী না বাংলাদেশী? বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের পরিচয় মুসলমান না বাঙালী? বাংলাদেশীরা জয়বাংলা বলবে না বাংলাদেশ জিন্দাবাদ বলবে, শেখ মুজিবুর রহমান যার নেতৃত্বে বাংলাদেশের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের সংগ্রাম ধাপে ধাপে বিকশিত হয়ে স্বাধীনতা সগ্রামে রূপ লাভ করেছে, কোন পরিচয়ে তাকে চিহ্নিত করা হবে? তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রের স্থপতি? নাকি বাঙালী জাতির জনকের অভিধায় চিহ্নিত হবেন? বর্তমান বাংলাদেশের দুটি প্রধান দল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জতীয়তাবাদী দল এই সমস্ত প্রতাঁকের মধ্যেই তাদের অন্তর্গত বৈপরীত্য এবং মতাদর্শগত বিরোধ সন্ধান করছে । যে প্রতীকগুলো নিয়ে দুটি প্রধান দলের মধ্যে বিরোধ বিসংবাদ চলছে, সেই প্রতীকগুলোর ভাবার্থ এবং গভীর ব্যঞ্জনা নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে খতিয়ে দেখলে কোনো বৈপরীত্য আবিষ্কার করা সত্যি সত্যি অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। আমরা বাঙালী একথা যেমন সত্য, তেমনি আমাদের বাংলাদেশী পরিচয়ও মিথ্যা নয়। সংখ্যাধিক জনগোষ্ঠীর মুসলমানিত্বের পরিচয় বাঙালীত্বের পরিচয় খারিজ করে না। জয় বাংলা এবং জিন্দাবাদ শব্দটির মধ্যে অর্থগত কোনো বিরোধ না থাকলেও মুক্তিযুদ্ধের সময় জয়বাংলা শব্দবন্ধটি একটি বিশেষ তাৎপর্য লাভ করেছিলো, সেকথা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। যেহেতু আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের মূল নেতৃত্বের দাবীদার, সেই সুবাদে জয়বাংলা শব্দবন্ধটি তাঁরা একচেটিয়াভাবে ব্যবহার করে থাকেন। অন্য কোনো ব্যক্তিবর্গ যদি আওয়ামী লীগ বিরোধী একটি রাজনৈতিক সংগঠন দাঁড় করিয়ে জয়বাংলা শব্দটিকে ব্যবহার করতে থাকেন, আওয়ামী লীগের তরফ থেকে আপত্তি উত্থাপন করার কোনো কারণ কি থাকতে পারে? যদি বাংলা ভাষার শব্দ হওয়ার কারণে জিন্দাবাদের বদলে জয় বাংলার গ্রহণযোগ্যতা অধিক হয়ে থাকে, সে ক্ষেত্রে অবশ্যই প্রশ্ন উঠবে, আওয়ামী লীগ শব্দবন্ধটিও বাংলা নয়। আওয়ামী শব্দটি উর্দু এবং লীগ শব্দটি ইংরেজী । তারপরে শেখ মুজিবুর রহমানের কথা ধরা যাক। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি না বাঙালী জাতির জনক? মুজিবকে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি হিসেবে মেনে নিলে কারো কোনো বিতর্কের অবকাশ থাকে না। কিন্তু তাঁকে বাঙালী জাতির জনক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলে আরো একটি প্যাচালো বিতর্কের জন্ম দেয়া হয় মাত্র। বাংলাদেশের বাইরে ভারতের নানা জায়গায় বাঙালীরা বসবাস করে থাকেন। তারা শেখ মুজিবকে বাঙালী জাতির জনক হিসেবে মেনে নিতে স্বীকৃত হবেন না। প্রকৃত অর্থে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ভূখণ্ডটিই স্বাধীন হয়েছে। তাকে যদি জাতির জনক হিসেবে মেনেও নিতে হয়, বাংলাদেশী জাতির জনক বলাই অধিকতররা সঙ্গত। তাই যদি হয়, তাহলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার দাবীই প্রকারান্তরে স্বীকার করা হয় নাকি? বাংলাদেশী বলে কোনো জাতি যেমন নেই, তেমনি কোনো পিতাও থাকতে পারে না।

উনিশশো একাত্তরের মুক্তি সংগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশে যে নতুন একটি রাষ্ট্র জন্ম নিয়েছে তার ভেতরের যে সংকট তার সঙ্গে সাম্প্রতিক কালে দুটি প্রধান দলের মধ্যে যে প্রতীকী বিরোধ চলছে তার সম্পর্ক নিতান্তই ক্ষীণ। আসলে যাহা জল তাহাই পানি। বাংলার হিন্দুরা পানিকে জল বলে। আর বাংলার মুসলমানেরা জলকে পানি বলে। আবার বাংলার বাইরে হিন্দু মুসলমান সবাই জলকে পানিই বলে থাকে। পানি শব্দটি সংস্কৃত থেকে এসেছে। জল বাংলা শব্দ। জল পানির মধ্যে মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। তারপরেও দীর্ঘদিন পর্যন্ত বাংলার হিন্দু মুসলমানের বিরোধ জল অথবা পানি শব্দ দুটো উচ্চারণের মধ্য দিয়েই প্রতীকী ব্যঞ্জনা লাভ করেছে। সংকটের আসল এলাকাকে পাশ কাটিয়ে প্রতাঁকের মধ্যে বিরোধ আবিষ্কার করার প্রবণতার কারণ বীজ বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির জন্য প্রক্রিয়ার মধ্যেই অনুসন্ধান করতে হবে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দলটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দান করার কৃতিত্ব দাবী করে থাকে। দলটির এ দাবী একটুকুও অসঙ্গত নয়। তা সত্ত্বেও এ কথাটি অসত্য নয় যে সমস্ত নেতা আওয়ামী লীগের জন্ম প্রক্রিয়াটি সূচীত করেছিলেন, তাঁরা সকলেই পাকিস্ত নি আন্দোলনের নেতৃত্বদান করেছিলেন। আওয়ামী লীগের প্রধান স্থপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং শেখ মুজিবুর রহমান এই তিন ব্যক্তিত্ব পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় প্রণিধানযোগ্য ভূমিকা পালন করেছেন। পাকিস্তানের পশ্চিম অংশের কাছ থেকে ন্যায্য অংশ আদায় করার দাবীতে তারাই আবার আওয়ামী লীগ সংগঠনটি দাঁড় করিয়েছেন। আপোষ আলোচনার মাধ্যমে ন্যায্য দাবী আদায় করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিলো বলে, আওয়ামী লীগকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠমো থেকে বাংলাদেশকে বিচ্ছিন্ন করার দায়িত্ব স্বীকার করে নিতে হয়েছে।

নির্মোহভাবে দৃষ্টিপাত করলে একটা বিষয় সকলের চোখে স্পষ্টভাবে ধরা পড়বে। আওয়ামী লীগ এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের রাজনীতির মধ্যে যে সকল চিন্তা চেতনা ক্রিয়াশীল সেগুলোকে অতীতের পাকিস্তানী রাজনীতির জের কিংবা সম্প্রসারণ বলে অভিহিত করলে খুব বেশি অন্যায় হবে না। মুসলিম লীগের বীজতলা থেকেই আওয়ামী লীগের জন্ম এবং দলটি মুসলিম লীগের রাজনীতির বেসামরিক ঐতিহ্যের ধারক বাহক। যতদিন পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে একটি মধ্য শ্রেণীর বিকাশ হয়নি, আওয়ামী লীগের সমর্থন এবং আনুগত্য কম্পাসের কাঁটার মতো পশ্চিমের দিকে হেলে থাকতো। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর উত্তরাধিকার ধারণ করছে একথা বললেও খুব একটা মিথ্যা বলা হয় না। যদিও এরই মধ্যে দলটিতে অনেক নতুন উপাদান সংযোজিত হয়েছে, তথাপি জন্ম প্রক্রিয়ার সেই প্রাথমিক বোধগুলো এখনো সক্রিয়। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল যে উৎস থেকে জন্ম লাভ করেছে, সেই একই উৎস থেকে জাতীয় পার্টিরও উদ্ভব। তারতম্যের পরিমাণ নির্ভর করছে অন্যান্য সামাজিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ওপর। বাংলাদেশটির দুর্ভাগ্য হলো এই যে, দেশটির প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে বিপুল পরিমাণ অতীতের দায়ভার বহন করতে হচ্ছে। অতীতের ভূত কাঁধ থেকে ঝেড়ে ফেলে বর্তমানের নিরিখে কর্মকাণ্ড নির্ধারণ করার কোনো লক্ষণ পরিদৃশ্যমান হচ্ছে না। অতীতের ধারাবাহিকতার সূত্র ধরেই তারা দেশটা শাসন করতে চান। তাই প্রধান দুটো রাজনৈতিক দলের আচরণের মধ্যে ভারত এবং পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য এতোটা প্রাধান্য বিস্তার করে থাকে, তার মধ্যে বাংলাদেশ কততটা উপস্থিত সেই জিনিশটিই দুর্ভাবনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো বাংলাদেশের যে একটি আত্মা আছে, তা আবিষ্কার করতে সক্ষম নয়। সে কারণে সামাজিক শ্রেণীবিন্যাসগত বিভেদ পাশ কাটিয়ে শব্দ বা শব্দবন্ধ নিয়ে কলহ করে সময় যাপন করে থাকেন।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি জন্মাবার পেছনে ধারণাগত একটা ভ্রান্তি অদ্যাবধি প্রবলভাবে বিরাজমান। বলা হয়ে থাকে ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতর থেকে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তার দাবীতে এই রাষ্ট্রটির উত্থান হয়েছে। মুহম্মদ আলী জিন্নাহ দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রটির জন্য সুনিশ্চিত করেছিলেন। বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি মুসলমান হিন্দু দুটি আলাদা জাতি, এই প্রত্যয়টি খারিজ করে দিয়ে জন্ম লাভ করেছে। শুধু এটুকু যদি বলা হয় সম্পূর্ণ সত্য বলা হয় না। একটু ইতিহাসের পেছনে যাওয়া প্রয়োজন। এক সময়ে ভারতবর্ষের হিন্দু এবং মুসলমান একটি রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে বসবাস করতে সম্মত হয়নি বলেই ভারত এবং পাকিস্তান দুটি আলাদা রাষ্ট্রের জন্ম সম্ভাবিত হয়েছে। মুহম্মদ আলী জিন্নাহ দাবী করেছিলেন, ভারতের মুসলমানেরা নিজেরাই আলাদা একটি জাতি। সুতরাং একটি স্বতন্ত্র বাসভূমি পাকিস্তান প্রয়োজন। অন্যদিকে মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু এবং মাওলানা আবুল কালাম আজাদ প্রমুখ নেতা দাবী করেছিলেন, ভারতের সব সম্প্রদায়ের জনগণ মিলেই একটি জাতি। সুতরাং ভারতকে হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে ভাগ করা কখনো উচিত হবে না। তারপরেও দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতকে বিভক্ত করা হয়েছিলো এবং মুসলমানদের একটি স্বতন্ত্র বাসভূমির দাবী পাকিস্তানকে ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। সিকি শতাব্দীর মধ্যেই পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি জন্ম নিলো । জিন্নাহ সাহেবের দ্বিজাতিতত্ত্ব সম্পূর্ণভাবে মিথ্যা হয়ে গেলো। কথাটি এতোই দিবালোকের মতো সত্য যে, এ নিয়ে আর কোনো তর্ক চলতে পারে না।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ভারতের কংগ্রেস দলীয় তাত্ত্বিকেরা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের এই মতাদর্শগত ভিত্তিটির ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। তাঁদের প্রচার প্রোপাগাণ্ডার ধরনটি থেকে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বেরিয়ে এসেছিলো। ভারতের জাতীয় কংগ্রেস সকল ভারতীয় জনগণের এক জাতিত্বের যে দাবী তুলে ধরেছিলো, বাংলাদেশের জন্মের মধ্য দিয়ে সেই জিনিশটিই আবার নতুন করে প্রমাণিত হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলটির অনুসারী শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবীদের বেশিরভাগই বাংলাদেশের জন্মকে মুহম্মদ আলী জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্বের ভ্রম সংশোধন বলে ব্যাখ্যা করে আসছেন। কিন্তু এই ব্যাখ্যাটির মধ্যে একটা শুভঙ্করের ফাঁক বরাবরই থেকে যাচ্ছে। অবশ্যই প্রশ্ন করা প্রয়োজন, ভারতের হিন্দু মুসলমান দুটি জাতি আলাদা এটা যেমন সত্য নয়, তেমনি সত্য নয় ভারতের সবজাতি মিলে একজাতি। কংগ্রেস তাত্ত্বিক এবং তাঁদের বাংলাদেশী সাগরেদদের ব্যাখ্যা মেনে নিলে বাংলাদেশের একটা রাষ্ট্রিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার কোনো প্রয়োজন নেই। ভারতের মধ্যে বিলীন হয়ে যাওয়াই বাংলাদেশের রাষ্ট্রিক নিয়তি। বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবীদের অনেকেই অবচেতনে হলেও এই ব্যাখ্যাটি সত্য বলে মনে করে থাকেন। তাই তাঁদের মধ্যে এমন একটা ভারতমুখীনতা লক্ষ্য করা যায়, যার অর্থ পরিষ্কার এ রকম দাঁড়াবে-বাংলাদেশ রাষ্ট্র একটি খণ্ডকালীন অস্তিত্ব মাত্র।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে ভারতবর্ষের মানচিত্রে বারবার অদলবলদ ঘটেছে। যদি আরেকবার ঘটে তাতে বাধা কোথায়? একই রকম ভাঙচুর বাংলার মানচিত্রেও ঘটেছে। আরেকবার যে ঘটবে না, সে কথা জোর করে বলার উপায় কি? কিন্তু প্রশ্নটা একটু ঘুরিয়ে করলে সম্পূর্ণ ভিন্ন রকম জবাব শোনার জন্য তৈরি থাকতে হবে। ভারতের বাঙালী, পাঞ্জাবী, উড়িয়া, বিহারী, কাশ্মীরি, আসামী সকলে মিলে কি একটা জাতি? ভারতীয় যে অধিজাতিত্বের ধারণা বৃটিশ বিদায়ের প্রাক্কালে তৈরি করা হয়েছিলো, সেটা কি এখন ধোপে টেকে? পাঞ্জাব, কাশ্মির, আসাম, নাগাল্যাণ্ড, অরুণাচল এই সকল রাজ্যে একসার অগ্নিগিরির মতো স্বাধীনতা এবং স্বায়ত্বশাসনের দাবীতে জনগণের সংগ্রাম যেভাবে প্রচণ্ড রোষে ফেটে পড়েছে, সেটা কি সমস্ত ভারতীয় জনগণের এক জাতিত্বের প্রতি আনুগত্যের পরিচায়ক? ভারতের রাষ্ট্র নায়কেরাও আত্মবিশ্বাস সহকারে ভবিষ্যদ্বাণী করতে অক্ষম, ভারত একজাতি হিসেবে চিরকাল অস্তিত্ব রক্ষা করতে পারবে।

ওপরের আলোচনা থেকে একটি সত্য বেরিয়ে আসে। ভারতবর্ষ শুধুমাত্র হিন্দু মুসলমান দু’জাতির দেশ যেমন নয়, তেমনি একজাতির দেশও নয়। বহু জাতি, বহু ভাষা, বহু বর্ণ, বহু ধর্ম, অঞ্চল এবং নানা জনগোষ্ঠীর আবাসভূমি হিসেবে ইতিহাসের শুরু থেকেই তার অস্তিত্ব রক্ষা করে আসছে। বৃটিশ বিদায়ের প্রাক্কালে দুর্বলতরো জাতি, সম্প্রদায় এবং জনগোষ্ঠীগুলো তাদের দাবী উধ্বে তুলে ধরতে পারেনি বলেই একটি জগদ্দল রাষ্ট্রের বোঝা তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে, ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যে সবাইকে ধারণ করা সম্ভব হচ্ছে না, কাঠামোতেই টান লাগছে।

উনিশশো বাহান্ন থেকে শুরু করে একাত্তর পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশের যতোগুলো আন্দোলন হয়েছে, যতো ধরনের গণসংগ্রাম রচনা করেছে তার একটা ইতিবাচক প্রভাব ভারতের নির্যাতিত অঞ্চল এবং জনগোষ্ঠীর ওপর অনিবার্যভাবে পড়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, বাংলাদেশের উনিশশো বাহান্ন সালের ভাষা আন্দোলনের পরে আসাম, অন্ধ্র ইত্যাদি অঞ্চলে ভাষা আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে। বাংলাদেশের স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন এবং স্বাধীনতা সংগ্রাম ভারতের পাঞ্জাব এবং কাশ্মিরের মতো বিচ্ছিন্নতাকামী রাজ্যসমূহের জনগণের ভারত ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে এসে আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র। প্রতিষ্ঠার সগ্রামে প্রেরণার উৎস হিসেবে ক্রিয়াশীল ভূমিকা পালন করেছে।

একটা বিষয় শুরু থেকেই পরিষ্কার করে নেয়া প্রয়োজন। নানা অপূর্ণতা ও সীমাদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সংজ্ঞা অনুসারে ভারত উপমহাদেশের মধ্যে বাংলাদেশ সব চাইতে আধুনিক রাষ্ট্র। ভাষাভিত্তিক জাতি রাষ্ট্র বাংলাদেশের উত্থান আধুনিক ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে সব চাইতে অভিনব ঘটনা। বাংলাদেশ জাতি রাষ্ট্রের আদর্শ উর্ধ্বে তুলে ধরে তাবত ভারত উপমহাদেশের অবহেলিত অঞ্চল এবং জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে এবং দিনে দিনে সে প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে। জাতি রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের উত্থান স্বীকার না করে যারা শুধুমাত্র জিন্নাহ সাহেবের দ্বিজাতিতত্ত্বের ভ্রম সংশোধনকেই বাংলাদেশের জন্মের কারণ মনে করেন; জ্ঞাতসারে কিংবা অজ্ঞাতসারে এমন একটা ভ্রান্তির মধ্যে নিজেদের নিক্ষেপ করেন, চূড়ান্ত বিচারে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অস্তিত্বকেই একটা খণ্ডকালীন ব্যাপার বলে মেনে নিতে তারা কদাচিত দৃষ্টভঙ্গীগত বিভ্রান্তি থেকে মুক্ত হতে পারেন। বাংলাদেশ ভাষাভিত্তিক জাতি রাষ্ট্রের গন্ত ব্যটি দ্বৰ্থহীনভাবে আমাদের জনগোষ্ঠীর মনে অনপনেয়ভাবে গেঁথে দেয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ লেখাটির একটি বিশেষ পর্যায়ে প্রান্তিক জাতিসমূহের ওপর যে নির্যাতন নিপীড়ন চলে আসছে তার একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা আমি হাজির করেছিলাম। সাম্প্রতিক বিবেচনা যখন তৈরি করছি উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ের সগ্রাম একদিকে যেমন একটি দীর্ঘস্থায়ী জনযুদ্ধের আকার পেয়েছে, তেমনি অন্যদিকে শক্তিশালী প্রতিবেশীর আগ্রাসী তৎপরতার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে। শুরুতে উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকার স্বীকার না করার মনোভাব থেকেই এই সঙ্কটের জন্ম হয়েছে। আসলে আমাদের নিপীড়িত জনগণের জীবনের যে মূল সঙ্কট, উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্কট তার চাইতে খুব একটা বিচ্ছিন্ন নয়। তাদের বিশেষ বিশেষ অধিকারের সাংবিধানিক স্বীকৃতিদানের মাধ্যমে তাঁদের আস্থা অর্জন করার এখনই প্রকৃষ্ট সময়। বিলম্বে অনর্থপাত ঘটে যেতে পারে।

.

০৪.

অর্থনীতি রাজনীতির মূল চালিকা শক্তি। রাজনীতির চেহারাটি কি দাঁড়াবে নেপথ্যে অর্থনীতিই নির্ধারণ করে দেয়। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতির দিকচিহ্নহীনতা এবং গণবিরোধী চরিত্র সেটাকে বাংলাদেশের অচলবন্ধ্যা অর্থনীতির যথার্থ প্রতিফলন বললে খুব বেশি বলা হয় না। অনড় স্থবির গতিহীন অর্থনীতিই রাজনীতিতে ক্রমাগত সংঘাত ডেকে আনছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি এমন একটা দুষ্টচক্রের মধ্যে আটকা পড়ে আছে, সেখান থেকে উত্তরণের কোনো সম্ভাবনা পরিদৃশ্যমান নয়।

বাংলাদেশের জনগণ মূখ্যতঃ অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করার তাগিদেই মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো। পশ্চিম পাকিস্তানের শোষকগোষ্ঠী পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানকে উপনিবেশ হিসেবে ব্যবহার করে আসছিলো। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ করে পাকিস্তানের শ্রীবৃদ্ধি ঘটেছে বিস্তর। পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলের অর্থনীতিতে উন্নয়নের কোনো উদ্যোগই গ্রহণ করা হয়নি। এখানকার আদিম কৃষিনির্ভর অর্থনীতির কোনো রূপান্তর ঘটানো হয়নি একথা যেমন সত্য, তেমন পূর্বাঞ্চলের কৃষিপণ্যের থেকে মুনাফা অর্জন করে পশ্চিমারা তাদের অঞ্চলে সম্পদের পাহাড় গড়েছে তাও সত্য। এখানে কলকারখানা স্থাপন করা হয়নি, শিল্পবাণিজ্য বিকশিত করে তোলার সুচিন্তিত পদক্ষেপ কখনো গ্রহণ করা হয়নি। একটি কৃষিভিত্তিক অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য যে একটি পরিকল্পিত উন্নয়ন পরিকাঠামো প্রয়োজন, সে ব্যাপারে একেবারেই নজর দেয়া হয়নি। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে অল্পস্বল্প যে শিল্প কারখানা গড়ে তোলা হয়েছিলো, সেগুলোর মালিক ছিলেন পশ্চিমারা। পূর্বাঞ্চলের সস্তা কাঁচামাল এবং শ্রমিকের স্বল্প মজুরীর ওপর নির্ভর করে পশ্চিম পাকিস্তানের শিল্পপতিরা নিজেদের সহজ মুনাফা আয় করার তাগিদেই এই অঞ্চলে কিছু কিছু শিল্পকারখানা স্থাপন করেছিলেন। এই সব শিল্পকারখানার লভ্যাংশ এই অঞ্চলে বিনিয়োজিত না হয়ে পশ্চিমে চলে যেতো। পাকিস্তানের বাইশটি প্রধান পুঁজিপতি পরিবারের মধ্যে মাত্র একটিই ছিলো পূর্বাঞ্চলে। পাকিস্তানে যে পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ এবং সাহায্য পশ্চিমের ধনী দেশগুলো থেকে আসতো, তার সিংহভাগ ব্যয় করা হতো পশ্চিম পাকিস্তানে। সুফল যেটুকু, ভোগ করতো পশ্চিমারা। পূর্ব পাকিস্তানকে বইতে হতো বৈদেশিক ঋণের দায়ভাগ। তঙ্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ পশ্চিমাদের এই অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়ে প্রতিবাদ করেছেন, আন্দোলন করেছেন। আলাপ আলোচনার মাধ্যমে তাদের ন্যায্য হিস্যা আদায় করা যখন অসম্ভব বলে মনে হয়েছে, তখনই পূর্ব পাকিস্তানের জন্য স্বতন্ত্র একটা অর্থনীতি নির্মাণের কর্মসূচী গ্রহণ করে রাজনৈতিক সংগ্রামে নেমেছেন। মূলতঃ আওয়ামী লীগের ছয় দফা কর্মসূচী ছিলো পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের একটা স্বতন্ত্র অর্থনীতি নির্মাণের দলিল। পশ্চিমারা বরাবরই এই ন্যায্য অধিকারের দাবীকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ষড়যন্ত্র বলে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছে। সত্তরের নির্বাচনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ ছয় দফার পক্ষে আওয়ামী লীগকে ভোটের মাধ্যমে নিরঙ্কুশভাবে বিজয়ী করলেও পশ্চিমারা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে রাজি হয়নি। অধিকন্তু পশ্চিমা সামরিক জান্তা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের প্রতিরোধের ব্যুহ চুরমার করে ফেলার জন্য রাতের অন্ধকারে তৎকালীন নিরীহ নিরস্ত্র জনগণের ওপর আক্রমণ চালিয়ে বসেছে। পাকিস্তানী সৈন্যদের হামলার ফলে পাকিস্তানের ঐক্য রক্ষা করার শেষ সম্ভবনাটির অবসান ঘটলো এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণকে একটি অসম যুদ্ধ ঘাড়ে করে নিতে হলো।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিকাশের সঠিক বিশ্লেষণের জন্য পেছনের ইতিহাসটুকু জানা অবশ্যই প্রয়োজন। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বিজয় অর্জন হওয়ার পরে যে রাষ্ট্রটি বাংলাদেশে আত্মপ্রকাশ করলো, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মনিরপেক্ষতার সঙ্গে সমাজতন্ত্রকেও সে রাষ্ট্রের একটা মূল স্তম্ভ বলে ঘোষণা করা হলো। বাংলাদেশে একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সৃষ্টি করার পূর্বশর্তসমূহ হাজির ছিলো না। মুক্তিযুদ্ধের প্রধান শক্তি আওয়ামী লীগ তেমন দলও ছিলো না। তথাপি আওয়ামী লীগ সরকার সমাজতন্ত্রকে রাষ্ট্রীয় প্রধান নীতিমালার একটি হিসেবে ঘোষণা দিলো এবং একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করতে হলো।

সমাজতান্ত্রিক সমাজে উৎপাদনের উপকরণসমূহের ওপর ব্যক্তি মালিকানার দখল থাকে না, সেগুলো সামাজিক মালিকানার ওপর ছেড়ে দিতে হয়। বাংলাদেশে উল্লেখ করার মতো বৃহদায়তন শিল্প কারখানা ছিলো না, যেগুলোও বা ছিলো, মালিক ছিলো অবাঙালী পশ্চিমা পুঁজিপতিরা। তারা দেশ ছেড়ে কলকারখানা ফেলে পাকিস্তানে চলে গেছেন। উৎপাদন ব্যবস্থা চালু রাখার জন্য বাধ্য হয়েই সরকারকে এই শিল্পকারখানাসমূহের দায়িত্বভার গ্রহণ করতে হয়। শেখ সাহেব অনুপস্থিত পশ্চিমা মালিকদের শিল্পকারখানা অধিগ্রহণের কর্মটিকে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রথম পদক্ষেপ বলে ঘোষণা দিলেন। বিষয়টির ব্যাপকতা প্রমাণ করার জন্য বাঙালী মালিকের কিছু কিছু কলকারখানার দায়িত্বও সরকার গ্রহণ করলেন। আওয়ামী লীগ সরকার দলীয়ভাবে বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তিদের হাতে এই সমস্ত কলকারখানার দায়িত্ব নিয়োজিত করলেন। রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ছাড়া তাদের শিল্পকারখানা চালানোর কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা কিংবা যোগ্যতার বালাই ছিলো না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই দায়িত্ব প্রাপ্ত ব্যক্তিরা শিল্পকারখানার মধ্যে কোনো রকম শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার বদলে অধিকতররা বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করলেন। তাদের নামে অভিযোগ উত্থাপিত হতে আরম্ভ হলো, তারা কারখানার যন্ত্রাংশ বেঁচে দিচ্ছেন, কাঁচামাল পাচার করে ফেলছেন। তার নীট ফল এই দাঁড়ালো যে উৎপাদন কিছুতেই পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলো না। কোথাও পরিচালনার ক্রটিতে, কোথাও কাঁচামালের অভাবে কল কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে আরম্ভ করলো। রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে অর্থ ধার করে শ্রমিকদের মাইনে মাসের পর মাস পরিশোধ করতে হলো। এই সময়টা ছিলো শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর সরকারের জন্য কঠোর অগ্নিপরীক্ষার কাল। আওয়ামী লীগ সরকার অনুপস্থিত মালিকদের শিল্পকারখানা অধিগ্রহণ করেছেন, না করেও উপায় ছিলো না। কিন্তু এই ব্যবস্থাটাকে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ বলে ঘোষণা করে অর্থনৈতিক নৈরাজ্যের সবগুলো অর্গল খুলে দেয়া হলো। সত্য বটে শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার দল আওয়ামী লীগের পক্ষে সমাজতন্ত্রের দাবী উপেক্ষা করে একটা ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির পন্থা কবুল করে নেওয়া একটুখানি ঝুঁকির কাজ হতো। তারপরেও লুটপাট দুর্নীতি বন্ধ করে একটি স্বচ্ছ ধনতান্ত্রিক অর্থনীতি চালু করা তাঁর পক্ষে অসভব হতো না। তিনি ভুল পথ অনুসরণ করলেন। কোনো রকমের সহায়ক ভিত্তি না থাকা সত্বেও সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করলেন। সমাজতন্ত্র তো প্রতিষ্ঠা করা গেলো না। তৈরি করে ফেলেন একটা নৈরাজ্যতন্ত্র। জাতীয় অর্থনীতির মধ্যে যে ধরনেরই হোক একটা শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা না গেলে, অর্থনীতিতে বিশৃঙ্খলা এবং নৈরাজ্য আসতে বাধ্য। জাতীয় অর্থনীতির মধ্যে একটা শৃঙ্খলা সৃষ্টি না হলে অর্থনৈতিক জীবন বিপর্যস্থ হয়ে পড়ে। সমাজে কালোবাজারী, মুনাফাখখারী, চোরাচালানী ইত্যাকার যতো ধরনের সামাজিক অপরাধ আছে সবগুলো প্রাধান্য বিস্তার করে জাতীয় অর্থনীতির টুটি চেপে ধরে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে দেখা গেলো সারা দেশে একটা লুটপাটের রাজত্ব কায়েম হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-কারখানা, লাইসেন্স পারমিট সংগ্রহ করার বেলায় রাজনৈতিক ক্ষমতার বিস্তর অপব্যবহার হতে থাকলো। সরকারী ছত্রচ্ছায়ায় একদল মানুষ রাতারাতি অঢেল টাকার মালিক হয়ে উঠলেন। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ তাঁরা কেউ স্বাভাবিকভাবে ব্যবসা বাণিজ্য কিংবা শিল্প কারখানার মাধ্যমে আয় করেন নি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্বে এই অঞ্চলে মাত্র একজন কোটিপতির অস্তিত্ব ছিলো। বর্তমানে কোটিপতির সংখ্যা হাজার হাজার। একটি ছোটো দরিদ্র দেশে এই পরিমাণ ধনিকের উত্থান, সেটা নির্লজ্জ লুণ্ঠনের মাধ্যমেই সম্ভব হয়েছে। কি পরিমাণ লুণ্ঠনের সুযোগ পেলে মাত্র বিশ হাজার টাকার পরিমাণ সম্পদের মালিক একশো কোটি টাকার মালিক হতে পারে, বাংলাদেশ তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

শেখ মুজিবুর রহমানের রাজত্বকালে এই কোটিপতিদের জন্ম। জিয়াউর রহমান তাঁদের লালন করেছেন এবং বাড়িয়ে তুলেছেন। এরশাদ সমাজ জীবনে তাদের আইনগত বৈধতা দিয়েছেন। হাল আমল পর্যন্ত এসে তারা গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রটা তাঁদের কব্জার মধ্যে এনে ফেলেছেন। তাঁদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থন ছাড়া কোনো সরকার টিকে থাকতে পারে না। তাদের সক্রিয় মদদ ছাড়া কোনো দল সরকার গঠন করতে পারে না। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে ছোটোখাটো দলের সভা কিংবা শোভাযাত্রার জন্যও তাঁদের চাঁদার ওপর নির্ভর করতে হয়।

আমাদের সমাজে এই নব্য নবাবেরা অঢেল টাকার মালিক। ভোগ উপভোগের সমস্ত উপকরণ তাদের এখতিয়ারে। কিন্তু জাতীয় বুর্জোয়া তাদের কিছুতেই বলা যাবে না। বুর্জোয়া চরিত্রের মধ্যে অন্য অনেক দোষ যাই থাকুক তাদের সেন্স অব বিলঙ্গিং অর্থাৎ এটা আমার নিজের জাতি, এই জাতির উন্নতি অবনতির সঙ্গে সরাসরি আমার ভাগ্যও জড়িত, এই বোধ তাদের নেই। আমাদের দেশে যে সকল মানুষ হঠাৎ ধনী হয়ে উঠেছে জাতীয় বুর্জোয়াদের অঙ্গীকার তাদের কাছ থেকে আশা করা দূরাশার শামিল। মুনাফার পাহাড় গড়ে তোলাই তাদের একমাত্র অভীষ্ট। আমাদের জাতীয় মধ্যশ্রেণীটি দু’ভাবে দেশের মানুষকে শোষণ করে। একদিকে দেশে উৎপাদিত কাঁচামাল বিদেশে রপ্তানি করে দেশের মানুষকে শোষণ করে। অন্যদিকে বিদেশের উৎপন্ন পণ্য দেশে আমদানী করে একইভাবে শোষণ প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখে। দেশের চাহিদার প্রতি লক্ষ্য রেখে কলকারখানার প্রতিষ্ঠা করে জাতিকে স্বনির্ভর এবং বেকার জনগণের কর্মসংস্থানের কোনো দায়িত্ব তারা আদৌ বোধ করে না। তাদের বিকাশ আমাদের জাতীয় জীবনের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। একটি সুড়ঙ্গ পথের ভেতর দিয়ে হেঁটে জাতির শিরোভাগে অবস্থান গ্রহণ করে তারা জাতির অগ্রগতির পথ রোধ করে দাঁড়িয়েছে। এই জাতীয় টাকাঅলা মানুষেরা যদি সত্যিকার অর্থে জাতীয় বুর্জোয়ার স্থান দখল করতে পারতো, একদিক থেকে দেশের জন্য সেটা মঙ্গলকর হতো। বুর্জোয়ারা রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান গ্রহণ করতে এটা ঠিক, কিন্তু সমান্তরালে কৃষক, শ্রমিক এবং নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর রাজনীতি আপনিই বিকশিত হয়ে উঠতো। জাতীয় মধ্যশ্রেণীভূক্ত এই সমস্ত মানুষ বাংলাদেশের রাজনীতির মেরুকরণ ঠেকিয়ে রেখেছে। এই কাঠামোহীন অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে যে বুদ্ধিজীবী শ্ৰেণীটি নতুন রাষ্ট্রযন্ত্রের নাটবল্ট ঘোরাবার দায়িত্ব পেয়ে গিয়েছিলেন, দ্রুত ধনী হওয়ার মানসিকতা তাঁদেরও চরিত্রলক্ষণ হয়ে দাঁড়ালো। পরোক্ষে তারাও লুণ্ঠণের অর্থনীতির ফায়দা তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। সরকারী আমলা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবীসহ সাদা পোষাকের পেশাজীবীদের বেশিরভাগেরই চরিত্র থেকে মূল্যবোধ এবং নৈতিকতা একেবারেই বিদায় নিলো। এই ধরনের একটি লোভ লাভের সার্বিক পরিস্থিতিতে বুদ্ধিজীবীরা কখনো ঋজু শিরদাঁড়ার অধিকারী হতে পারেন না। বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীরা যে বেশিরভাগ চরিত্রভ্রষ্ট তার মূল কারণ লুণ্ঠণের অর্থনীতির মধ্যেই নিহিত।

এই দেশে কৃষক শ্রেণীর রাজনীতির একটা গৌরবজনক ঐতিহ্য ছিলো। শ্রমিক শ্রেণীর রাজনীতিরও বেগবান একটা ধারা ছিলো। অতীতে ক্ষমতার পালাবদলে তারা বড়ো বড়ো ভূমিকা পালন করেছেন। এই দেশেরে অন্যূন সত্তর শতাংশ মানুষ কৃষক। জনসংখ্যার বিচারে জাতীয় রাজনীতিতে তাদের কোনো ভূমিকার কথা দূরে থাকুক, সক্রিয় উপস্থিতিও লক্ষ্য করা যায় না। বেবাক রাজনীতি নিলামে কেনা পণ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষক শ্রমিক নির্যাতিত জনগোষ্ঠী তাদের পছন্দ মতো প্রতিনিধি সংসদে পাঠানোর কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারেন না। যারা চড়া দাম দিয়ে ভোট কিনে নিতে পারে, যারা গুণ্ডা এবং মাস্তান লাগিয়ে পুলিং বুথ দখল করে নিতে পারে, নির্বাচনে তারাই অনিবার্যভাবে জয়লাভ করে। কৃষক এবং নির্যাতিত মানুষ নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করে ভোট দিয়ে থাকেন। ভোট দিতে বিরত থাকলেও তাদের ভোট আকাশ থেকে ফেরেশতা এসে দিয়ে যায়। দরিদ্র মানুষেরা ভোট দিতে পারেন কিন্তু নিজেদের মনোনীত ব্যক্তিকে নির্বাচিত করে সংসদে পাঠাবার অধিকার তাদের নেই। আগুনের ছবি আগুনের মতো দেখালেও তার দাহিকাশক্তি থাকে না। বাংলাদেশে বর্তমানে যে গণতন্ত্র চালু আছে, সেই জিনিশটি তৃণমূল থেকে উঠে আসেনি। পশ্চিমা শক্তিগুলো দুনিয়া জোড়া গণতন্ত্রের খবরদারীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, তারাই এখানে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটি চালু রেখেছে। কমিউনিজমের পতনের আগে তারা সেনা ছাউনির ওপর নির্ভর করতো। হালফিল তাদের গণতন্ত্রের চর্চার ওপর অত্যধিক জোর প্রয়োগ করা ছাড়া গত্যন্তর নেই।

বাংলাদেশে যে গণতন্ত্র চালু আছে সেটা যে গণতন্ত্রের প্রহসন, পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের পশ্চিম বাংলার সঙ্গে তুলনা করলে বিষয়টা স্পষ্ট হবে। বিগত রাজ্যসভা নির্বাচনে কালু ডোম নামে বর্ধমান জেলার এক প্রার্থী সর্বভারতে পরিচিত এক কংগ্রেস প্রার্থীকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেছেন। কালু ডোম নামটিতেই তার পেশাগত পরিচয় পাওয়া যায়। এরকম বাংলাদেশে কল্পনা করাও কি সম্ভব? পেশাজীবী মানুষ তাদের মনোমতো প্রতিনিধিকে সংসদে পাঠাবার কথা কি চিন্তাও করতে পারেন? বাংলাদেশের সংসদে নানা দল থেকে যে সকল সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন, তার শতকরা ষাট ভাগই স্থায়ীভাবে ঢাকা এবং বিশ ভাগ জেলা সদরে বসবাস করেন। তাঁদের শরীরে শ্রমঘামের কোনো গন্ধ নেই। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আশা আকাঙ্খর সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। প্রকৃত প্রস্তাবে বাংলাদেশে যে গণতন্ত্রটি চালু আছে তার মাধ্যমে আসল জনগণের শত্রুরা নির্বাচনে জিতে নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর বুকের ওপর সওয়ার হয়ে রক্ত শোষণ করার আইনগত বৈধতাই অর্জন করে।

ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনের লড়াইয়ে জেতার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে এলে দলে দলে যে দলটি জিতবে তার পক্ষপুটে আশ্রয় গ্রহণ করে। দেখা যাবে আজকে যে আওয়ামী লীগের হয়ে নির্বাচনে লড়ছে, গত নির্বাচনে সে একই ব্যক্তি জাতীয়তাবাদী দলের পক্ষ থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলো। জাতীয়তাবাদী দল থেকে জাতীয় পার্টিতে যাওয়া, জাতীয় পার্টি থেকে আওয়ামী লীগে আসা এগুলো নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতীয় রাজনীতিতে আদর্শবাদের ক্ষীণতম ছোঁয়াটুকুও আর অবশিষ্ট নেই। রাজনৈতিক সুবিধাবাদই গোটা রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের নিয়ামক শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থটাই সেখানে প্রধান। দেশের জনগণের ভালো মন্দের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভোটে নির্বাচিত একটি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য কৃষক শ্রমিক ব্যাপক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণের প্রয়োজন হয় না। এ থেকে প্রমাণিত হয় গণতন্ত্রের শেকড় এখানে কতো দুর্বল। শুধু ছাত্ররা একটি সরকারের পতন ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক জনগোষ্ঠীর অংশ গ্রহণ ছাড়াই শুধুমাত্র আমলা এবং এনজিও কর্তারা আরেকটি পতন ঘটাতে পেছপা হবে না।

মুৎসুদ্দি শ্রেণীর হাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি থাকায় গণতন্ত্র এখানে প্রাতিষ্ঠানিকতা লাভ করতে পারছে না। সমাজের তৃণমূল অবধি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রসারিত হতে পারছে না। এই মুৎসুদ্দি শ্রেণী অনড় অটল হয়ে সমাজের পথ রুদ্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের প্রভাব খর্ব করতে না পারলে যে কোনো ধরনের ইতিবাচক রাজনৈতিক উত্তরণের আশা সুদূর পরাহত থেকে যাবে।

.

০৫.

বাঙালী সংস্কৃতি থেকে প্রাণরস আহরণ করে জাতীয়তার বোধটি পুষ্ট এবং বিকশিত হয়েছে। তথাপি বাংলাদেশের সংস্কৃতির আশানুরূপ অগ্রগতি হয়নি। কতিপয় জটিল সংকট সংস্কৃতি চর্চার পথটিকে কন্টকাকীর্ণ করে রেখেছে। বাংলাদেশের সংখ্যাধিক জনগণের মানস সংকটেরই প্রতিফলন ঘটছে সংস্কৃতিতে।

বাংলাদেশ নামে যে ভূখণ্ডটিতে আমাদের বসবাস, পঁচিশ বছর আগে সেই দেশটি ধর্মতান্ত্রিক পাকিস্তান রাষ্ট্রের অংশ ছিলো। তারও আগে দেশটি পশ্চিম বাংলার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে সংযুক্ত ছিলো। বৃটিশ শাসনের অন্যূন দুশো বছর কাল সময় বাংলা প্রদেশ বৃটিশ ভারতের একটি স্বতন্ত্র শাসন ইউনিট হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিলো। বৃটিশ বিদায়ের প্রাক মুহূর্তে ভারতের হিন্দু এবং মুসলমান একটি সংযুক্ত রাষ্ট্রে বসবাস করতে সম্মত হয়নি বলেই বৃটিশ-ভারতকে ভারত এবং পাকিস্তান দুটি রাষ্ট্রে বিভক্ত করতে হয়েছে। বাংলা প্রদেশের হিন্দু মুসলমান নেতৃবৃন্দের একাংশ বাংলার ভাঙ্গন ঠেকাবার চেষ্টা করেও সফল হতে পারেননি। সর্বভারতীয় রাজনীতির প্রবল টান অগ্রাহ্য করে বাংলা তার স্বতন্ত্র অস্তিত্ব রক্ষা করতে সক্ষম হয়নি। হিন্দুপ্রধান পশ্চিমবঙ্গ ভারত ইউনিয়নের অন্তর্ভূক্ত হয়েছে এবং মুসলিম প্রধান পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চল হিসেবে স্বতন্ত্র রাষ্ট্রিক অস্তিত্বের মধ্যেই অবস্থান তৈরি করেছে। পাকিস্তান ঘোষিতভাবেই ছিলো ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্র। পাকিস্তান সৃষ্টির অল্পকালের মধ্যেই পূর্বাঞ্চলের লোকদের বোধোদয় হতে থাকে যে ধর্মতান্ত্রিক পাকিস্তান রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যে তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক অধিকার কিছুই সুনিশ্চিত নয়। উনিশশো বাহান্ন সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সর্বপ্রথম তাঁদের সংগঠিত প্রতিবাদটি জন্ম নেয়। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের মানুষ পাকিস্তানী জাতীয়তার বোধটি খারিজ করে বাঙালী জাতীয়তার বোধটি আঁকড়ে ধরে অগ্রসর হতে আরম্ভ করে। এই অগ্রযাত্রার পথটি সরল এবং একরৈখিক নিশ্চয়ই ছিলো না। অনেক দ্বিধা এবং দোদুল্যমানতা তাতে ছিলো। শেষ পর্যন্ত উনিশশো একাত্তর সালের মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে বাংলাদেশের জাতীয়তার সগ্রাম এই পর্যায়ে একটা চূড়ান্ত রূপ লাভ করে।

মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পাকিস্তানের রাষ্ট্রিক কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আলাদা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম দেয়ার সময় যে সমস্ত বোধ এবং উপলব্ধি সক্রিয় ছিলো, একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হওয়ার পর দেখা গেলো সে সমস্ত বোধ এবং উপলব্ধিগুলোকে সংস্কৃতির ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত করার কাজটি সত্যি সত্যি দুরূহ। বাংলাদেশে ভাষা ভিত্তিক যে জাতীয় রাষ্ট্রটি সৃষ্টি হয়েছে তার সাংস্কৃতিক চেহারার একটি নির্দিষ্ট আকার দান করার প্রশ্নটা যখন উঠলো, তখনই প্রকৃত সংকটটা আত্মপ্রকাশ করলো। বাংলাদেশে যে নতুন রাষ্ট্রসত্তাটি জন্ম নিয়েছে, তার যে দাবী সেটা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। এই অঞ্চলের সংখ্যাগুরু অধিবাসী মুসলমান। শুধুমাত্র ধর্মের বন্ধনকে মান্য করে দেড় হাজার মাইল দূরবর্তী একটি অঞ্চলের মানুষদের সঙ্গে এক রাষ্ট্রের মধ্যে বসবাস সম্ভব নয় বলেই নতুন একটি রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছে এবং রাষ্ট্র গঠনের উপাদান হিসেবে ধর্মের স্থান থাকতে পারে, সেই প্রত্যয়টা খারিজ করে দিয়েছে। তারপরেও একটা প্রশ্ন মুখ্য হয়ে দেখা দিয়েছে। এই সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান জনগোষ্ঠী যাদের বেশির ভাগ দরিদ্র এবং নিরক্ষর, তাদের জন্য নতুন সমাজের প্রয়োজনে ধর্মের অভিভাবকত্বহীন একটা সাংস্কৃতিক প্রেক্ষিত সৃষ্টির পাশাপাশি বাংলাদেশের সকল ধর্মের এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে গ্রহণযোগ্য একটা সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল নির্মাণ করার চ্যালেঞ্জটা যখন সামনে এলো, দেখা গেলো বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের তার সম্মুখীন হওয়ার ক্ষমতা, প্রস্তুতি, মেধা এবং মানসিকতা কোনোটাই নেই। যুদ্ধোত্তর বালাদেশে একটি সাংস্কৃতিক রেনেসার প্রয়োজন সবচাইতে অধিক ছিলো। একটি সর্বব্যাপ্ত জাগরণ, নতুন মানসিক বোধের উদ্বোধন এবং বুদ্ধিবৃত্তিক একটি উত্থানের ঢেউ লেগে শিল্প, সংস্কৃতি এবং সাহিত্যের কোনো শাখা হৃদ্য, সমৃদ্ধ হয়ে উঠতে পারেনি। পাকিস্তান আমলে যে সকল ব্যক্তি, পাকিস্তান সৃষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহের ভেতর থেকে পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরোধিতা করে জাতীয় আন্দোলনের প্রতি কখনো ক্ষীণ, কখনো জোড়ালো সমর্থন ব্যক্ত করার চেষ্টা করতেন, স্বাধীন বাংলাদেশে রাষ্ট্রশক্তির পৃষ্ঠপোষকতায় তারা একটা নিরাপদ অবস্থান পেয়ে গেলেন। দেশটির সংস্কৃতির অভিভাবক নতুন ব্রাহ্মণের ভূমিকায় আবির্ভূত হয়ে স্বৈরাচারী রাষ্ট্রশক্তির সহায়তায় আত্মতুষ্টি এবং তোষামোদের এমন পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করতে আরম্ভ করলেন, বাঙালী জনগোষ্ঠীর মুক্তি সংগ্রামের তরঙ্গ তার মধ্যে ধ্বনিত হয়ে উঠলো না। কৃষক, মজুর, দরিদ্র জনগোষ্ঠী যারা মুক্তিযুদ্ধে সর্বাধিক আত্মত্যাগ করেছে, তাদের আশা আকাঙ্ক্ষার কোনো চিহ্নই তাঁদের চিন্তা চেতনায় স্থান করে নিতে পারেনি। তারাও বাঙালীর রাষ্ট্র, বাঙালী জনগণের কথা বলতেন, কিন্তু সেগুলো বিমূর্ত ধারণার অধিক কিছু ছিলো না। বাস্তবে যে বাঙালী জনগণ প্রাণ দিয়ে, রক্ত দিয়ে বাংলাদেশের জন্ম সম্ভাবিত করেছে, সেই হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রীষ্টান জনগণকে এক সূত্রে বেঁধে একটি সমৃদ্ধ জাতি গড়ে তোলার স্বপ্ন কখনো তাদের মনে সঞ্চারিত হয়নি।

যে সাংস্কৃতিক নেতৃশ্রেণীটি বাংলাদেশ আমলে জাতির শিরোভাগে চলে এসেছিলো, পাকিস্তান আমলে পাকিস্তান সৃষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যেই তাদের বিকাশ এবং সংবৃদ্ধি। তাদের অবস্থান টিকিয়ে রাখার জন্য তারা পাকিস্তানি শাসকদের সহযোগিতা করতেন, আবার বাঙালি জনগণের উত্থানের সম্ভাবনা দেখে, নিজেদের বাঙালিত্বের পরিচয়টাও তুলে ধরতে চেষ্টা করতেন। এই শ্রেণীর মানসিক দোলাচল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন লোকেরা যখন বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির অভিভাবক হয়ে বসলেন, দেখা গেলো তাদের সৃষ্টিশক্তি অবসিত হয়ে গেছে, নতুন কিছু সৃষ্টি করার ক্ষমতা তাদের নেই।

রাজনীতির ক্ষেত্রে যে জিনিশটি ঘটেছে, দেখা গেলো সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও তার পুনরাবৃত্তি ঘটতে আরম্ভ করেছে। পশ্চিম বাংলা থেকে যে সকল মুসলমান বুদ্ধিজীবী জিন্নাহ্ সাহেবের দ্বিজাতিতত্ত্ব মেনে নিয়ে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ সৃষ্টির আশায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে এসেছিলেন, তাদেরই একটা অংশ আচকান শেরোয়ানী পাল্টে গলায় খদ্দর ঝুলিয়ে তারস্বরে নিজেদের বাঙালী বলে জাহির করতে আরম্ভ করলেন। তাঁদের এই উচ্চারণগুলো ছিলো মেকি ভড়ং সর্বস্ব, একটি নতুন জাতির বিকাশ সম্ভাবিত করার জন্য তাদের পালনীয় কোনো ভূমিকা ছিলো না। জনগণের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি করার বদলে তাঁরা বিভেদের বীজই বপন করলেন।

উনিশশো পঁচাত্তর সালে শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর দেখা গেলো, একাত্তরের পরাজিত শক্তিসমূহ আবার মাথা তুলতে আরম্ভ করেছে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং প্রেসিডেন্ট এরশাদ এই সমস্ত শক্তিকে পাতাল প্রদেশ থেকে টেনে তুলে আমাদের সমাজ জীবনে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করলেন। মুক্তিযুদ্ধের অর্জনসমূহ একে একে ধুলোয় গড়াগড়ি খেতে লাগলো। সমস্ত পরিবেশটা সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে বিষিয়ে তোলা হলো। প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিসমূহের প্রতাপ অধিকতরো বিস্তৃত হয়ে পড়লো। সংস্কৃতির গতিপথটার মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার জন্য নিত্যনতুন কৌশলের উদ্ভাবন করা হতে থাকলো। বাঙালীত্বের বিপরীতে মুসলমান পরিচয়টা খুঁচিয়ে বের করার জন্য তাদের চেষ্টার অন্ত রইলো না। মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ লক্ষ শহীদের প্রাণের বিনিময়ে যে দেশটি জন্ম নিয়েছে তার প্রকৃত পরিচয় মুছে দিয়ে দেশটিকে আবার নতুন পাকিস্তানে পরিণত করার সর্বাত্মক পাঁয়তারা করতে থাকলো। সমাজের ওপর হতে তলা পর্যন্ত সর্বত্র পশ্চাদপদ ধারণা রাজ্যপাট বিস্তার করতে আরম্ভ করলো।

স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে আওয়ামী লীগ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হত্যা করে যদি একদলীয় শাসন কায়েম করে না বসতো স্বৈরাচারী শক্তি সমাজের ওপর জেঁকে বসে মুক্তিযুদ্ধের সমস্ত অর্জন, সমস্ত প্রতিশ্রুতি হাওয়ায় মিশিয়ে দিতে পারতো না। যে জনগণ মুক্তিযুদ্ধ করে দেশটিকে স্বাধীন করেছে, সে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করে সর্বনাশের পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছিলো আওয়ামী লীগ। পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগকেও তার বলি হতে হয়েছে।

আওয়ামী লীগের পরাজয়ের সঙ্গে সঙ্গে আওয়ামী লীগ সমর্থিত বুদ্ধিজীবীরা স্বৈরশাসনের পেছনে এমন কোনো সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ, এমন কোনো ভাবাদর্শিক জাগরণ রচনা করতে পারেননি, যাতে করে সাম্প্রদায়িক ভাবাদর্শের সার্থক প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়। সাম্প্রদায়িক শক্তির সহায়তায় আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসতে হয়েছে এবং সাম্প্রদায়িক ভাবাদর্শের সঙ্গে আপোষও তাদের করতে হয়েছে। সরকার সমর্থিত বুদ্ধিজীবীরা সেই একাত্তর সালের পরবর্তী সময়ের মতো উচ্চকণ্ঠে অসাম্প্রদায়িকতা, বাঙালী জাতীয়তাবাদ এই সকল প্রত্যয়ের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করছেন। তাদের অবস্থানগত স্ববিরোধিতা একটা দৃষ্টান্ত তুলে ধরলেই সকলের দৃষ্টিতে উজ্জ্বলভাবে ধরা পড়বে। তাঁরা ইনকিলাব পত্রিকা যে সাম্প্রদায়িকতা প্রচার করছে, তার বিরুদ্ধে জেহাদ করতে প্রস্তুত, কিন্তু স্বৈরাচারী এরশাদ কর্তৃক আরোপিত রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের বিরুদ্ধে একটি কথাও উচ্চারণ করেন না। সেনাবাহিনী কর্তৃক ধ্বংসপ্রাপ্ত গুলিস্তান রমনা কালীবাড়ি পুননির্মাণের ন্যায়সঙ্গত দাবী যখন হিন্দু সম্প্রদায় থেকে উত্থাপিত হয়, তারা অতিরিক্ত দার্শনিক হয়ে ওঠেন। অর্থাৎ এটাকে এমন একটা দুরূহ দার্শনিক সমস্যা মনে করেন, হঠাৎ করে জবাব দেয়ার কিছু নেই এমন মনে করে থাকেন। (অর্পিত) শত্রুসম্পত্তি আইন বাতিল করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পূর্ণ নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার দাবী যখন ওঠে, এগুলো তাঁদের বিজ্ঞ মস্তকে স্থান পাবার উপযুক্ত বিষয় মনে করেন না।

দোদেল বান্দা কলমা চোর, না পায় শ্মশান, না পায় গোর। এঁদের অবস্থা অনেকটা সেরকম। এঁরা একটা সরকারকে সমর্থন করছেন, কিন্তু তার পেছনে নিজেদের ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠা ছাড়া অন্য কোনো মূল্যবোধ কাজ করছে সে কথা নিজেরাও মনে করেন না। সত্যিকার অসাম্প্রদায়িক হওয়ার বদলে ছদ্মবেশী অসাম্প্রদায়িক সাজার পরিণাম কতো ভয়াবহ হতে পারে আমাদের হাড়ে হাড়ে টের পেতে হয়েছে। সরকারী দলের বুদ্ধিজীবীরা যে সুবিধাবাদী অবস্থানটিতে দাঁড়িয়ে জাতীয়তাবাদের অভিভাবক এবং অসাম্প্রদায়িক শক্তির প্রতিভূ বলে নিজেদের পরিচিত করতে চেষ্টা করছেন, সেই জায়গাটি ভয়ঙ্কর নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। সাম্প্রদায়িক শক্তি বাহাত্তরের পরবর্তী সময়ের চাইতেও অনেক সংগঠিত এবং পরিকল্পিতভাবে তাদের জায়গাটি কেড়ে নিতে ছুটে আসছে। সে শক্তিকে প্রতিরোধ করার কোনো ক্ষমতা তাঁদের নেই, তাঁদের সততা নেই। তাদের বিশ্বাস এবং প্রত্যয়ের কোনো বালাই নেই। অতীতে তা আমাদের জাতিকে ভুল পথে চালিত করেছেন, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সুফলটুকু ভোগ করছেন।

বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক এবং প্রতিশীল শক্তির সংগ্রাম অধিকতররা জটিল ঘূর্ণাবর্তের মধ্যে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। ত সল সাম্প্রদায়িক এবং নকল প্রগতিশীল সুবিধাবাদীদের যুগপদভাবে পরাস্ত করতে না পারলে বাংলাদেশের জনগণের সংস্কৃতির উত্থান অসম্ভব। কাজটি সত্যি সত্যিই কঠিন।

.

০৬.

উনিশশো একাত্তর সালে দক্ষিণপন্থী শক্তিসমূহ মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সরকার সবগুলো ধর্মভিত্তিক দল নিষিদ্ধ করে এবং তাদের কার্যকলাপ বেআইনী বলে চিহ্নিত করে। তার ফলে দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগ, পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক লীগ, নেজামে ইসলামী, জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী ডেমোক্রেটিক লীগ এই সকল দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক দলের প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মতৎপরতা বন্ধ হওয়ার ফলে, তারা গোপনে তাঁদের কার্যকলাপ চালিয়ে যেতে আরম্ভ করেন। যেহেতু প্রকাশ্যে তাদের সভা ও সমাবেশ এবং শোভাযাত্রা করার অধিকার ছিলো না, তাই তারা ধর্মীয় এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানসমূহের কাঁধে ভর করেন। রবীন্দ্রনাথের কবিতার সেই পংক্তিটা আছে না, নিন্দাকে রসনা হতে দিলে নির্বাসন, গভীর জটিল মূল অন্তরে প্রসারে–বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সেই জিনিশটি ঘটতে আরম্ভ করলো।

তারা মসজিদ এবং মাদ্রাসাসমূহকে তাদের কর্মতৎপরতার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ব্যবহার করতে থাকলেন। ওয়াজ মাহফিল, ধর্মীয় জলসা, নবীর জন্ম মৃত্যু তারিখে দশ পনেরো দিন ব্যাপী সিরাত অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে থাকলেন। পাকিস্তান যতোদিন টিকে ছিলো সমাজের ভেতর থেকে এই ধরনের ধর্মীয় জিগীর কখনো উখিত হতে দেখা যায় নি। অথচ ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্র পাকিস্তান ভেঙ্গে যাওয়ার পর এই সকল প্রতিষ্ঠানকে সক্রিয় করে তোলা হয়েছে। সেই সময়ে বাংলাদেশে কোনো মানুষের ধনপ্রাণের নিশ্চয়তা নেই। একদিকে চলছে রাজনৈতিক নিষ্পেষণ অপরদিকে সরকারী সন্ত্রাসের মোকাবেলা করার জন্য চরমপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো পাল্টা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের আয়োজন করে যাচ্ছিলো। দেশে দুর্ভিক্ষ, অনাহারে মানুষ মারা যাচ্ছে। এই ধরনের একটা সংকটজনক সময়সন্ধিতে দেশের প্রতিষ্ঠিত সরকার কোনো ক্ষেত্রেই বিশেষ যোগ্যতার পরিচয় দিতে পারছে না। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে সরকার ইচ্ছা করলেও হয়তো অধিক কিছু করতে পারতেন না। নানা ধরনের সমস্যার ভারে তাঁদের হিমশিম খেতে হচ্ছিলো। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো দেশের সাধারণ মানুষ সরকারের স্বচ্ছতার ব্যাপারে আস্থা হারিয়ে ফেলেছিলেন। তার কারণও ছিলো। সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় একদল মানুষ রাতারাতি ধনী হয়ে উঠলো। তারা দোকান, বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এসকল দখল করতে থাকলো।

এই ধরনের কুয়াশাচ্ছন্ন একটা পরিবেশে পাকিস্তানের সমর্থক গোষ্ঠী মুসলিম বাংলা গঠন করার জন্য তৎপরতা চালিয়ে যেতে আরম্ভ করলেন। এখানে সেখানে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের অনুষ্ঠান হতে থাকলো। যে সমস্ত বুদ্ধিজীবী সরকারী নীতি এবং আদর্শের সমর্থক ছিলেন সমাজের তৃণমূল থেকে উখিত সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ করার কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান তারা গ্রহণ করতে পারেননি। দেশের বিবেকবান মানুষের কাছে তাদের কোনো গ্রহণযোগ্যতা অবশিষ্ট ছিলো না। মুসলিম বাংলার সমর্থকরা মসজিদ, মাদ্রাসা এবং ধর্মীয় সভাগুলোতে ফিসফিস করে বলতে আরম্ভ করলেন, ভারত পাকিস্তানকে হটিয়ে গোটা বাংলাদেশটা দখল করে বসেছে। এই দেশে মুসলমানদের ধন, প্রাণ, ঈমান কিছুই নিরাপদ নয়। শতত ধারায় এই ধরনের নেপথ্যে প্রচারের কারণে সমাজের ভেতর থেকে ঘূর্ণিহাওয়ার মতো সাম্প্রদায়িক মনোভাব জাগ্রত হয়ে জনমানসে জীবাণুর মতো প্রভাব বিস্তার করতে আরম্ভ করলো।

দক্ষিণপন্থী ধর্মভিত্তিক দলগুলোর মধ্যে, অনেকগুলোই সাইনবোর্ড সর্বস্ব প্রতিষ্ঠান। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য যে দলটি দায়ী সেই পাকিস্তান মুসলিম লীগ উনিশশো চুয়াল্লোর নির্বাচনে সেই যে ধরাশায়ী হয় আর কখনো কোমর সোজা করে দাঁড়াতে পারেনি। জেনারেল আয়ুব মুসলিম লীগের একটি অংশকে নতুন জীবন দান করতে চেষ্টা করেছিলেন। আয়ুবের পতনের সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম লীগ শুধুমাত্র একটা নিপ্রাণ অস্তিত্বে পরিণত হয়। এই দলগুলোর মধ্যে একমাত্র জামায়াতে ইসলামীই ছিলো ক্যাডারভিত্তিক সংগঠন। পাকিস্তানকে টিকিয়ে রাখার জন্য জামায়াতে ইসলামীর কর্মীরাই সবচাইতে বেশি সচেষ্ট ছিলেন। তাঁরা সর্বতোপায়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহযোগীতা করেছেন। রাজাকার আলবদর, আলসামস্ ইত্যাদি যে সকল সন্ত্রাস সহায়ক বাহিনী যুদ্ধকালে সৃষ্টি করা হয়েছিলো, তার সিংহভাগই এসেছে জামায়াতে ইসলামী দলটি থেকে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী আত্মসমর্পন করার পর জামায়াতে ইসলামীর অধিকাংশ কর্মীর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনা হয়। কিছু অল্প সংখ্যক অপরাধীই ধরা পড়ে। এই অপরাধীদের অনেকেই নগদ অর্থের বিনিময়ে সরকারের লোকদের কাছ থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। বেশ কিছু অংশ নানা কৌশল অবলম্বন করে সৌদী আরব, কুয়েত, ইরান ইত্যাদি মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশে চলে যায়। এক পর্যায়ে পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর আমীর অধ্যাপক গোলাম আজমও পাকিস্তান থেকে সৌদি আরবে চলে আসেন। মধ্য প্রাচ্যের দেশসমূহে, বিশেষ করে সৌদি আরব এবং কুয়েতে এই সকল পলাতক জামায়াত সদস্য নিজেদের সংগঠিত করে সঘবদ্ধভাবে জোরালো প্রচার চালাতে আরম্ভ করেন। আন্তর্জাতিক যোগাযোগের জন্য লন্ডন অফিসটি ব্যবহার করতে থাকেন। তারা মধ্যপ্রাচ্যের সকলশ্রেণীর মানুষদের বোঝাতে থাকেন যে বাংলাদেশে ইসলাম সত্যি সত্যি বিপন্ন। ভারতের হিন্দুরা বাংলাদেশ দখল করে ফেলেছে। বাংলাদেশে অনেকগুণ বেশি ইসলামকে জীবিত রাখতে হলে সেখানে গ্রামে গঞ্জে সর্বত্র মসজিদ এবং মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। কেনোনা মসজিদ এবং মাদ্রাসাই ইসলামকে টিকিয়ে রাখার একমাত্র গ্যারান্টি।

মধ্যপ্রাচ্যের মানুষ তাঁদের কথা বিশ্বাস করেছেন। মসজিদ মাদ্রাসা এবং অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য প্রচুর অর্থ সাহায্য করেছেন। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা অর্থে বাংলাদেশের শহর বন্দর থেকে শুরু করে একেবারে নির্জন গ্রামে পর্যন্ত অনেক মসজিদ মাদ্রাসা নির্মাণ করা হয়েছে। একটা পরিসংখ্যান নিলে জানা যাবে পাকিস্তান বিগত পঁচিশ বছরে যতো পরিমাণে মসজিদ মাদ্রাসা তৈরি হয়নি, বাংলাদেশ আমলে পঁচিশ বছর সময়ের মধ্যে তার চাইতে অনেকগুণ বেশি মসজিদ মাদ্রাসা তৈরি হয়েছে। বর্তমান বাংলাদেশে এমন কোনো গ্রাম খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হবে, যেখানে একটি মাদ্রাসা নেই। বর্তমানে মাদ্রাসা গ্রাম সমাজের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদে কোনো প্রার্থীকে বিজয়ী হতে হলেও মাদ্রাসার সমর্থন লাভ জরুরী হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশের শহরগুলোতে তারা পরিকল্পনা করে এমন কতিপয় মসজিদ নির্মাণ করেছেন যার সঙ্গে এক একটি সুপার মার্কেট সংযুক্ত রয়েছে। এই সব মার্কেট থেকে ভাড়া ইত্যাদি বাবদে যে অর্থ আদায় হয় তার এক ভগ্নাংশ মাত্র মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণের কাজে ব্যয় করা হয়। বাকী বিপুল পরিমাণ অর্থ ধর্মীয় রাজনীতির পেছনে ব্যয়িত হয়। মসজিদ ছাড়া তারা ক্লিনিক, হাসপাতাল, ব্যাংক এবং আরো নানা রকম বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান করে, দেশের ভেতর থেকেই একটা আয়ের উৎস সৃষ্টি করে ফেলেছেন। সাম্প্রদায়িক রাজনীতি একটা শক্ত আর্থিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে বলেই মাসে মাসে মাসোহারা দিয়ে বিপুল সংখ্যক কর্মী এবং প্রচারক পোষা তাদের পক্ষে অসম্ভব হয় না। রাজনৈতিকভাবে সমাজে আশানুরূপ অগ্রগতি না হলেও সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে তারা শক্তি সগ্রহ করে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করে ফেলেছেন, সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।

মুজিব সরকারের আমলে শিক্ষা সংস্কারের কথা উঠলেও জনমত বিপক্ষে যায় এই আশঙ্কায় তিনি মাদ্রাসা শিক্ষায় হাত দিতে সাহসী হয়ে উঠতে পারেননি। জিয়ার আমলে এই মাদ্রাসাসমূহকে সরকারের সমর্থন ক্ষেত্রে পরিণত করার একাধিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এরশাদ আমলে মাদ্রাসাসমূহের মধ্যে ধর্মীয় রাজনীতি ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টার ক্রটি করা হয়নি। খালেদা জিয়ার সরকারের আমলে মাদ্রাসাসমূহ যে পরিমাণ সরকারী অনুদান পেয়েছে, তা মাধ্যমিক স্কুলগুলোর জন্য বরাদ্দ অর্থের চাইতে বেশি।

এই সমস্ত কারণ ছাড়াও বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতা গাঢ়মূল হওয়ার একাধিক আন্তর্জাতিক কারণ বর্তমান। আফগানিস্তান, আলজিরিয়া, ইরান, মিশর এই সকল মুসলিম দেশে মৌলবাদের উত্থান বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক শক্তিকে বহুলাংশে প্রভাবিত করেছে। বাংলাদেশ মুসলমান প্রধান দেশ হওয়ায় মুসলিম জগতের চলমান ঘটনা থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে পারে না। কিছু না কিছু প্রভাব আবশ্যই পড়ে। আরো একটি বিষয় অবশ্যই স্পষ্ট করা প্রয়োজন। সোভিয়েত রাশিয়ার ভাঙ্গন, ক্যুনিজমের ভরাডুবি এবং সোভিয়েত মধ্য এশিয়ায় একগুচ্ছ মুসলিম রাষ্ট্রের আকস্মিক আবির্ভাবের কারণে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো পৃথিবীতে তাদের প্রভূত্বমূলক আধিপত্য অক্ষুণ্ণ রাখার ব্যাপারে নতুন করে চিন্তা ভাবনা করতে আরম্ভ করেছে। পশ্চিমা তাত্ত্বিকেরা বলেছেন, আগামীতে পশ্চিমা শক্তির সঙ্গে যদি অন্য কোনো শক্তির সংঘাত বাধে তাহলে প্রথম সংঘাতটি বাধবে ইসলামের সঙ্গে এবং দ্বিতীয় সংঘাতটি হতে পারে কনফুসীয়পন্থী চীনের সঙ্গে। পশ্চিমা শক্তিগুলো ইসলাম ধর্মের প্রতিরোধ ক্ষমতা খর্ব করার জন্য দুনিয়া জোড়া নানা কর্মসূচী চালিয়ে যাচ্ছে। মুখ্যতঃ আত্মরক্ষার প্রয়োজনে মুসলিম দেশগুলোতে এক ধরনের ধর্মীয় পুনরুত্থান জেগে উঠছে, বাংলাদেশ তার ব্যতিক্রম নয়। এই সামাজিক রূপান্তরটা এতো চুপিসারে, নীরবে ঘটছে যে, কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে তার প্রভাব অস্বীকার করা অসম্ভব নয়। ঘোষিতভাবে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকেও উনিশশো ছিয়ানব্বই সালে এই সাম্প্রদায়িক প্রভাবের কিছু কিছু স্বীকার করে নিয়ে ক্ষমতায় আসতে হয়েছে।

হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সশস্ত্র হামলার মুখে ঘরবাড়ি দেশ ফেলে প্রাণ বাঁচাবার তাগিদে ভারতে পলায়ন করতে বাধ্য হয়েছিলেন। নয় মাস পর দেশে ফিরে দেখেন তাদের ঘরবাড়ি অবশিষ্ট নেই। তাদের দোকানপাট, জমিজমা, পুকুর এমনকি ভিটেমাটি পর্যন্ত সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের দখলে চলে গেছে। এই দখলদার সংখ্যাগুরুদের মধ্যে সকলে পাকিস্তান ভক্ত নয়, সরকার সমর্থক দেশপ্রেমিক জনগণেরও অভাব নেই। বেশিরভাগ হিন্দুকে তাদের ঘরবাড়ি এবং অন্যান্য অস্থাবর সম্পত্তি যা কিছু হাতের কাছে ছিলো সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন। এই নয় মাসে তার সবটাই নিঃশেষ করে ফেলতে হয়েছে। সম্পূর্ণ কপর্দকহীন অবস্থায় ঘরবাড়ি আবার নতুন করে গড়ে তোলার কাজে মন দিলেন। তাঁদের হাতে কোনো সহায় সম্পদ নেই। সরকার তাদের পুনর্বাসনের কাজে কোনোরকম সহযোগিতার হস্ত সম্প্রসারিত করলেন না। সংখ্যাগুরু প্রতিবেশীর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহানুভূতি পর্যন্ত তারা পেলেন না। তথাপি তাদের মনে একটা সান্ত্বনা ছিলো। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য তারা অনেক ত্যাগ তিতিক্ষা সহ্য করেছেন। স্বাধীন বাংলাদেশে তারা আর দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক নন। রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিক বিষয়ের সর্বক্ষেত্রে সংখ্যাগুরুদের মতো তাদের সমান অধিকার। ঘরবাড়ি তৈরি করে থিতু হয়ে বসার পরে তারা যখন অধিকার বোধটা ব্যবহার করতে চাইলেন, তারা কল্পনাও করতে পারেননি এই স্বাধীন বাংলাদেশেও তাদের জন্য মর্মান্তিক আঘাতটা অপেক্ষা করছিলো। স্বাধীনতার এক বছর না যেতেই পাকিস্তান আমলের চাইতেও জোরালো সাম্প্রদায়িকতার মুখোমুখি তাদের দাঁড়াতে হলো। স্বাধীনতার পর প্রথম দুর্গোৎসবটাতেই তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। নরায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম এবং বরিশালের নানা জায়গায় দুর্গাপ্রতিমা ভেঙ্গে ফেলে হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মাচরণে বাধা দেয়া হলো। ভারত বিরোধিতা এবং হিন্দু বিরোধিতা এক হয়ে গেলো। বাংলাদেশে হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সাম্প্রদায়িক ভেদ বুদ্ধি যে স্বাধীনতা উত্তরকালে নতুন করে নতুনভাবে জাগ্রত হয়ে সাম্প্রদায়িক দূরত্বের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা এক রকম প্রায় দুঃসাধ্য করে তুলেছে, তার জন্য আরো কতিপয় বিষয় পর্যালোচনার প্রয়োজন।

উনিশশো পঁয়ষট্টি সালের ভারত পাকিস্তান যুদ্ধের সময় আয়ুব খান সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ঘর বাড়িসহ পরিত্যক্ত সম্পত্তিকে এক অর্ডিন্যান্স বলে শত্রু সম্পত্তি বলে ঘোষণা করেছিলেন। হিন্দু সম্প্রদায় পাকিস্তান আমল থেকেই এই নাগরিক অধিকারবিরোধী আইনের প্রতিবাদ করে আসছিলো, কিন্তু ফলোদয় হয়নি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তারা আশা করেছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশে এই আইনের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হবে। শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার এই আইনের নামটা পরিবর্তন করে শত্রু সম্পত্তির স্থলে অর্পিত সম্পত্তি রাখলেন, কিন্তু কার্যকারিতা একই রকম থেকে গেলো। শেখ মুজিবুর রহমান, যিনি ছিলেন তাঁদের এক রকম ভরসাস্থল, তার এই ধরনের সংবেদনহীনতা হিন্দুদের চূড়ান্তভাবে হতাশ করলো। উনিশশো একাত্তর সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী রমনার বহু পুরোনো কালীবাড়ি ধ্বংস করে। ওই একাত্তর সালেই সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান আন্তর্জাতিক চাপে বাধ্য হয়ে রমনা কালীবাড়ি পুননির্মাণের টেন্ডার আহবান করেছিলেন এরকম শোনা যায়। যাহোক বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে দেখা করে রমনার কালীমন্দির পুনঃনির্মাণ করার অনুমতি পাননি। শেখ মুজিবুর বোধকরি তাদের বলেছিলেন, ওই নাজুক সময়ে মন্দির নির্মাণের অনুমতি দিলে তাঁর সরকারের বিপদ হতে পারে। এইভাবে খোদ মুজিব শাসনামলেই তাদের একটার পর একটা আশাভঙ্গ ঘটতে থাকে।

উনিশশো পচাত্তর সালে শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর পুরো রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটটিই পাল্টে গেলো। পাকিস্তানপন্থী শক্তির ক্ষমতা দখল করার পর হিন্দুরা অধিকতরো অসহায় এবং জাতীয় জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন বোধ করতে থাকেন। তারপরে জিয়াউর রহমানের আমলে এসে সংবিধানের যখন পরিবর্তন করা হলো, হিন্দু সমাজের হতাশা ঘনীভূত আকার ধারণ করলো। তাদের মনোভাব দাঁড়ালো এ রকম, বাপ, পিতামহের এই দেশটিতে আমাদের কোনো অধিকার নেই। এই দেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে আমাদের চূড়ান্ত রকম আত্মত্যাগ করতে হয়েছে। তথাপি আমাদের সামাজিক অবস্থার কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। সংখ্যাগুরু মুসলমান সম্প্রদায়ের পাশাপাশি আমাদের বসবাস করতে হয়। আমাদের পুকুরের মাছ, ক্ষেতের ধান, বাগানের তরিতরকারী ঐ সম্প্রদায়ের লোকেরা এসে যখন জোর করে কেটে নিয়ে যায়, আমরা কোনো প্রতিবাদ করতে পারিনে। আমরা বিচার পাইনে, পুলিশ আমাদের কথা শুনে না, আইন আদালত করলে অবস্থা সঙ্কটাপন্ন হয়ে পড়ে। আমরা স্কুলে কলেজে ছেলেমেয়ে পাঠিয়ে নিশ্চিন্ত এবং নিরাপদ বোধ করতে পারিনে। আমাদেরকে চাকরি বাকরি দেয়ার ক্ষেত্রে চূড়ান্ত বৈষম্যের নীতি অনুসরণ করা হয়। আমরা কারবার তেজারত করে জীবন ধারণ করবো, সেরকমও ভরসা পাইনে। এই দেশটিতে থেকে আমাদের কী লাভ হবে। দলে দলে হিন্দুরা দেশত্যাগ করতে আরম্ভ করলেন।

বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবোধ প্রবল হয়ে উঠছিলো, তার প্রভাব যে হিন্দুদের ওপর পড়েনি সে কথাও বলা যাবে না। চিত্তরঞ্জন সুতারের নেতৃত্বে স্বাধীন বঙ্গভূমি আন্দোলন নামে একটি আন্দোলন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিলো। সুতার বাবুর দাবী ছিলো বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী তিনটি জেলা হিন্দু জনসাধারণের বসবাসের জন্য আলাদা করে দেয়া হোক। হিন্দু মৌলবাদী শক্তি চিত্তরঞ্জন সুতারকে দিয়ে এ আন্দোলনটি সৃষ্টি করিয়েছিলো। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারও বাংলাদেশ সরকারকে বিব্রত করার জন্য বঙ্গভূমি আন্দোলনকে উস্কে দিয়েছে। এরশাদ ক্ষমতায় এসে সংসদে আইন পাশ করে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার পর কিছুই অবশিষ্ট নেই। দেশত্যাগের মাত্রা অধিক হারে বেড়ে গেলো। নানা রাজনৈতিক এবং সামাজিক সংগঠন ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানালো বটে, কিন্তু আইনটি রদ করা সম্ভব হলো না। উনিশশো ছিয়ানব্বই সালে হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে অধিকতররা গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ক্ষমতা লাভের পরও দেখা যাচ্ছে আইনটি যথাযোগ্য বহাল রয়েছে।

উনিশশো একানব্বই সালে ভারতে বিজেপির নেতৃত্বে হিন্দু মৌলবাদীরা মোগল সম্রাট বাবর কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত একটি ষোড়শ শতাব্দীর মসজিদ ভেঙ্গে ফেলে, ওই জায়গায় শ্রীরামচন্দ্রের নামে একটি মন্দিরের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করে। তার প্রতিবাদে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে গ্রাম গঞ্জ সর্বত্র হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সাম্প্রদায়িক মুসলমানেরা হামলা শুরু করেন। হিন্দুদের ঘরবাড়িতে আগুন লাগানো হয়, তাদের দোকান পাট ভেঙ্গে ফেলা হয়, তাদের মন্দির ও দেবালয় শয়ে শয়ে ধ্বংস করা হয়। খালেদা জিয়ার সরকার দাঙ্গা প্রতিরোধ করার কোনো ব্যবস্থাই গ্রহণ করলেন না। অপর প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ব্যপক মুসলমানের কাছে অপ্রিয় হওয়ার ভয়ে হিন্দুদের পাশে এসে দাঁড়াতে পারলেন না। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষেরা দেশ ভাগ হওয়ার পর থেকে অনেকবার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার শিকার হয়েছেন। উনিশশো একাত্তরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিষ্ঠুরতাও তাদের সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু উনিশশো একানব্বই সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংসজনিত নিষ্ঠুরতার সঙ্গে অন্য কোনো নিষ্ঠুরতার তুলনা চলে না। তারা চূড়ান্ত অসহায়তা সহকারে প্রত্যক্ষ করতে বাধ্য হলেন, কী প্রচণ্ড আক্রোশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ তাদের ওপর আক্রমণ করতে পারে। তারা মর্মে মর্মে অনুভব করলেন, সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের ওপর সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের আক্রোশ, সময় বিশেষে তা সাইক্লোন, সমুদ্র প্লাবন কিংবা বিধ্বংসী ভূমিকম্পের চাইতেও মারাত্মক হতে পারে।

এই সমস্ত ঘটনার অভিঘাত হিন্দু সম্প্রদায়ের সংবেদনাকে এতোটা আহত করেছে, তারা বাংলাদেশে নির্ভর করার মতো কোনো অবলম্বনই খুঁজে পেলেন না। কোন পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ সমর্থক বিচারপতি দেবেশ ভট্টাচার্যের মতো মানুষকে ভোরের কাগজে প্রবন্ধ লিখে হিন্দুদের জন্য স্বতন্ত্র নির্বাচন দাবী করতে হয়, তা অনুমান করতে কষ্ট হয়না। সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের প্রতি অবিশ্বাস, সংশয় এবং আতঙ্কের কারণে বাংলাদেশের হিন্দুরা অপর দুটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায় খ্রীষ্টান এবং বৌদ্ধদের নিয়ে হিন্দু বৌদ্ধ ঐক্য পরিষদ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। এই সংগঠনের পেছনের উদ্দেশ্য যতোই মহৎ হোক না কেননা, বাস্তবে তার কর্মকাণ্ড সাম্প্রদায়িক খাতেই প্রবাহিত হচ্ছে একথা বললে অত্যুক্তি করা হবে না। তারপরেও এই ধরনের সংগঠনের যৌক্তিকতা অস্বীকার করা যায় না। মুসলমানেরা যদি সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করতে পারে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোর নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থেকে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের অত্যাচারের শিকার হওয়ার চাইতে সাম্প্রদায়িকভাবে সংগঠিত প্রতিবাদ রচনা করা অনেক পুরুষোচিত কাজ।

তারপরেও একটা কথা থেকে যায়। সংখ্যালঘু এবং সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের মধ্যবর্তী দূরত্ব যদি ক্রমাগত বাড়তে থাকে, এই দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যত কোন পরিণতির দিকে ধাবিত হবে, সেই জিনিশটি কল্পনা করলেও আতঙ্কিত না হয়ে পারা যায় না। বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যেও সাম্প্রদায়িকতার একটা বিষাক্ত স্রোত সাপের মতো এঁকে বেঁকে প্রবাহিত হয়ে হিন্দু জনগোষ্ঠীকে মুসলিম জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে। এই প্রক্রিয়াটি ক্রমশঃ বলবান হয়ে উঠেছে। দুঃখের বিষয় বাংলাদেশের অবস্থানটি যদি নেপালের মতো হতো আমাদের দুশ্চিন্তা করার বিশেষ কারণ থাকতো না। নেপাল পৃথিবীর মধ্যে একমাত্র হিন্দু রাষ্ট্র হওয়া সত্বেও দক্ষিণ এশিয়ার দেশসমূহের মধ্যে নেপালের জনগণই সবচাইতে ভারত বিরোধী তা এক জরিপে প্রমাণিত হয়েছে। সুদীর্ঘকালের ঐতিহাসিক সংলগ্নতার কারণে ভারত বাংলাদেশ, হিন্দু মুসলমান এই সম্পর্কের ধরনগুলো সরল এবং একমাত্রিক নয়। সেই কারণে ভারত বিরোধিতা এবং হিন্দু বিরোধিতা এক হয়ে দাঁড়ায়। আবার অনায়াসে হিন্দু বিরোধিতাও ভারত বিরোধিতায় রূপান্তরিত হতে পারে। মুসলিম দেশগুলোতে উখিত মৌলবাদের প্রভাব যেমন মুসলিম জনগোষ্ঠীর একাংশকে প্রভাবিত করছে, তেমনি ভারতবর্ষের সজ্ঞা পরিবারভূক্ত রাজনৈতিক দলগুলোর অনুসৃত মৌলবাদ হিন্দু সমাজের একাংশকে তীব্রভাবে আকর্ষণ করছে। মুসলিম মৌলবাদের পাশাপাশি হিন্দু মৌলবাদও সমাজের গভীরে শেকড় বিস্তার করছে। হিন্দুরা যেহেতু সংখ্যালঘু এবং সামাজিকভাবে নির্যাতিত, মৌলবাদের প্রতি তাঁদের ঝুঁকে পড়ার সম্ভাবনা প্রবল।

কতিপয় দৃষ্টান্ত তুলে ধরলে বিষয়টার গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে উঠবে। দেখা গেলো এক সুপ্রভাতে স্বামী বিবেকানন্দের একটি মূর্তি তৈরি করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন জগন্নাথ হল কর্তৃপক্ষ। স্বামী বিবেকানন্দের অন্য অনেক পরিচয় যাই থাকুক, তাঁর ধর্মীয় পরিচয়টাই তাঁর অন্যবিধ পরিচয়কে ছাপিয়ে উঠেছে। ঘোষিতভাবে ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিবেকানন্দের মূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয় না। কিন্তু এখানে যখন আনুষ্ঠানিকভাবে উম্মোচন করা হলো, তখনই মুসলিম শিক্ষকদের কেউ কেউ অগ্রণী হয়ে প্রস্তাব তুললেন সলিমুল্লাহ মুসলিম হল এবং ফজলুল হক মুসলিম হল নতুন করে নামকরণ করা হোক। আরেক শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রাম পাল্টানোর প্রস্তাব করলেন। প্রতিটি ক্রিয়ারই সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া রয়েছে। দুই সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের মধ্যে একটিও অপ্রিয় বাক্য বিনিময় ছাড়া একটি সম্প্রদায় অন্য সম্প্রদায় থেকে কতো দূরে সরে যাচ্ছে, এই সকল ঘটনার মধ্যে তার প্রমাণ মেলে।

পাকিস্তান আমলে জগন্নাথ হল ছিলো শিক্ষা সংস্কৃতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সব চাইতে অগ্রসর ছাত্রাবাস। এই হলটি প্রগতিশীল ছাত্র আন্দোলনের সূতিকাগার হিসেবে বিবেচিত হতো। সাম্প্রতিককালে পূজা পার্বণ ধর্মীয় উৎসব এই হলে এতো অধিক পরিমাণে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, দেখে অনুমান করতে কষ্ট হয় না সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের আতঙ্ক কতো অধিক পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের তরুণদের অন্যবিধ সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ অসম্ভব হয়ে উঠেছে বলেই, তারা অধিক হারে ধর্মকর্মের দিকে মনোযোগী হয়ে উঠছে। হ্যাঁ একটা কথা অবশ্য উঠতে পারে, ভারতের বিজেপির প্রভাবের কারণেই এসব ঘটছে। বাংলাদেশের মুসলমান ছাত্ররা যদি মাদ্রাসায় আফগানিস্তানের তালেবানদের পক্ষে যুদ্ধ করার জন্য গোপনে অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে পারে, তাহলে হিন্দু ছাত্রদের অনুরূপ কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়ার অধিকার কেনো থাকবে না। যুক্তির পিঠে যুক্তি দিয়ে, কথার খেলা অনেক করা যায়। কিন্তু তাতে আসল সংকটের কোনো হেরফের হবে না।

একটা কথা খুব স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করা প্রয়োজন। হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে একটা পলিটিক্যাল ডিমোরালাইজেশনের প্রক্রিয়া অনেকদিন আগে থেকে শুরু হয়েছে। সেটা এখন এমন একটা আকার ধারণ করেছে, সংখ্যাগুরু সংখ্যালঘু কারো পক্ষে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার অবকাশ নেই। পলিটিক্যাল ডিমোরালাইজেশন গ্যাংগ্রিনের মতো, সমাজ দেহের যে কোনো অংশে এর বিষক্রিয়া শুরু হলে অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়তে বাধ্য। সংখ্যালঘুকে আশ্রিত ভেবে করুণা করা, কিংবা ভোট ব্যাংক হিসেবে ব্যবহার করা উভয়ই ন্যায়তঃ স্বাধীন মানুষের নাগরিক সত্তার বিরুদ্ধে অপরাধ। ভারত উপমহাদেশের বিভক্তি, পাকিস্তানের জন্ম, পাকিস্তানের ভাঙন আমাদের ইতিহাসের এই সকল ঘটনা একযোগে ভারত পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের মধ্যে এই পলিটিক্যাল ডিমোরালাইজেশনের জন্ম দিয়েছে। অনুকূল পরিস্থিতিতে সেই ক্ষত শুকিয়ে আসতে থাকে। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তাতে পুঁজ রক্তের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশ যে মূলচিন্তার উপর দাঁড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছে সেই বোধ যদি পূর্ণ দৈর্ঘ্যে বিকশিত হতে পারতো, সংখ্যাগুরু সংখ্যালঘুর ফারাক অবশ্যই কমে আসতো। যে সমস্ত সরকার বাংলাদেশ শাসন করেছে বা এখনো করছে, তারা সোচ্চার মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক হোক বা মুক্তিযুদ্ধের প্রতি কৌশলগত আনুগত্য প্রদর্শন করুক, কমবেশি সকলে এই অপরাধে অপরাধী। তারা মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত মর্মবাণীর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। নির্যাতিত মানুষ যেখানে জন্মগত অধিকার ভোগ করতে পারে না, যেখানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় সমাজে অবস্থানগতভাবেই নির্যাতিত, তাই অন্য সকল নির্যাতিত মানুষের সংগ্রামের সঙ্গে নিজেদের সংগ্রাম জড়িত না করলে সম্প্রদায়গতভাবে তাদের মুক্তি অর্জন অসম্ভব। একমাত্র নির্যাতিত মানবগোষ্ঠীর সম্মিলিত সংগ্রামই সংখ্যাগুরু সংখ্যালঘুর ফারাক রেখা মুছে দিতে পারে।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির বয়স পঁচিশ বছর। কিন্তু বাংলাদেশী সমাজের বয়স হাজার হাজার বছর। সামাজিক সংকটগুলো সামাজিকভাবেই আমাদের সমাধান করতে হবে। সমাজের সংখ্যাগুরু এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোর বিবেকবান দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষদের একটা সত্য অনুধাবন করার সময় এসেছে, আমাদের সকলকে দেশে পাশাপাশি বসবাস করতে হবে। ভালোবাসা দিয়ে এবং ভালোবাসা পেয়ে বেঁচে থাকার একটা মিলিত কৌশল আমাদেরই উদ্ভাবন করতে হবে। অবশ্যই সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের দায়দায়িত্ব এতে অনেক বেশি।

.

০৭.

বাংলাদেশী রাজনীতি সংস্কৃতির যা কিছু উজ্জ্বল অংশ তার সিংহভাগই বামপন্থী রাজনীতির অবদান। ভাষা আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে বামপন্থী রাজনীতির উত্তাপ থেকেই বাঙালী সংস্কৃতির নবজন্ম ঘটেছে। সামন্ত সংস্কৃতির প্রভাবমুক্ত একটি নতুনতরো সংস্কৃতির উন্মেষ বিকাশ লালনে বামপন্থী সংস্কৃতি সেবীদের যে বিরাট সাফল্য এবং ত্যাগ; তিলতিল করে সংস্কৃতির আসল চেহারাটি ফুটিয়ে তোলার কাজে বামপন্থী সংস্কৃতি কর্মীরা যে শ্রম, মেধা এবং যত্ন ব্যয় করেছেন, সে কাহিনী এখনো প্রায় বিস্মৃতিতে বিলীন হতে চলেছে। তাদের সাফল্যের পরিমাণ হয়তো আশানুরূপ ছিলো না। কিন্তু সূচনাটি করেছিলেন এবং অনেকদিন পর্যন্ত সংস্কৃতিকে লালন করেছেন। সংস্কৃতিতে উত্তাপ, লাবণ্য এবং গতি সঞ্চার করার ব্যাপারে বামপন্থী সংস্কৃতি কর্মীরা অনেক কিছু দিয়েছেন। সেই সব মহান আবদানের কথা শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণ করার প্রয়োজন এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

বামপন্থী রাজনৈতিক সংগ্রাম থেকেই বাংলাদেশের জাতীয়তার বোধটি প্রথম অঙ্কুরিত এবং মুকলিত হয়। বাঙালী জাতীয়তার প্রাথমিক সোপানগুলো বামপন্থী রাজনীতির নেতা কর্মীরাই নির্মাণ করেছিলেন। সে জন্য তাদের জেল, জুলুম, অত্যাচার নির্যাতন কম সহ্য করতে হয়নি। সেই সময়ে আওয়ামী লীগ দলটির কাছ থেকেও তাঁদের কম নিগ্রহ ভোগ করতে হয়নি। পাকিস্তানের সংহতি বিনাশকারী, বিদেশী গুপ্তচর ইসলামের শত্রু এই ধরনের অভিযোগ বামপন্থী রাজনীতির নেতা এবং কর্মীদের বিরুদ্ধে হামেশাই উচ্চারিত হতো। এসব লাঞ্ছনা সহ্য করেও বামপন্থী রাজনীতির নেতা এবং কর্মীরা ধর্মতান্ত্রিক পাকিস্তান রাষ্ট্রের কাঠামোর ভেতরেই একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের ভ্রুণ রোপন করতে পেরেছিলেন। বর্তমানে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষেরা যেটুকু সামাজিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক অধিকার ভোগ করেন, তার পেছনে রয়েছে বামপন্থী রাজনীতির বিপুল পরিমাণ অবদান। বামপন্থী রাজনীতিই শ্রমিক, কৃষক, নিম্নবিত্ত সমস্ত নির্যাতিত মানুষকে অধিকার আদায়ের স্বপ্ন দেখিয়েছে, সংগঠিত করেছে এবং আন্দোলনে টেনে নিয়ে গিয়েছে। বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য বামপন্থী আন্দোলন এখন রাজনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ উত্থানরহিত।

বামপন্থী রাজনীতির মুমূর্ষ অবস্থা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাগ্যকে তমশাচ্ছন্ন করে রেখেছে। এই দেশটির সত্তর ভাগ মানুষ দারিদ্র সীমার নীচে বসবাস করে। অথচ এই দেশটির রাজনৈতিক ক্ষমতা যারা নিয়ন্ত্রণ করে, তার মধ্যে এই বিপুল পরিমাণ জনসংখ্যার কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। বাংলাদেশের কৃষক শ্রমিক নিম্নবিত্ত মানুষ গুটিকয় মানুষের শোষণ পীড়নের শিকারে পরিণত হয়ে আসছে। তারা এমন কোনো রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তুলতে পারেন নি, যার সাহায্যে তারা নিজেদের ভাগ্য গড়ে তোলার সুযোগ পান।

মধ্যশ্রেণীভূক্ত রাজনৈতিক দলগুলো বাংলাদেশের নির্যাতিত জনগোষ্ঠীকে শোষণের মাধ্যমেই নিজেদের অবস্থান টিকিয়ে রেখেছে। তাদের দৃষ্টিভঙ্গী অত্যন্ত সঙ্কীর্ণ। তারা দেশে শিল্পকারখানা তৈরি করে দেশের বেকার সমস্যা সমাধান করতে পারেন না। অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে নতুন প্রাণ সঞ্চার করতেও তারা অক্ষম। বাংলার ঘুণেধরা গ্রাম সমাজের কাঠামোর পরিবর্তন করে নতুন সমাজ সৃষ্টি করার পরিকল্পনা তাদের নেই। সংখ্যাধিক জনগোষ্ঠীর প্রাণপ্রিয় দাবী খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও শিক্ষাব্যবস্থা এসবের ব্যবস্থা তারা করেন না। আমাদের ব্যাপক জনগোষ্ঠীর মধ্যে যে বিপুল পরিমাণ সৃজনী ক্ষমতা রয়েছে, সেটাকে মুক্তি দিয়ে দেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নির্মাণও তাঁদের অভীষ্ট হতে পারে না। তারা নিজেদের শাসন শোষণের মাধ্যমে জরাজীর্ণ সমাজ ব্যবস্থা টিকিয়ে রেখে গোটা সমাজটাকে এমন একটা কারাগার বানিয়ে রাখতে চান, যাতে করে মানুষ তার অধিকার কখনো ভোগ করতে না পারে। শাসকশ্রেণী সমাজের ওপর তাদের অপ্রতিহত শোষণ ব্যবস্থা কায়েম রাখার জন্য বিদেশী সাম্রাজ্যবাদী শক্তির তাবেদারী করে এবং আগ্রাসী শক্তির সঙ্গে হাত মেলাতেও কুণ্ঠিত হন না। এই সমাজে শ্রমিক কৃষক মেহনতি সমাজের স্বার্থরক্ষা করতে পারে এমন বলিষ্ঠ আন্দোলন সমাজের অভ্যন্তর থেকে জেগে উঠতে পারছে না। আমাদের রাজনৈতিক জীবনে বামপন্থী রাজনীতির প্রভাব খুবই সামান্য। বামপন্থী রাজনীতির মধ্যে কোনো ঐক্য নেই। তারা অনেকগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দল উপদলে বিভক্ত। দেশের প্রকৃত বাস্তব পরিস্থিতি বিচার বিশ্লেষণের বদলে অপ্রয়োজনীয় মতাদর্শগত বিতর্কে তাদের সময় কাটে। বাংলাদেশের বামপন্থী দলগুলোর পক্ষে সাধারণ নির্বাচনে প্রার্থী দেয়া অসম্ভব হয়ে ওঠে। কোনো রকমে প্রার্থী দাঁড় করাতে পারলেও সে সকল প্রার্থী নির্বাচনে এমন শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়, তাদের জামানত পর্যন্ত বাজেয়াপ্ত হয়। তাদেরকেও মধ্যশ্রেণীভূক্ত রাজনৈতিক দলগুলোর মতো ধনিকদের চাঁদার ওপর নির্ভর করতে হয়। এক কথায় বাংলাদেশে বামপন্থী রাজনীতি সর্বপ্রকার উত্থানশক্তি হারিয়ে বসেছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বামপন্থীদের কোনো অবস্থান না থাকার কারণে বেবাক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দক্ষিণপন্থী কক্ষপথে ঢুকে পড়েছে। এই দুষ্টচক্রের ভেতর থেকে টেনে বের করতে না পারার কারণে গোটা রাজনীতিটাই পচে উঠেছে।

বামপন্থী রাজনীতির এই দৈন্যদশা সমস্ত দেশপ্রেমিক এবং মুক্তিকামী মানুষের দুর্ভাবনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন একটা সময় ছিলো, যখন বামপন্থী রাজনীতির উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ সকলের সামনে পরিদৃশ্যমান হয়ে উঠেছিলো। সকলে বামপন্থী রাজনীতির ভবিষ্যতের মধ্যেই দেশের ভবিষ্যৎ দেখতেন। এখন তাদের অতীত দিনের স্মৃতির কথা স্মরণ করে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। বাংলাদেশের শহর বন্দর গ্রাম গঞ্জের হাজার হাজার কর্মী যারা দেশ এবং জাতির সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য সব রকমের আত্মত্যাগ করতে কুণ্ঠিত হননি। এই সমস্ত ত্যাগী এবং নিষ্কলঙ্ক কর্মীরা এখন সকলের করুণার পাত্রে পরিণত হয়েছেন। রাজনীতি, কালোবাজারী, লুঠেরা, চোরাচালানি-এক কথায় সমাজের যতো খারাপ মানুষ আছে, তাঁদের স্থায়ী পেশায় রূপান্তরিত হয়েছে। রাজনীতিতে সৎ মানুষের অবস্থান বহুকাল পূর্বেই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, চিহ্নিত অপরাধী, মাফিয়াচক্রের হাতে দেশের কোটি কোটি মানুষের ভাগ্য বন্দী হয়ে আছে। এই অবস্থাটি যদি দীর্ঘদিন এভাবে চলতে থাকে, এই সমাজ মানুষের বসবাসের সম্পূর্ণ অযোগ্য হয়ে পড়বে।

এই পরিস্থিতির অবসান ঘটানোর জন্য দেশের কৃষক শ্রমিক মেহনতি মানুষের একটি রাজনৈতিক উত্থান অবশ্যম্ভাবী। পরিতাপের বিষয় হলো কৃষক, শ্রমিক, বিত্তহীন এবং নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনের সঙ্কট পূর্বের তুলনায় বহুগুণ বেড়েছে। অথচ তাদের প্রতিবাদ করার কোনো উপায় নেই। তাদের দাবীর কাছে শোষকশ্রেণীগুলেকে নতি স্বীকারে বাধ্য করতে পারে, এমন কোনো সংগঠন নেই। ইতিহাস ঘাটলে এমন বহু প্রমাণ পাওয়া যাবে বাংলাদেশের নির্যাতিত জনগণ অতীতে এরকম উত্থানশক্তিহীন ছিলো না। কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র এবং নিম্নবিত্ত মানুষের সম্মিলিত আন্দোলনের তোড়ে ভূতপূর্ব পাকিস্তানের জঙ্গী লাট আয়ুব খানকে পর্যন্ত পরাজয়ে স্বীকার করতে হয়েছে। অথচ বর্তমান সময়ে দরিদ্র মানুষের একজন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পর্যন্ত নির্বাচিত করার ক্ষমতা নেই।

বামপন্থী রাজনীতির বর্তমান স্থবিরতার কারণগুলো অনুসন্ধান করতে হলে আমাদের পেছনের দিকে না তাকিয়ে গত্যন্তর নেই। বামপন্থী রাজনীতির মধ্যে যে উজ্জ্বল সম্ভাবনা মূর্তিমান হয়ে উঠেছিলো, তা অনেকের মধ্যেই আশাবাদ জাগিয়ে তুলতে পেরেছিলো। সকলে আশা করেছিলেন বামপন্থী রাজনীতিই দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হবে। বামপন্থী রাজনীতির প্রবল প্রবাহে স্তরের পর স্তর বালু সঞ্চিত হয়ে মূল স্রোতধারাটিই রুদ্ধ করে ফেলেছে। বিভ্রন্তি বিচ্যুতির সে বালুরাশি খনন করে বামপন্থী রাজনীতির গতিমুখটি উন্মুক্ত করে দেয়ার জন্য অতীতের বিচ্যুতি এবং বিভ্রান্তিগুলোর দিকে অত্যন্ত নির্মোহ দৃষ্টিতে তাকানো অত্যাবশ্যকীয় হয়ে উঠেছে।

উনিশশো পঁয়ষট্টি সালের পূর্বে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, কমিউনিস্ট পার্টি, ছাত্র ইউনিয়ন, শ্রমিক ইউনিয়ন এবং কৃষক সমিতি যখন অবিভক্ত ছিলো, সে সময়টাই ছিলো বামপন্থী রাজনীতির স্বর্ণযুগ। সমাজের ভেতর থেকে সেই সময়ে যে শক্তিপুঞ্জ জাগ্রত হয়ে উঠেছিলো সকলে আশা করতেন, হয়তো সেদিনের বেশি দেরী নেই, যখন এই সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে এই দেশে জনগণের কল্যাণমূখী একটা সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে। আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলন মতাদর্শগত কারণে দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। দুনিয়ার কমিউনিস্ট আন্দোলনের সাচ্চা নেতা কে চীন না সোভিয়েত ইউনিয়ন, তা নিয়ে মতদ্বৈধতা দেখা দেয়। কমিউনিস্ট আন্দোলন দ্বিধাবিভক্ত হয়। একদিকে চীন, অন্যদিকে রাশিয়া। তার প্রভাব আমাদের দেশেও পড়ে। কমিউনিস্ট পার্টি, ছাত্র ইউনিয়ন, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, কৃষক সমিতি, শ্রমিক ইউনিয়ন এই সকল সংগঠন চীন রাশিয়ার প্রশ্নে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। এই চীন-সোভিয়েত বিরোধের কারণে তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের বামপন্থী আন্দোলনের ওপর প্রথম আঘাতটা আসে।

তারপরে ভারত আর চীনের মধ্যে যখন সীমান্ত যুদ্ধ সংগঠিত হয়, আমাদের দেশের বামপন্থী আন্দোলনে আরো একটা বিভক্তি নেমে আসে। বেশিরভাগ হিন্দু সম্প্রদায় থেকে আগত নেতা এবং কর্মী সোভিয়েত রাশিয়ার প্রতি সমর্থন দিতে থাকেন। অন্যদিকে মুসলিম সমাজ থেকে আগত বেশিরভাগ নেতা এবং কর্মী চীনের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করেন। এই সময়ের হিন্দু কমিউনিস্ট এবং মুসলমান কমিউনিস্ট শব্দ দুটি সমাজে ব্যাপকভাবে চালু হয়ে যায়। বামপন্থী আন্দোলনের মধ্যে এই যে বিভক্তি ঘটলো, তার পেছনে আমাদের দেশের আভ্যন্তরীন পরিস্থিতির চাইতে আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহের প্রভাবই সর্বাধিক সক্রিয় ছিলো।

উনিশশো পঁয়ষট্টি সালের ভারত পাকিস্তান যুদ্ধের পর শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ যখন ছয় দফা কর্মসূচীর মাধ্যমে বাঙালী জাতীয়তাবাদের প্রশ্নটি সামনে নিয়ে আসেন, মস্কো সমর্থক রাজনীতির অনুসারীরা পারস্পরিক বিবাদে রত ছিলেন। কিন্তু দুটি দলই ছয় দফা কর্মসূচীর নিন্দা করতে ছাড়লেন না। সে সময়ে রাশিয়া ভারত এবং পাকিস্তান মিলিয়ে চীন বিরোধী একটা ব্লক করার প্রস্তাব দিয়েছিলো। মূখ্যতঃ সে কারণে মস্কোপন্থী সংগঠনগুলো নিখিল পাকিস্তানের অখণ্ডত্ব রক্ষার প্রতি অধিক যত্নবান হলেন। পরিতাপের বিষয় এই যে মস্কোপন্থী ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির নেতা অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ উনিশশো চুয়ান্ন সালে ‘হোয়াট ইজ অটোনমি’ পুস্তি কাটি লিখে প্রকারান্তরে তৎকালীন পূর্ব বাংলার জাতি সত্তার প্রশ্নটি তুলে ধরেছিলেন। উনিশশো পঁয়ষট্টি সালের পর আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের স্বার্থটা বড়ো করে দেখার কারণে তার লেখা পুস্তিকাটি অধ্যাপক সাহেব বেমালুম ভুলে যেতে পেরেছিলেন।

সেই সময়ে মওলানা ভাসানীর ছত্রচ্ছায়ায় বেইজিংপন্থী রাজনীতি পরিচালিত হচ্ছিলো। ভারত পাকিস্তান যুদ্ধে চীন পাকিস্তানের অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলো বলে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। চীনপন্থী রাজনীতির অনুসারীরা আদর্শগত কারণে চীনের প্রতি অনুগত ছিলেন। চীনের নেতৃবৃন্দ তাদের অনুসারীদের বোঝাতে সক্ষম হলেন যে প্রেসিডেন্ট আয়ুব খানের বিরোধিতা করলে পাকিস্তানের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন বাধাগ্রস্থ হবে। সুতরাং চীনপন্থীদের মধ্যে আয়ুবের বিরোধিতা না করার একটা মনোভাব স্পষ্ট হয়ে উঠে। বরঞ্চ তারা শেখ মুজিবের ছয় দফার বিরোধিতা করতে আরম্ভ করেন এবং ছয়দফার মধ্যে সিআইএ-এর ষড়যন্ত্রের আভাস পেয়ে যান।

মস্কো এবং বেইজিংপন্থী রাজনৈতিক দল দুটো যখন পারস্পরিক বাদবিসংবাদে মত্ত সেই সময়ে শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফার প্রতি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের উঠতি মধ্যবিত্ত সমর্থন দিয়ে বসে আছে। শহর বন্দর গ্রাম গঞ্জ সর্বত্র ছয় দফার সমর্থনে প্রবল গণজোয়ারের সৃষ্টি হলো। বাঙালী জাতীয়তাবাদের অপ্রতিহত জয়যাত্রা দেখে মস্কোপন্থী রাজনীতির অনুসারীরা যখন আওয়ামী লীগের কাছে দাবী জানালেন যে আন্দোলনে তাঁদেরও অংশীদার করা হোক, শেখ সাহেব এক বাক্যে জানিয়ে দিলেন, দলের সাইনবোর্ড পাল্টে আওয়ামী লীগে চলে আসুন। বাঙালী জাতীয়তাবাদের যে উত্তাল উত্থান পঁয়ষট্টি পরবর্তী রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্যে জেগে উঠেছিলো বামপন্থী রাজনীতি তার নেতৃত্ব থেকে সম্পূর্ণরূপে বাদ পড়ে গেলো । অথচ এটা অবিসংবাদিত সত্য যে বাঙালী জাতীয়তার বিকাশের প্রাথমিক সোপানগুলো, বামপন্থী রাজনীতির নেতা এবং কর্মীরাই নির্মাণ করেছিলেন।

নকশাল বাড়ি আন্দোলনের স্থপতি কমরেড চারু মজুমদার পশ্চিম বাংলার কমিউনিস্ট রাজনীতিতে একটা নতুন চমক সৃষ্টি করলেন। তাঁর শ্ৰেণীশত্রু খতমের তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের চীনপন্থী রাজনীতির একাংশকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করে। আবদুল হক এবং মোহম্মদ তোঁয়াহা, মওলানা ভাসানীর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজেদের একটা দল তৈরি করেন। পাকিস্তান সেনা বাহিনীর দখলদারিত্বের সময়ে কমরেড আবদুল হক পাকিস্তানের অখণ্ডত্ব টিকিয়ে রাখার পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেন। মোহাম্মদ তোঁয়াহা এবং সুখেন্দু দস্তিদার হকের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করে দেশের অভ্যন্তরে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করেন। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের নেতা আব্দুল মতিন, আলাউদ্দিন, অধ্যাপক অহিদুর রহমান প্রমূর্খ উত্তরবঙ্গের আত্রাই অঞ্চলে সশস্ত্র যুদ্ধের নেতৃত্ব দেন।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দখলদারিত্বের সময়েই চীনপন্থী রাজনীতির ভেতর থেকে সুদক্ষ সংগঠক সিরাজ শিকদারের আবির্ভাব। তিনি স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা কায়েম করার দাবীতে একাধিক সশস্ত্র সংগ্রামে সফল নেতৃত্ব দান করেন। সিরাজ শিকদারের রাজনৈতিক আন্দোলনের ধারাটি কিছুকাল সক্রিয় ছিলো। তাঁর মর্মান্তিক মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে ওই ধারাটির অবসান রচিত হয়। রণো এবং মেননের অনুসারীরা আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার নেতৃত্বে নরসিংদীর গ্রামে সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ করেছেন। সংক্ষেপে এই-ই হলো চীনপন্থী রাজনীতির অনুসারীদের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের অবস্থানগত একটা খতিয়ান।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত রাশিয়া একটা মস্তবড়ো সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিলো। মুখ্যতঃ রাশিয়ার চাপের কারণেই বাংলাদেশের সংবিধানের রাষ্ট্র পরিচালনার মূল নীতির মধ্যে সমাজতন্ত্র স্থান দখল করে নিতে পেরেছিলো। সোভিয়েতপন্থী কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, ছাত্র ইউনিয়ন, শ্রমিক ইউনিয়ন, সাংস্কৃতিক সংগঠন, মহিলা সংগঠন ও কৃষক সংগঠন মিলিয়ে সমাজে তাদের একটা বড়ো রকমের অবস্থান ছিলো। তারা যদি ইচ্ছা করতেন, বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশের পক্ষে কোনো বাধা ছিলো না। কিন্তু সোভিয়েত রাশিয়ার নির্দেশে তাদের এক দলীয় শাসন ব্যবস্থা মেনে নিতে হলো। এই ঘটনাটি তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উভয়কে এমন একটা অন্ধকার গহ্বরে নিক্ষেপ করে, সেখান থেকে অদ্যাবধি কারো পুরোপুরি উঠে আসা সম্ভব হয়নি। সেদিন যদি কোনো রকমে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটি চালু রাখা যেতো, বাংলাদেশে একের পর এক স্বৈরশাসন জন্ম নিতে পারতো না। দৃশ্যতঃ বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা চালু করা হলেও দেশটিকে বিগত দিনের দায়ভাগ অদ্যাবধি বয়ে বেড়াতে হচ্ছে।

বাম রাজনীতির সর্বশেষ তরঙ্গটি জেগে উঠেছিলো আওয়ামী লীগ সংগঠনটিরই ভেতর থেকে। আওয়ামী লীগের নিরাপোষ লড়াকু তরুণ যারা আওয়ামী লীগকে পাকিস্তানের সঙ্গে কোনোরকম আপোষ করতে দেয়নি, স্বাধীনতার পর তারাই আওয়ামী লীগ থেকে ছিটকে বেড়িয়ে এসে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল সংক্ষেপে জাসদ গঠন করে। জাসদ দলটিকে বামধারার রাজনীতির সঙ্গে এক করে দেখা বোধকরি ঠিক হবে না। আওয়ামী তরুণ র‍্যাডিক্যাল অংশ থেকেই জাসদের সৃষ্টি। বিপ্লবের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবী উচ্চারণ করলেও অধিকসংখ্যক তরুণের তারুণ্যই ছিলো তাদের প্রাণশক্তি। দলটি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ থেকে ছিটকে বেরিয়ে এসেছিলো বলে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধেই ছিলো তার প্রবল ক্ষোভ। আওয়ামী লীগকে সরিয়ে দিয়ে ক্ষমতায় আসার উগ্র আকাঙ্ক্ষার কারণে কোনো সুচিন্তিত রাজনৈতিক দর্শন দলটির চালিকা শক্তি হয়ে উঠতে পারেনি। একের পর এক আত্মঘাতী উদ্যমের মধ্যে দলটি শক্তি ক্ষয় করতে থাকে। শেখ মুজিব নিহত হওয়ার পর সামরিক শাসন যখন চেপে বসে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের নেতা এবং কর্মীর মধ্যে একের পর এক বিভ্রান্তি জন্ম নিতে আরম্ভ করে। শেখ মুজিবের মৃত্যুর দেড় দশকের মধ্যেই দলটি অনেকগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। জাসদের অপমৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতির সব চাইতে করুণ সংবাদ। এই দলটির ছত্রখান হয়ে যাওয়ার মধ্যে একটি যুগের একটি প্রজন্মের বিপ্লবী আকাক্ষার অবসান ঘটে।

.

০৮.

বাংলাদেশের রাষ্ট্রসত্তাকে ঘিরে যে সকল বিতর্ক জন্ম নিয়েছে, আসলে সেগুলো পাকিস্তান রাষ্ট্রেরই উত্তরাধিকার। অর্থাৎ হিন্দু মুসলমান এবং অপরাপর জাতি মিলে একটি জাতি না দুটি জাতি না অনেক জাতি। বৃটিশ ভারতে এ সমস্যাটার সমাধান হয়নি, তাই ভারতকে দু’টুকরো করতে হয়েছে। পাকিস্তান রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যে জাতীয়তার সংকটটির নিরসন হয়নি বলেই পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সৃষ্টি করতে হয়েছে। দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশেও সেই মৌলিক সংকটটি নানান ছদ্মবেশ ধারণ করে জাতীয়তা সৃষ্টির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিশেষ বিশেষ সময় আসে, যখন ধর্ম, সংস্কৃতি এবং জাতীয়তার প্রশ্নে বিভাজন রেখাগুলো বড়ো বড়ো ফাটলের জন্ম দেয়। বাংলদেশ রাষ্ট্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য এটাকে বলা যাবে না। কিন্তু একথা তো সত্যি একটা শেকলের জোর কতো তার দুর্বল কড়াটির প্রতিরোধ ক্ষমতার মধ্যেই প্রমাণ মিলে ।

ভারতের দিকে দৃষ্টিপাত করলে আমরা কী দেখতে পাই? বৃটিশ বিদায়ের প্রাক্কালে সমস্ত ভারতীয়রা মিলে একটা জাতি, তার ভিত্তিতেই ভারতীয় ইউনিয়নের সৃষ্টি হয়েছিলো। সেই জায়গাটিতে ভারত কি স্থির থাকতে পারছে? বিকাশমান জাতীয়তার ধারণাগুলো ভারত অস্বীকার করতে পারছে না, নতুন নতুন জাতীয়তার ধারণাগুলোর সঙ্গে ফেডারেল রাষ্ট্রকাঠামোর সংঘাত লেগেই আছে। খুব শ্লথগতিতে হলেও ভারতকে এই বহু জাতীয়তার অভিমুখে অগ্রসর হতে হচ্ছে। ভারতে যে ব্যাপারটি বিবর্তন, রূপান্তর এবং ক্রমাগত পরিবর্তন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঘটছে, সেই একই জিনিস পাকিস্তানে আচমকা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ঘটে গেছে। এই ঘটনার সঙ্গে সীজারিয়ান অপারেশনের তুলনা করা যায়।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়ায়। কিন্তু মনে রাখতে হবে পাকিস্তান মুসলিম লীগেরই ধারাবাহিক বিবর্তনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ জন্ম নিয়েছে। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে তার চিন্তা-চেতনায় অনেক নতুন মৌল উপাদানের সংযোজন হয়েছে। কিন্তু তারপরেও একটা জিজ্ঞাসা এখানে প্রধান হয়ে দেখা দেয়। যে সামাজিক শক্তিগুলো ভারত রাষ্ট্রকে এক জাতীয়তার মধ্যে বহু জাতীয় অবস্থানের দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সেই সামাজিক শক্তিগুলোর প্রতিনিধিত্ব করছে কিনা। উত্তর হবে খুব সম্ভবতো ‘না’। বামপন্থী আন্দোলনের সার্বিক উত্থানই বাংলাদেশের বিবাদমান সম্প্রদায়, জাতি গোষ্ঠীগুলোর মধ্যবর্তী দূরত্ব, সংঘাত কমিয়ে আনতে সক্ষম। মনে রাখা প্রয়োজন শোষিত শ্ৰেণীগুলোর নেতৃত্বে রাষ্ট্রের চরিত্রের মধ্যে পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। সংবিধানে পঞ্চাশ পাতা লিখেও সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং প্রান্তিক জাতিগুলোর অধিকার দেয়া যাবে না। বামপন্থী রাজনীতির সার্বিক উত্থান ছাড়া এই দেশটির মুক্তি সম্ভব নয়। বামপন্থী আন্দোলনের বিকাশের ধারাটি পর্যালোচনা করে যে সকল বাঁকে বিভক্তি, বিভ্রান্তি, বিচ্যুতি আন্দোলনের গতিবেগকে দুর্বল করেছে, ভুল পথে পরিচালিত করেছে, ঠাণ্ডা মাথায় সেগুলো চিহ্নিত করে বামপন্থার বিকাশের নতুন সম্ভাবনাগুলো খুঁজে বের করার এখনই প্রকৃষ্ট সময়।

যেসকল কারণে বামপন্থী রাজনীতি এদেশের প্রধান রাজনৈতিক ধারা হয়ে উঠতে পারে নি সেগুলোরও একটা খতিয়ান করা প্রয়োজন। প্রথমতঃ জাতিসত্তার প্রশ্নটি পাশ কাটিয়ে বামপন্থী রাজনীতি বিপ্লবের প্রশ্নটিকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলো এবং তাই-বামপন্থী রাজনীতি জাতীয় নেতৃত্বে অবস্থান হারিয়েছে। দ্বিতীয়তঃ আন্তর্জাতিক রাজনীতির মতাদর্শগত দ্বন্দ্বটি আমাদের দেশের বামপন্থী দলগুলো যতোটা বড়ো করে দেখেছে, আমাদের দেশের শোষিত জনগণের প্রশ্নটি তাঁদের চোখে সে তুলনায় গৌণ হয়ে দেখা দিয়েছে। তৃতীয়তঃ অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটা মৌলিক উন্নয়ন কৌশলের সঙ্গে রাজনৈতিক আন্দোলনের সংযোগ সাধন করে পরিবর্তনকামী শক্তিগুলো একটা জঙ্গী ঐক্যমোর্চায় টেনে আনার ব্যাপারে তারা বারবার ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। চতুর্থতঃ আমাদের শোষিত জনগণের সামগ্রিক স্বার্থটির প্রতি দৃষ্টি না দেয়ার কারণে বামপন্থী দলগুলোর মধ্যে মধ্যশ্রেণীভূক্ত রাজনৈতিক দলগুলোর কনিষ্ঠ অংশীদার হওয়ার প্রবণতা জনগণের মধ্যে তাদের গ্রহণযোগ্যতা অসম্ভব করে তুলেছে। পঞ্চমতঃ মেহনতি জনগণের সংস্কৃতির বিকাশ সাধনের ক্ষেত্রে তাদের পর্বতপ্রমাণ ব্যর্থতা সামন্ত সংস্কৃতির রিক্তাবশেষকে টিকিয়ে রাখতে বিশেষ সাহায্য করেছে, যা প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির সহযোগীতায় বারবার আমাদের সংস্কৃতির গতিধারার সুষ্ঠু বিকাশ প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করেছে। ষষ্ঠতঃ। বৃহত্তরো জনগোষ্ঠীর মানস চৈতন্যের শুশ্রূষা করে তার মান উন্নত এবং বোধ উপলব্ধিতে নতুন সমাজের ভ্রণ গ্রহণ করার পরিবেশ সৃষ্টি না করে অনুভূতিকে আহত করার প্রবণতা বৃহত্তরো জনগণকে বামপন্থার প্রতি বিমুখ করে তুলেছে। সপ্তমতঃ সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং প্রান্তিক জাতিসমূহের নিরাপত্তা এবং জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণের অধিকারের প্রতি যথেষ্ট অঙ্গীকারসম্পন্ন না হওয়ার কারণে, তাদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি জন্ম দিয়েছে। অষ্টমতঃ বামপন্থী রাজনৈতিক দল এবং নেতৃবৃন্দ সমস্ত জাতির নেতৃত্ব দেয়ার বদলে সমাজে বিশেষ বিশেষ অংশকেই কর্মক্ষেত্র মনে করেন বলে তারা একটি পলায়নবাদী, পরাজিত মানসিকতার শিকারে পরিণত হয়েছেন। সে কারণে বামপন্থী রাজনীতিকে আমাদের রাজনীতির প্রধান ধারা হিসেবে তারা চিন্তা করতেও সক্ষম নন। নবমতঃ বিশ্বপরিসরে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর পতন আদর্শিকভাবে আমাদের বামপন্থী দলগুলোর নেতা এবং কর্মীদের হতবিহ্বল হরে ফেলেছে। তাই তারা আমাদের শোষিত জনগণের উত্থান ক্ষমতার প্রতি আস্থা স্থাপন করতে পারেন না। দশমতঃ বাজার অর্থনীতির জয়যাত্রা বামপন্থী বুদ্ধিজীবী এবং অর্থনীতিবিদদের একাংশকে মোহাবিষ্ট করে ফেলেছে। তারা জনগণের শ্রমনির্ভর অর্থনৈতিক বিকাশের পথ পরিহার করে বাজারের ওপর অত্যধিক গুরুত্ব প্রদান করছেন। তাদের এ দৃষ্টিভঙ্গী সঠিক নয়। বিকল্প অর্থনৈতিক যুক্তি নির্মাণে বামপন্থী অর্থনীতিবিদদের মধ্যে কাউকে এগিয়ে আসতে দেখা যাচ্ছে না। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফএ সকল আন্তর্জাতিক অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান ধনী দেশগুলোর স্বার্থকেই প্রাধান্য দিচ্ছে। আমাদের জাতীয় স্বার্থের প্রেক্ষিতটি তারা উপেক্ষা করে থাকেন। একাদশতম কারণ হিসেবে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাসমূহের জনউদ্যোগ এবং সামাজিক সংহতি বিনষ্ট করার বিষয়টি উল্লেখ করতে চাই। আমাদের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির এ পর্যায়ে হয়তো স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাসমূহকে অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাসমূহ যেভাবে সরকারের উত্থানপতনে অংশগ্রহণ করতে শুরু করেছে, তাদের এ ক্ষতিকারক ভূমিকার বিরুদ্ধে সম্মিলিত সামাজিক প্রতিরোধ প্রয়োজন। তারাই বামপন্থার বিকাশের প্রধান প্রতিবন্ধক হয়ে উঠবে।

আহমদ ছফা
১৫ আগস্ট ১৯৯৭
উত্থানপর্ব কার্যালয়
ইহা, ৭১ আজিজ সুপার মার্কেট
শাহাবাগ, ঢাকা-১০০০।

.

প্রথম সংস্করণের ভূমিকা

‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ এর লেখক আহমদ ছফা বাঙলাদেশের মধ্য শ্রেণীভূক্ত বুদ্ধিজীবীদের কতকগুলো চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এবং তাঁদের বিশিষ্ট মানসিকতার বিবর্তনের ধারা এই প্রবন্ধ সংকলনটিতে কিছুটা আলোচনা করেছেন। এই আলোচনাকে মূলতঃ বাঙলাদেশের মধ্য শ্রেণীভূক্ত বুদ্ধিজীবীদেরই একজনের স্বশ্রেণীর বিরুদ্ধে একটা নিঃশঙ্ক সমালোচনা বলে আখ্যায়িত করা যেতে পারে। মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে সুবিধাবাদের একটা ঝোঁক যে তাঁদের একটা শ্ৰেণীগত বৈশিষ্ট্য এ বিষয়ে এই তরুণ লেখকের যে কিছুমাত্র সংশয় নেই সেটা তাঁর লেখায় প্রতিটি ছত্রে সুস্পষ্ট, কিন্তু তবু তিনি স্বদেশের বুদ্ধিজীবীদের ব্যাপক সুবিধাবাদিতায় নিদারুণভাবে বিক্ষুব্ধ। তার এই বিক্ষোভের কারণ একদিকে মধ্যশ্রেণীভূক্ত বুদ্ধিজীবীদের একাংশ যে সুবিধাবাদের সাধারণ আবহাওয়ার মধ্যে থেকেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরোপুরি এবং অনেক ক্ষেত্রে আংশিকভাবে সুবিধাবাদ উত্তীর্ণ হতে সক্ষম, এই ধারণার প্রতি তাঁর গভীর আস্থা এবং অন্যদিকে বাঙলাদেশের এই শ্ৰেণীভূক্ত বুদ্ধিজীবীদের বাস্তব কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে একটা সামগ্রিক ও দিগন্তপ্রসারী সুবিধাবাদের অবাধ রাজত্ব। বুদ্ধিজীবীদের সাধারণ সুবিধাবাদের পাশাপাশি তাদের একাংশের সুবিধাবাদ উত্তীর্ণতার যে সন্ধান তিনি করেছেন সেই সন্ধানের ক্ষেত্রে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। এই ব্যর্থতার মধ্যে তার বিভিন্ন বিক্ষুব্ধ মন্তব্যের মর্মকে বোঝার চেষ্টা করতে হবে এবং সে চেষ্টা করলে বর্তমান বাঙলাদেশে যে ব্যাপক অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংকট শ্রমিক, কৃষক ও নিম্ন মধ্যশ্রেণীভূক্ত জনগণের জীবনকে বিপর্যস্ত ও বিধ্বস্ত করছে তারও কতকগুলো মূলসূত্রের সন্ধান এ প্রবন্ধগুলোর মধ্যে পাওয়া যাবে।

বাঙলাদেশে বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে আহমদ ছফা শ্রেণী বিশ্লেষণের কোনো চেষ্টা করেননি। কিন্তু দেশের সাংস্কৃতিক বিকাশ সাধারণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অগ্রগতির সাথে ওতপ্রোত যোগসূত্রে আবদ্ধ একথা তিনি স্বীকার করেছেন। এবং এই স্বীকৃতির ওপরই শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গীর প্রাথমিক ভিত্তি। কোন লেখক যদি নিশ্চল সততা এবং নিরবচ্ছিন্ন অধ্যবসায়কে অবলম্বন করে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জীবনের সাথে সাংস্কৃতিক জীবন এবং সংস্কৃতি চর্চার যোগসূত্র স্থাপনের চেষ্টা করেন তাহলে সংস্কৃতি চর্চাকে তিনি শেষ পর্যন্ত একটা শ্রেণীগত কর্মকাণ্ড বলে সিদ্ধান্ত করতে দ্বিধাবোধ করবেন না এবং নিজের বিশ্লেষণকে আরও সুষ্ঠু ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর উদ্দেশ্যে আলোচনাকে সামগ্রিকভাবে শ্রেণী বিশ্লেষণের ওপর দাঁড় করাবেন । আহমদ ছফা এই সংকলনের প্রবন্ধগুলিতে আলোচিত বিষয়সমূহের ক্ষেত্রে যেহেতু মোটামুটিভাবে সঠিক ভিত্তির ওপরই দাঁড়িয়েছেন সেজন্য এটা আশা করা অবাস্তব হবে না যে ভবিষ্যতে তিনি তার সমালোচনার ক্ষেত্রে শ্রেণী বিশ্লেষণের ওপর যথাযথ গুরুত্ব আরোপ করবেন।

বর্তমান বাঙলাদেশের মধ্যে শ্রেণীভুক্ত বুদ্ধিজীবীদের, বিশেষতঃ ‘লব্ধ-প্রতিষ্ঠ’ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে যে নির্লজ্জতা, ভণ্ডামী, কাপুরুষতা এবং সুবিধাবাদ আজ দোর্দণ্ডপ্রতাপ তা শুধু বুদ্ধিজীবীদের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই। এই প্রবণতা বস্তুত পক্ষে রাজনৈতিক জীবন থেকে রস সংগ্রহ করেই আজ দিকে দিকে অংকুর থেকে পরিণত হচ্ছে মহীরুহে। তথাকথিত সংস্কৃতি চর্চার নামে যে কদর্য বেহায়াপনা, এবং আত্মসেবা এদেশের ‘লব্ধপ্রতিষ্ঠ’ বুদ্ধিজীবীরা আজ করে চলছেন সে বেহায়াপনা এবং আত্মসেবা রাজনীতিবিদদের বেহায়াপনা এবং আত্মসেবার সাথে অবিচ্ছিন্ন। সামগ্রিকভাবে এদেশের সাম্রাজ্যবাদকবলিত বুর্জোয়াশ্রেণী আজ যে শাসন ও শোষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে জনস্বার্থ পদদলিত করে নিজেদের শ্ৰেণীস্বার্থ পুষ্ট করার কাজে নিয়োজিত রয়েছে, তারই একটা সুস্পষ্ট চিত্র মধ্যশ্রেণীভুক্ত এই বুদ্ধিজীবীদের সংস্কৃতি চর্চার মধ্যে পাওয়া যায়।

লেনিন বলেছেন, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চাকে যারা শ্ৰেণীনিরপেক্ষ বলে কলাকৈবল্যবাদ প্রচার করে তারা নির্মম ভণ্ড ব্যতীত আর কিছুই নয়। তাই যারা এক্ষেত্রে কলাকৈবল্যবাদের কথা বলে তারা আসলে শোষকশ্রেণীর সাহিত্য-সংস্কৃতি, তাদের কাব্যচর্চা ইত্যাদির সঠিক শ্রেণীচরিত্রকে শোষিতশ্রেণীর চোখের আড়াল করার উদ্দেশ্যেই তা বলে থাকে। কিন্তু তবু কোন ক্ষেত্রে আমরা দেখি শোষকশ্রেণীভূক্ত এই সমস্ত সংস্কৃতিসেবীদেরকে নিজেদের মুখোস অনেকখানি ছিঁড়ে ফেলতে, নির্লজ্জ এবং নগ্নভাবে শাসকশ্রেণী অর্থাৎ তাদের নিজেদেরই শ্রেণীর বড়ো তরফের ভাড়া খাটতে। আমাদের দেশেও আমরা পাকিস্তানী আমলে, বিশেষতঃ সামরিক শাসনের আমলে, তা দেখেছি। অনেকে ভেবেছিলেন যে, পূর্ব বাঙলায় একটা স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে এই অবস্থার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটবে। কিন্তু তাদের সে আশা ব্যর্থ হয়েছে। এই ব্যর্থতা উদ্ভূত বিক্ষোভই আহমদ ছফার প্রবন্ধের ছত্রে ছত্রে। তিরিশ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন রাষ্ট্রে এই ভাড়াখাটা সংস্কৃতিসেবীদের স্বদেশ প্রেম ও আত্মপ্রেম ন্যাক্কারজনকভাবে একাকার হতে দেখে তিনি অনেকখানি উত্তেজিত হয়েই এই সংকলনে স্থানপ্রাপ্ত প্রবন্ধগুলি রচনা করেছেন।

কিন্তু একটি জিনিশ এখানে উল্লেখ না করলে এই ভূমিকা বহুলাংশে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। কথাটি হলোঃ মধ্যশ্রেণীভূক্ত হোমরা-চোমরা ব্যক্তিদের এবং তরুণ ও ছাত্র সম্প্রদায়ের এক ব্যাপক অংশের উপরোক্ত চরিত্র লক্ষণসমূহকে একেবারে সার্বজনীন মনে করা আজকের এই বাঙলাদেশেও অসঙ্গত। আমরা জানি আমাদের দেশের হাজার হাজার মধ্যশ্রেণীভূক্ত যুবক ও ছাত্র কিভাবে স্বদেশকে ভালবেসে, স্বদেশের স্বাধীনতা ও স্বাধিকারকে অর্জন ও সমুন্নত রাখার জন্যে সবকিছু বিসর্জন দেওয়ার জন্যে প্রস্তুত থেকেছেন, প্রয়োজনে তা বিসর্জন দিয়েছেন। একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও তারা নিজেদের আত্মসম্মান বিসর্জন দেননি। মধ্যশ্রেণীভূক্ত এই তরুণদের মধ্যে আজ অনেকেই নতুনভাবে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগ্রামকে সংগঠিত করার কাজে নিজেদেরকে উৎসর্গ করতে উন্মুখ । অনেকে একাজে ইতিমধ্যেই নিযুক্ত। যে কোন দেশেই বিপ্লবের প্রাথমিক স্তরে শ্রমিক কৃষকের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক চেতনাকে উচ্চস্তরে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এঁদের ভূমিকা অনস্বীকার্য । শুধু তাই নয়। এঁদের এই প্রাথমিক ভূমিকা ব্যতীত কোন দেশে আজ পর্যন্ত কোন বিপ্লব উপযুক্তভাবে সংগঠিত ও সফল হয় নি।

বাঙলাদেশে আজ সাহিত্য ও কাব্যচর্চা এবং সংস্কৃতি ক্ষেত্রে ওপর তলায় সুবিধাবাদের যে নৈরাজ্য দেখা দিচ্ছে সেটা ওপর তলারই ব্যাপার। সামগ্রিক বিচারে তার গুরুত্ব তেমন বেশি নয়। রাজনৈতিক সংগ্রামের তুফানে এই সমস্ত সংস্কৃতি সেবীরা অতীতের মতো ভবিষ্যতেও খড় কুটোর মতো উড়ে যাবে। তাই আজ ওপর তলার এই সমস্ত ভাড়াখাটা সংস্কৃতি সেবীদের সমালোচনার প্রয়োজন অনস্বীকার্য হলেও প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সমালোচনা এবং সংস্কৃতি চর্চার মূল উদ্দেশ্য হতে হবে, যে সমস্ত নূতন ও তরুণরা সম্পত্তি সংগ্রহের ঝোঁক অতিক্রম করে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গীতে সংস্কৃতি চর্চা করতে, রাজনীতি সংগঠিত করতে এগিয়ে আসছেন তাঁদের সহায়তা করা। তাঁদের উম্মেষ ও কর্মক্ষেত্রকে সাহায্য ও প্রসারিত করা ।

আহমদ ছফাও তাঁর এই সংকলনটির শেষে এই ধরনেরই একটা কথা বলেছেন। আশা করা যায় তিনি তার ভবিষ্যৎ রচনা সমূহের মধ্যে শ্রেণীভূক্ত প্রগতিশীল লেখকদের কর্মকাণ্ডের প্রতিই নিজের দৃষ্টিকে অধিকতরো নিবন্ধ রাখবেন।

বদরুদ্দীন উমর
৩/১২/৭২

.

লেখকের কথা

আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যখন রক্ত দিয়েই চিন্তা করতে বাধ্য হচ্ছি। চারদিকে এতো অন্যায়, অবিচার এতো মূঢ়তা এবং কাপুরুষতা ওঁৎ পেতে আছে যে। এ ধরনের পরিবেশে নিতান্ত সহজে বোঝা যায় এমন সহজ কথাও চেঁচিয়ে না বললে কেউ কানে তোলেনা। এই স্বল্প পরিসর গ্রন্থে যা বলেছি সব আমার কথা নয়। হামেশাই যা আলোচিত হতে শুনেছি তাই-ই একটু জোর দিয়ে সাজিয়ে গুজিয়ে বলবার চেষ্টা করেছি। তাও সবসময় পেরেছি তেমন দাবী করতে পারবো না। সৎসাহসকে অনেকে জ্যাঠামী এবং হঠকারিতা বলে মনে করে থাকেন, কিন্তু আমি মনে করি সৎসাহস হলো অনেক দূরবর্তী সম্ভাবনা যথাযথভাবে দেখতে পারার ক্ষমতা। এই ক্ষুদ্র গ্রন্থের যাবতীয় তত্ত্ব এবং তথ্য আমি কোথাও না কোথাও থেকে আহরণ করেছি, কেবল উচ্চকণ্ঠে উচ্চারণ করার সাহসটুকুই আমার ব্যক্তিগত বিনিয়োগ। দৈনিক গণকণ্ঠে যখন লেখাটা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছিলো অনেকে প্রশংসা করেছেন, অনেকে নিন্দা করেছেন! নিন্দা প্রশংসার প্রত্যক্ষ কারণ বলে যা মনে করি, অসংকোচে আমাদের সংস্কৃতির কতিপয় প্রখ্যাত অমানুষের নাম সাকিন উল্লেখ করতে পেরেছিলাম। কুৎসার প্রতি মানব সাধারণের মমতা তো সুবিদিত। বই আকারে বের করার সময় নামগুলো ছেটে দিলাম। সুযোগ সন্ধানীরা অল্প বিস্তর চিরকাল থাকে। মোটাবুদ্ধি, ভোঁতা অনুভূতি, পুরো চামড়াই তাদের টিকে থাকার মূলধন। তার বাইরেও দেশের মানুষের হয়ে, অকৃত্রিমভাবে কিছু অনুভব করতে চেষ্টা করেছি। কবি আল-মাহমুদ ব্যক্তিগতভাবে যত্ন নিয়ে লেখাটা দৈনিক ‘গণকণ্ঠে’র জন্য আমাকে দিয়ে লিখিয়েছিলেন, তার কাছে এবং ‘গণকণ্ঠে’র বন্ধুদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ । শ্রদ্ধেয় বদরুদ্দীন উমর সদয় হয়ে ভূমিকা লিখে দিয়েছেন। খুবই অল্প সময়ের মধ্যে বইটি বের করতে হয়েছে এবং আমি একেবারে আনাড়ি প্রুফ রিডার বলে অনেকগুলো মারাত্মক মুদ্রণ প্রমাদ রয়ে গেলো।

আহমদ ছফা
২০৬ অন্তর্জাতিক ছাত্রাবাস
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
০৫.১২.৭২

https://www.ebanglalibrary.com/96945/%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%ac%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%a7%e0%a6%bf%e0%a6%a4-%e0%a6%b8%e0%a6%82%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%95%e0%a6%b0%e0%a6%a3%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%ad%e0%a7%81%e0%a6%ae%e0%a6%bf/

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*