আহমদ ছফার প্রাতিস্বিক সাধনা–উদয় হাসান

‘বিলাস পালঙ্কে যদি চোখ বুঁজে ঢলে পড়ি
প্রাণের প্রার্থনা—যেন আমি সেইক্ষণে মরি।’
(ছফা, খণ্ড ২:৪২৬)
নিজেকে “বটের শিশু” ভাবতেন কবি ও লেখক আহমদ ছফা—তার ঋষিসুলভ প্রাতিস্বিক সাধনার মূল মন্ত্রের খোঁজ করব আমরা তার ব্যক্তিগত ডায়েরির আশ্রয়ে (মরণোত্তর ২০০৪ সনে প্রকাশিত)।
মুক্তিযুদ্ধে আহমদ ছফার নতুন জন্ম হয়, এছাড়াও আটান্ন বছরের জীবনে নিজেকে একান্ত পরিশ্রম এবং মস্তিষ্কের উর্বর কর্ষণের মাধ্যমে বারবার প্রসব করেছেন। নতুন স্বাধীন দেশে পা রেখেই টের পান জাতীয় বিপ্লব বেহাত হতে চলেছে, কেননা নতুন সমাজের ভার বহনের মতো শক্ত বুনিয়াদ পুরাতন সমাজের ভেতর থেকে আঙ্গিকভাবে গড়ে উঠেনি। ছফার মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় ৭১ এর পর দেশে ফিরে।
যুদ্ধের পরপরই ডায়েরি লেখা শুরু করেন, ৩১শে ডিসেম্বর ডায়েরির প্রথম এনট্রি—তিনি দেশে ফিরছেন। দেশে ফিরে তিনি আহত হন লেখকদের স্থূল প্রাগৈতিহাসিকতা দেখে, “এতটা রক্তপাত তাদের চরিত্রের কোনো মৌলিক পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি।” এই দুশ্চিন্তার প্রতিফলনও ঘটে তার লেখালেখিতে এবং তা দৈনিক গণকণ্ঠ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে। এই সময় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের পত্রিকায় লেখালেখির পাশাপাশি তিনি লেখক শিবিরের কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
১৯৭২ এর জানুয়ারি মাসে ছফার ডায়েরিতে ঘন ঘন স্থান পায় দৈনন্দিন প্রাত্যহিকতা। এর পর এক বছরের বেশি সময় চলে যায়, ৭৩ এর মার্চ মাসে আবার ডায়েরি লেখা শুরু। এবার যাপিত জীবনের ফিরিস্তির পাশাপাশি ছফা আয়নায় মুখ দেখা আরম্ভ করেন; তার আত্মানুসন্ধিৎসা, তার আপন হৃদয়ে দ্বায়িত্ব ও কামনার টানাপোড়েন কিংবা নানাবিধ ব্যক্তিগত ব্যর্থতায় আক্রান্ত হবার জটিল অসহায়ত্ব ফুটে ওঠে প্রত্যেক উচ্চারণে। ছফা সংশয় প্রকাশ করেন যে সকল মানুষদের ভালোবেসেছেন, আদর্শ মেনেছেন—রবীন্দ্রনাথ, রাসেল, গ্যোতে—তাদের মতো কখনো হতে পারবেন কিনা।
উচ্চাভিলাষ ছিল ছফার নানা গুণের ভেতর একটি। জীবনের মুখোমুখী সৎসাহসের সঙ্গে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন, তার কাছে আপোষকামিতা এবং মৃত্যু সমার্থক। ছফা মুক্ত বিহঙ্গের মতো হতে চেয়েছিলেন, এক বাধামুক্ত স্বাধীন কামনার সন্তান।
এই সময়ের লেখার ভেতর আমরা ছফাকে দুঃখের সহোদর আকারেও পেয়েছি কিছুটা। তার জবানে, “আমার জীবনটা দুঃখময়। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, এই দুঃখটাকেই আমি ভুলে থাকি।” মহত্বের সাধনায় বেদনার এক অশ্রুর মতো সুন্দর সাহচর্য পেয়েছিলেন আহমদ ছফা।
৬ই মার্চের ভুক্তিতে আমরা তার মানসপটে এক দ্বৈতসত্তার অনর্গল সংগ্রামের সংবাদ পাই—একদিকে সুপরিমিত যুক্তিবিচার এবং অন্যদিকে অপরিমিত আবেগসঞ্চার, এই দুই বিপরীতমুখী চুম্বকশক্তির মাঝে ছফা নিজেকে আবিষ্কার করেন। ছফা নিজের ভেতর খুঁজে পান “শিলাময় পর্বতের মতো জমাট বাঁধা” অহংকার, “যতগুলো মানুষ দেখেছি আমার চাইতে দুঃসাহসী, উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও জেদী কোনো মানুষ এ পর্যন্ত দেখিনি।”
মনের মধ্যে আকাশে মাথা তুলে দাঁড়াবার ঔদ্ধত্য—মহান লেখকদের এই গুণ তিনি আষ্টেপৃষ্ঠে ধারণ করতেন। সমসাময়িক মানুষদের ক্লেদজ তামসিকতা, তাদের চিন্তার অশ্লীলতা ছফাকে করে রেখেছিল এক বিষণ্ণ প্রকৃতির নির্জন মানুষ।
আহমদ ছফা নতুন বিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে নিজেকে নতুনভাবে জন্ম দিতে চান, চান আপন স্বভাবের ওপর সহজ কর্তৃত্ব। প্রথম সূর্যালোকের মতো আপন ইচ্ছার অধীন করে তুলবেন জীবনীশক্তিকে। একদিকে যেমন কোনো এক নির্জন দুপুরে ছফা আপন মনের গহীনে মহত্বের সমাবেশ দেখতে পান, পরক্ষণেই ভুলতে পারেন না যে “জেদি, একগুঁয়ে এবং প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী [একজন] মানুষ” তিনি। ছফার আত্মচিন্তার একটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে, “আমার সমস্ত শক্তি দিয়ে আমি লড়াই করতে চাই। লড়াই করে করে ক্লান্ত হয়ে হয়ে একেবারে ফুরিয়ে যেতে চাই। চারধারে যে বাঁধন অনুভব করছি। একেবারে ছিঁড়ে ফেলতে চাই।”
একজন তরুণ ভাবুক হিসেবে ক্ষুরের মতো তীক্ষ্ণ এই আত্মবিশ্বাসী আস্ফালন আমাকে আলোড়িত করে, তার আদর্শের শিহরণ আমি মজ্জায় মজ্জায় অনুভব করতে পারি। “কল্পনার তীক্ষ্ণতা এবং আবেগের ঘনত্ব দিয়ে আমি যদি ঘরও ঝাঁট দেই, আমার কথা মানুষের স্মরণ থাকবে,” এভাবে ভাবতে পারার ভেতর একটা নিহিত মাহাত্ম্য আছে, তা দুনিয়াকে স্রেফ আপন ইচ্ছাশক্তির দ্বারা বদলে দেবার ক্ষমতা বুকের ভেতর চেপে রাখার আত্মবিশ্বাস জোগায়।
১৯৭৩ এর মার্চের শেষে ছফা জানতে পারেন তার যক্ষা হয়েছে। এতে মনে মনে খুশিই হন তিনি, নিজের “সমস্ত গোপন পরিকল্পনাগুলো কাজের রূপ দেয়ার মতো এমন অখণ্ড সুযোগ” পেয়ে সম্পূর্ণ নতুন মানুষ হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা এবং গভীর অর্থে বেঁচে ওঠার তাগিদ আপন মর্মমূলে অনুভব করেন। এমন এক পর্যায়ে এসে দাঁড়ান যেখানে জীবন এবং মৃত্য দুটো থেকে একটাকে বেছে নিতে হচ্ছে তার, “এই বেছে নিতে গিয়ে নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করতে হচ্ছে।”
পরবর্তী দিনগুলোর ভুক্তি নিছক দৈনন্দিনতায় পরিপূর্ণ, এপ্রিলের মাঝামাঝি এসে ছফা পাথরের মতো কঠিন, ফুলের মতো কোমল হবার প্রার্থনা করে লেখা থামান। আগস্ট, সেপ্টেম্বর এবং পরের বছর তথা ১৯৭৪ এর এপ্রিল মিলিয়ে তিন বার ডায়েরিতে লেখেন, যেখানে তার মানসক্ষেত্রের কিছু নারীচরিত্রের উল্লেখ করেন, প্রেমে পড়ার শঙ্কা জাহির করেন।
প্রায় তিন বছরের বেশি সময় অতিক্রান্ত হলে আহমদ ছফা আবারো ডায়েরি লেখায় ফেরেন, কৈফিয়ত দেন, “এইবার গ্যয়টে জীবনী পাঠ করতে যেয়ে খুব গভীরভাবে অনুভব করছিলাম, আমারও কিছু কিছু অনুভূতি লিখে রাখা উচিত।” এবারের লেখনশৈলী, শব্দের কলকব্জার ব্যবহার এবং তাদের ভেতরকার ভঙ্গিমা জুড়ে আছে আত্মসচেতনার প্রগাঢ় প্রলেপ। এই নতুন ছফা জানেন তিনি অতিশয় বিরাট একটা মানুষ, অতীতের মহাপুরুষেরাই যার একান্ত আপন সুহৃদ।
যাদের আদর্শ মানতেন তাদের সাথে ছফার সম্পর্ক না বুঝলে ছফার ব্যক্তিগত সাধনা বোঝা সম্ভব না। ছফা বলতেন, একজন বড় মানুষ সহজেই আরেকজন বড় মানুষের প্রতি প্রণত হতে পারেন। নাটকের কুশীলব এবার রবীন্দ্রনাথ ও গ্যোতে।
গ্যোতের সাথে পরিচয়ের পূর্বে রবীন্দ্রনাথই ছিলেন ছফার “জীবনের মহত্তম মানুষ”, জীবনের সমস্ত রকম সমস্যা-সংকটে তিনি রবীন্দ্রনাথের রচনা থেকে অনুপ্রেরণা সঞ্চয় করতে চেষ্টা করেছেন। আরো বলেছেন ছফা, “হিমালয় পর্বতকে যদি আরো পাঁচ মাইল উচুঁও করে দেয়া হয়, আমার বিশ্বাস রবীন্দ্রনাথের উচ্চতা স্পর্শ করতে পারবে না।” কিংবা ‘একটি প্রবীণ বটের কাছে প্রার্থনা’ (১৯৭৭) কাব্যে লিখেছেন,
‘প্রবীণ বয়সী বট
তরুর সমাজে তুমি
অতিকায় জটাধারী
রবীন্দ্র ঠাকুর।’
ভারতবর্ষে গৌতম বুদ্ধের পরে রবীন্দ্রনাথকে ছফা সত্যিকারের একজন বড় মানুষ হিসেবে দেখতেন। গ্যোতের সাথে রবীন্দ্রনাথের তুলনা করতে গিয়ে ছফা বলেছেন, “গ্যোতের প্রতিভা যে পরিমাণে উল্লম্ব বা ভার্টিকাল তার পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথের প্রতিভাকে বলতে হবে হরাইজন্টাল বা বিস্তরমান।”
নব্বইয়ের দশক পেরিয়ে ছফার রবীন্দ্রভাবনায় পরিবর্তন আসে, “ব্রাত্য জাতহারা” থেকে রবীন্দ্রনাথ তার কাছে হয়ে ওঠেন “মহান সামন্ত”। রবীন্দ্রনাথের বাঙালি মুসলমান সমাজের প্রতি অন্ধত্ব বা অজ্ঞতা, তার ভেতরকার আপোষকামিতা বা “গিল্টি”, তার সাহিত্যকর্মে ঔপনিবেশিক চিন্তাচেতনার ছাপ ইত্যাদি দিকগুলি ছফাকে ভাবাতে আরম্ভ করে। বিভিন্ন শ্রুতিলেখকের ভাষ্যে মুসলিম সমাজ বা ইসলাম সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথের যে ভাবমূর্তি ফুটে ওঠে তা বেশ সুবিধাজনক নয়। ছফার প্রশ্ন—মুসলমান চাষা সম্প্রদায়ের জমিদার রবীন্দ্রনাথ কেন তাদেরকে নিয়ে লেখেননি। রবীন্দ্রনাথের উত্তর, “মুসলমান সমাজ সম্পর্কে বিশেষ কিছু আমি জানি না।” হিমালয় থেকে বৃহত্তর এই মুনি কেন অজ্ঞতাকে অলঙ্কাররূপে পরিধান করবেন? আহমদ ছফা এখানে চুরির ওপর সিনাজুরি ধরতে পেরেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের মতো অনুসন্ধিৎসু, আগ্রহী এবং অনুবেদনাশীল ধনাঢ্য ব্যক্তির পক্ষে এই অজ্ঞানতার অতিক্রমণ অসম্ভব ছিল না।
আহমদ ছফা শেষমেশ রবীন্দ্রনাথের কাছে স্বীকার করলেন, “আপনাকে আমি পুরোপুরি আমার আপন করতে চাই, কিন্তু পারি না।” তবুও আত্মবিচারে নিজেকে রবীন্দ্রনাথের ঘরানার মানুষই মনে করেছিলেন ছফা, নিজেকে “বটের শিশু” ভেবেছেন, বলেছেন, “প্রায় রবীন্দ্রনাথ জাতীয় একজন মানুষ আমি।… কতো নিচু থেকে উঠে এসে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে পাল্লা দেবার দুঃসাহস পোষণ করছি।”
১৯৮২ এর জুন মাসে এসে সব একেবারে মজে ওঠে, এই এক মাস টানা ছফা ডায়েরি লেখেন। ছফার যত জিজ্ঞাসা, যত অন্বেষা, মননের যত দ্বিধাবিভক্তি তার সবচেয়ে পরিপক্ব রূপান্তর আমরা দেখতে পাই এই অংশে। ছফা তারই নিজস্ব এক কালখণ্ডের মানুষ—অনেকের মতে, ছফার সময় এখনো আসে নাই।
১৯৭৫ সনে আহমদ ছফা জার্মান মহাত্মা এয়ুহান বোলফগাং ভন গ্যোতের ‘ফাউস্ট’ কাব্যনাটক বাংলায় তর্জমা শুরু করেন, ফাউস্ট তথা গ্যোতের সঙ্গে প্রথম পরিচয় পুরান ঢাকার একটা গলিতে বন্ধু অরুণেন্দু বিকাশ দেবের বাড়িতে থাকা ছেঁড়াখোঁড়া বইয়ের স্তূপে মলাটবিহীন কীটদষ্ট জীর্ণদশায় ১৯৬৪ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়। ছফার জীবনে গ্যোতের প্রভাব প্রকট হয়, “এক ফাঁকে দেখি গ্যোতে আবার আমাকে পেয়ে বসেছেন। কখনও প্রণয়িনীদের কাছে লেখা চিঠি, কখনও আত্মজীবনী, কখনও বৈজ্ঞানিক গবেষণা, কখনও ঝর্না ধারার মত উচ্ছিচ্ছ্র অজস্র গীতিকবিতা আমাকে এই মহাপুরুষের প্রতি নিবিষ্ট করে তুলেছে।” দশ বছরের সাধনার পর ফাউস্টের প্রথম খণ্ডের অনুবাদ ছাপা হয় ১৯৮৬ সনে।
ফাউস্টের দ্বিতীয় খণ্ড আর আহমদ ছফা অনুবাদ করেন নাই—কৈফিয়ত দেন, “আমি পৃথিবীতে গ্যোতের অনুবাদক পরিচয়ে অমর হতে চাই না।” ছফা নিজেকে গ্যোতের অনুবাদক পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন না, “ফাউস্ট নিয়ে কাটাতে গিয়ে গ্যোতের কবিত্ব কল্পনার ঢেউ ভাষার সীমানা অতিক্রম করে যতদূর আমার মনে অভিনব ব্যঞ্জনায় ব্যঞ্জিত হয়েছে, সেই বেজে ওঠাটুকু মাতৃভাষার মাধ্যমে প্রকাশ করেছি মাত্র।” ছফা নিজেকে গ্যোতের মতন প্রতিভাবান ভাবতেন, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন বাঙালি মুসলমান সমাজের ভেতরে থেকে একটি মনীষী পুরুষ তাকে দিয়ে জন্ম দেয়া সম্ভব হবে। অন্তরের মহৎ আকাঙ্ক্ষার দ্বারা তাড়িত না হলে কেউ গ্যোতে অনুবাদ করতে আসে না, ছফা নিজেই বলছেন ফাউস্টের ভূমিকায়।
‘ছফা কেন গ্যোতের দিকে আকৃষ্ট হলেন’ সেদিকে আমাদের দৃষ্টি ফেরাচ্ছেন ছফার শিষ্য সলিমুল্লাহ খান (খান ২০০৫), “১৯৬০ সনের দশকে যাঁরা ঢাকায় সাহিত্য করতে এসেছিলেন, গ্যেটে তাঁদেরও ‘আইডল’ ছিলেন না। এ কথা মনে রাখলে আমার প্রশ্নের পটভূমি ফরসা হয়।” উত্তর দিয়েছেন নিজেই, “আহমদ ছফা এসেছিলেন বাংলাদেশের গ্রামসমাজ থেকে। কৃষকজাতির ভেতর তিনি জন্মেছিলেন। নবগঠিত শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণির সাহিত্যকর্মী ও বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির গভীর অমিল” গ্যোতের সাথে তার আত্মার মিলনের পথ তৈরি করে দিয়েছিল।
“ইতিহাসের একেকটি বিশেষ সময়ে একেকজন মানুষ জন্মান, যাঁর চিন্তায় ব্রহ্মাণ্ডের কম্পন অনুরণিত হয়, যাঁর সৃষ্টিশীলতায় মহাবিশ্বের অদৃশ্য শোণিত সহস্রধারায় উচ্ছ্রিত হয়”—কথাটি ছফা রবীন্দ্রনাথের জন্য বলেছিলেন, আমরা এটা ছফার ঘাড়েও চাপাতে পারি। ছফার চিন্তায় কি সাধনায় যে ইতিহাসের ধারণা কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে সেটার প্রতিফলন ১৯৮২ সালে তার ডায়েরিতে ঘটতে শুরু করে।
ইতিহাসের মর্মবস্তুকে আপন স্বরূপে চিনে নেওয়ার অসাধারণ সহজাত ক্ষমতা ছিল ছফার। তিনি বুঝতে পারতেন তার ভেতর ইতিহাসের বেদনা সঞ্চারিত হয়েছে, একটা ঐতিহাসিক শক্তির মাধ্যম হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন। এই কাজগুলো সঠিক খাতে প্রবাহিত হলে দেশে “একটা নবযুগের সূচনা হবে।” বাংলার অবরুদ্ধ ইতিহাসের বীর্য আপন ঔরসে ধারণ করেছিলেন আহমদ ছফা, অন্তঃসত্ত্বাকেই প্রসববেদনা সইতে হয়। ইতিহাসের ধারণাই মানুষকে ঐতিহাসিক কর্মসাধনে প্রাণিত করে, ব্যক্তিত্ব কিংবা বীরের আলাদা কোনো মূল্য নেই। ফরাসি ইতিহাসব্যবসায়ী ফের্নো ব্রোদেল বলতেন, ইতিহাসের জোয়ারের দৃঢ় পিঠে ঐতিহাসিক ঘটনাবলি মামুলি ফেনার মতো।
আহমদ ছফার আত্মসাধনার দর্শন দাঁড়ায়: নিজের আকাঙ্ক্ষা অনুসারে পৃথিবীকে পাল্টাতে হলে নিজের ওপর অগাধ এবং অপরিমেয় নিয়ন্ত্রণ অর্জন করতে হবে। আহমদ ছফার স্বপ্ন ছিল স্থিত হওয়া, “মাটিতে শেকড় প্রসার করে আকাশে মাথা তোলা।” এভাবেই ছফা তার দশ বছরের ডায়েরি লেখার ইতি টানেন।
ছফার ডায়েরি আমাদের সামনে আত্মনিয়ন্ত্রণের একটা গভীর পাঠ হাজির করে, সংজ্ঞাকে সাধনার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার শিক্ষা দেয়। শেষ বিচারে আহমদ ছফা একজন কবিই বটেন, স্বপ্ন দেখতে ও দেখাতে পারার এক অভিনব কৌশল তিনি রপ্ত করেছিলেন। তার একেকটি রচনা আমাদের একই সাথে কর্মঠ এবং স্বাপ্নিক হতে উদ্বুদ্ধ করে—মহত্বের চিহ্ন এই নয় তো কি?
দোহাই:
১. আহমদ ছফা, ‘ফাউস্ট,’ আহমদ ছফা রচনাবলি, খণ্ড ২ (ঢাকা: খান ব্রাদার্স, ২০০৮), পৃ. ৪২৬।
২. _________, আহমদ ছফার ডায়েরি, Nurul Anwar সম্পাদিত (ঢাকা: খান ব্রাদার্স, ২০০৪)।
৩. _________, গ্যোতে ও রবীন্দ্রনাথ, জীবিত থাকলে রবীন্দ্রনাথকেই জিজ্ঞেস করতাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জার্মানি, ‘গরিবের রবীন্দ্রনাথ’, সলিমুল্লাহ খান সম্পাদিত (ঢাকা: মধুপোক ২০১৭)।
৪. _________, গ্যোতে: প্রাচ্য প্রতীচ্যের প্রেক্ষিতে, গ্যোতে: জনৈক বাঙালির দৃষ্টিতে, ‘নির্বাচিত অরাজনৈতিক প্রবন্ধ’ (খান ব্রাদার্স ২০১১), পৃ. ১৭৯-১৮৭।
৫, সলিমুল্লাহ খান, ‘আহমদ ছফার ব্রত’ https://www.ntvbd.com/…/%E0%A6%86%E0%A6%B9%E0%A6%AE%E0…
৬. __________, মহাত্মা আহমদ ছফা, সাপ্তাহিক দেশবাংলা, ২০০৫, ‘আহমদ ছফা সঞ্জীবনী’ (আগামী প্রকাশনী, ২০১০), পৃ. ৩২।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।