দোদুল্যমান জাতীয়তা: আত্মপরিচয়ের সংকট

ভূমিকা: সলিমুল্লাহ খান

মহাত্মা আহমদ ছফা বাংলাদেশের জাতীয় সমাজ ও রাষ্ট্র বিষয়ে অনেক চিন্তা করিয়াছেন। সেই চিন্তার প্রকাশ শুদ্ধমাত্র তাঁহার প্রবন্ধে বা নিবন্ধে নহে, গল্পে এবং উপন্যাসেও ঘটিয়াছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রনীতি বিষয়ে আহমদ ছফার বক্তব্য কখনও অস্পষ্ট ছিল না। তিনি সমাজ ও রাষ্ট্র উভয় পরিসরেই ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয় পরিচয়ে আস্থা রাখিতেন। এই বিষয়ে এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত আলোচনা বা গবেষণা হয় নাই। এই প্রবন্ধ আমাদের তরুণজাতিকে এই কর্তব্য পালনে উদ্বুদ্ধই করিবে বলিয়া বিশ্বাস করি। বিশেষ অসীম সাহা জাতীয় যাঁহারা আমাদিগকে—এমনকি আহমদ ছফাকে পর্যন্ত—‘মুসলিম মৌলবাদী’ বলিতে কুণ্ঠিত নহেন তাঁহারা নিবন্ধটি পড়িলে উপকার পাইবেন।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হইয়াছিল ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয় পরিচয় ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রনীতির অঙ্গীকার করিয়া। কিন্তু ১৯৭৫ সালের রাষ্ট্রবিপ্লবের পর এই নীতিতে চিড় ধরে। রাষ্ট্রনীতিতে ধর্মের প্রত্যাবর্তন শুরু হয়। বাংলাদেশের শাসকশ্রেণীর কৌশলে যে পরিবর্তন দেখা দেয় আহমদ ছফা তাহার কড়া সমালোচনা কখনো বন্ধ করেন নাই। নিচে মুদ্রিত যে প্রবন্ধটি আমরা সংগ্রহ করিয়াছি তাহা প্রথম প্রকাশিত হইয়াছিল ১৯৮৮ সালের ২২-২৮ জুলাই সংখ্যা সাপ্তাহিক ‘উত্তরণ’ পত্রিকায়। এই পত্রিকার প্রধান সম্পাদক ছিলেন আহমদ ছফা নিজে। বলা নিষ্প্রয়োজন নহে, এই লেখাটি এখন পর্যন্ত আহমদ ছফার কোন গ্রন্থে বা রচনাবলিতে স্থান পায় নাই।
লেখাটি পত্রিকায় প্রকাশের সময় তিনি ‘আনন্দ’ ছদ্মনাম ব্যবহার করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন। এই নামে তিনি আরো লিখিয়াছেন। একসময় তিনি দৈনিক গণকণ্ঠ পত্রিকায়ও ‘আনন্দ’ নামে কলাম লিখিতেন। এই লেখার প্রকৃত লেখক যে আহমদ ছফা তাহা আমরা নির্ণয় করিয়াছি দুই ধরণের প্রমাণের ভিত্তিতে। আহমদ ছফার মুদ্রা ও বাক্য দেখিয়া বলা যায় ইহা তাঁহার রচনা। উত্তরণ পত্রিকার অন্যতম সহযোগী সম্পাদক মহাত্মা দিলওয়ার হোসেনের সাক্ষ্য হইতেও আমরা এই সত্যে নিঃসন্দেহ হইয়াছি। আমাদের সৌভাগ্য, তিনি আজও বাঁচিয়া রহিয়াছেন।
এই লেখাটি ছাড়াও আহমদ ছফার আরও অনেকগুলি আনকোরা লেখা আমাদের যোগাড় করিয়া দিয়াছেন উত্তরণের এককালীন সম্পাদক কাজী আকরাম হোসেনের সহধর্মিনী মহিয়সী বেগম সায়মা জাহান পাপড়ি। তাঁহাকে এবং মহাত্মা দিলওয়ার হোসেনকে কৃতজ্ঞতা জানাই।
—সলিমুল্লাহ খান
২৪ জুন ২০১৪

আমাদের জাতির আত্মপরিচয়ের সংকট ১৯৭১ সালের যুদ্ধের পরেও কাটেনি। বরং যতই দিন যাচ্ছে মনে হচ্ছে এই সংকট ক্রমশ জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। ১৯৭১ সালে এই জাতি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একটা বিশেষ দাবির ভিত্তিতে যুদ্ধ করেছিল। আর সে দাবিটি ছিল পাকিস্তানের ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে আমাদের জাতীয় সমস্যা-সংকটের কোন নিরাময় নেই। মুখ্যত এই দাবির ভিত্তিতে বাংলাদেশের জনগণ বাঙ্গালি জাতির ইতিহাসে স্মরণকালের মধ্যে সর্বাধিক ব্যাপক জনযুদ্ধটিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।

সকলে মনে করেছিলেন এ জাতির আত্মপরিচয়ের সংকটমোচন হয়ে গেল। ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোর বদলে একটা জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রকাঠামোর ভিত নির্মাণ করার মত বস্তুগত ভিত্তি, গণভিত্তি এবং দার্শনিক ভিত্তি এই প্রচ- সংগ্রামের মাধ্যমে বাঙ্গালি জাতি তৈরি করতে পেরেছে। আসলে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ছিল ভারত উপমহাদেশ, মুসলিম বিশ্ব এবং তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহের জন্য একটি অনন্য দৃষ্টান্তস্বরূপ। ভারত উপমহাদেশে বাংলাদেশের জন্ম একারণে একটি অনন্য ঘটনা যে বাংলাদেশই এই উপমহাদেশে সংগ্রামের মাধ্যমে একটি ভাষাভিত্তিক জাতীয় রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে। ভারত উপমহাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তার গুরুত্ব অপরিসীম। এই মুসলিম সংখ্যাধিক ভূখ-টিতে ধর্মতান্ত্রিকতার পথ পরিহার করে একটি ভাষাভিত্তিক জাতীয় রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা অভাবিতপূর্ব ঘটনা।

সাধারণ বিচারে দুনিয়ার মুসলিম দেশগুলোর হিসাব নিলে দেখা যাবে, স্বৈরতন্ত্র, রাজতন্ত্র, ধর্মতন্ত্র, সমরতন্ত্র ইত্যাদি মধ্যযুগীয় রাষ্ট্রের আদর্শ সে সকল দেশে এখনও যথেষ্ট রকমের শক্তিশালী এবং ক্রিয়াশীল। বাংলাদেশ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বিজয় অর্জন করে পৃথিবীর মুসলিম দেশগুলোর সামনে একটা অনন্য দৃষ্টান্ত হাজির করে ফেলেছিল। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর সামনে বাংলাদেশের উদ্ভব একারণে গুরুত্ব বহন করে যে একটি অঞ্চলের জনগোষ্ঠী তাদের ভাষা, সংস্কৃতি এবং জাতীয় দাবির ভিত্তিতে লড়াই করে একটা নতুন পরিচয় যে তুলে ধরতে পারে বাংলাদেশ তার নজির হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমরা সবাই জানি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর যে জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রকাঠামোটি তৈরি হয় এবং জাতীয়তাবাদের যে বোধটি রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়ামক শক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয় বলতে গেলে তা কোন প্রতিশ্রুতিই পালন করতে পারেনি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিব সরকারের পতন হল, শেখ মুজিব আততায়ীদের হাতে সপরিবারে নিহত হলেন। তারপরে ১৯৭৫ থেকে ১৯৮৮ সাল এই দশ-এগার বছরের মধ্যে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদর্শনের মধ্যে কিন্তু অনেক সুচিন্তিত পরিবর্তন ঘটে গেছে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাঙ্গালির বদলে ‘বাংলাদেশী’ শব্দটি চালু করলেন। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় উঠলে তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন যে বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদ শব্দটিতে আদিবাসী এবং উপজাতীয়দের অধিকার স্বীকার করে নেয়া হয়নি বলে জাতীয় সংহতির স্বার্থে তিনি বাঙ্গালির বদলে ‘বাংলাদেশী’ শব্দটি চালু করছেন।
১৯৮৬ সালে এসে প্রেসিডেন্ট এরশাদ জাতীয় সংসদে বিল পাশ করিয়ে ঘোষণা করলেন যে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ধর্ম ইসলাম এবং কারণ ব্যাখ্যা করে বললেন, এই ভূখ-ে শতকরা ৮৫ জন মানুষ মুসলমান সুতরাং তাদের দৈনন্দিন আচরিত ধর্মেরই রাষ্ট্রীয় ধর্ম হওয়া উচিত। ইসলামকে রাষ্ট্রীয় ধর্ম করে ইসলামের কতটুকু লাভ হল এবং বাংলাদেশের কতটুকু শ্রীবৃদ্ধি ঘটল প্রেসিডেন্ট এরশাদই বলতে পারবেন ভাল।

বাংলাদেশ একসময়ে ধর্মীয় রাষ্ট্র পাকিস্তানের একটা অংশই ছিল। ইসলাম যদি সমস্ত সমস্যা সমাধানের গ্যারান্টি দিতে পারে তাহলে তো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধটি করার কোন প্রয়োজন ছিল না। মুক্তিযুদ্ধটিকেও নানা মহল নানাভাবে ব্যাখ্যা করতে চাইছেন। কেউ কেউ বলছেন লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পাকিস্তান হয়েছিল এবং পাকিস্তান হয়েছিল বলে আজকের বাংলাদেশটি জন্মাতে পেরেছে। এই ভদ্রলোকদের যুক্তির ধরণটি অনেকটা এই ধরনের—লাহোর প্রস্তাব পাশ হওয়াই বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের জন্য যথেষ্ট ছিল। তাহলে মুক্তিযুদ্ধটি ঘটল কেন? খান খান করে ৩০ লাখ বাঙ্গালি প্রাণ দিল কেন? এই প্রশ্নের সদুত্তর কি হতে পারে!

একটা মানুষের শরীরে কার্বন, সালফার, আয়রন ইত্যাদি নানা উপাদান পাওয়া যায়। [কোন] মানুষকে হত্যা করে বৈজ্ঞানিক উপায়ে এই সমস্ত রাসায়নিক পদার্থ বিশ্লিষ্ট করে কোন দোকানে বেচে দিলে ৫-৭ হাজার টাকা নগদ দাম পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু ঐ নগদ ৫-৭ হাজার টাকার সঙ্গে একটা জীবন্ত সামাজিক মানুষের কি কোন তুলনা চলতে পারে? আজকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রসত্তার স্বরূপ নিয়ে যে বিতর্ক জমে উঠেছে তাও অনেকটা সেরকম। অনেকে বলছেন এদেশে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। তাই তাদের ধর্মই রাষ্ট্রীয় ধর্ম হবে। মৌলবাদী সংগঠনসমূহের বক্তব্য—যেহেতু এদেশের শতকরা [নব্বই জন] তৌহিদপন্থী মুসলমান তাই এখানে ইসলামী শাসন কায়েম করতে হবে। কোন কোন বামপন্থী সংগঠন জোরেশোরে না হলেও বলতে চেষ্টা করেন—জাতীয়তাবাদ একটা বোগাস শব্দ—এতে শ্রমিক শ্রেণীর মুক্তির কোন দিকনির্দেশনা নেই।

উপজাতীয় সম্প্রদায়গুলো বলতে আরম্ভ করেছে বর্তমান রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে তাদের মানমর্যাদা নিয়ে উপজাতীয় সত্তা অক্ষুণ্ন রেখে বেঁচে থাকার কোন নিশ্চয়তা নেই। তাই তাদের আলাদা রাষ্ট্র প্রয়োজন। সে জন্য তারা আপন হাতে বন্দুক তুলে নিয়েছে। দিনে দিনে অবস্থা যে রকম দাঁড়াচ্ছে—একদিন হিন্দু, বৌদ্ধ এবং খ্রিস্টান সম্প্রদায় ঘোষণা করে বসতে পারে, ‘আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ কর্তৃক লাঞ্ছিত এবং নির্যাতিত হচ্ছি। আমাদের ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক অধিকার পদদলিত এবং লাঞ্ছিত হচ্ছে। আমরা যাতে আমাদের অধিকারসমূহের নির্বাধ চর্চা করতে পারি সে জন্য আমাদের ২-৩টি জেলা আলাদা করে দেয়া হউক।’ পরিস্থিতি যেভাবে দ্রুত আবর্তিত এবং পরিবর্তিত হচ্ছে [তাতে] একদিন এই দাবি উঠবে। মুসলমানদের দাবির মধ্যে, হিন্দুর দাবির মধ্যে, উপজাতীয় অধিবাসীর দাবির মধ্যে এবং বামপন্থীদের দাবির মধ্যে কমবেশি কিছু পরিমাণ সত্য নিহিত আছে। সবগুলো দাবি যদি একসঙ্গে সোচ্চার হয়ে ওঠে—একটা আর একটার বিরুদ্ধে দ্বন্দ্বসংঘাতে লিপ্ত হয়—এই দেশটি টিকে থাকবে কোন ভিত্তির উপর?

হারমোনিয়ামের রিড থেকে নির্গত শুদ্ধকোমল মিলিয়ে ১২টি সুর যেমন শ্রুতিসুখকর মুর্ছনা সৃষ্টি করে তেমনি আমাদের জাতীয় নানা ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক বৈপরীত্যও একটি মহাজাতিতে সঙ্গত ধারার মধ্যে বিলীন হয়ে একটি নতুন জাতীয়তাবোধের সৃষ্টি করতে পারত। ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তার সম্ভাবনাগুলো অঙ্কুরিত হয়েছিল কিন্তু তা কোন পরিণতিতে পৌঁছাতে পারেনি। তাই আমাদের আত্মপরিচয়ের সংকট এখনও কাটেনি। বরং দিন দিন তা গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। বিভেদকামী শক্তিগুলি অন্তরালে কাজ করে যাচ্ছে। যে কোন জিনিসের হ্যাঁ বা না দুটি দিকই আছে। উল্টাদিক থেকে শুরু করলে যে কোন বিষয়ের উল্টা সিদ্ধান্তেই পৌঁছাতে হয়। যদি বলি আমরা বাঙ্গালি তখন কেউ বাগড়া দিয়ে বসতে পারেন সীমান্তের অপর পারেও বাঙ্গালি রয়েছে। তাদের সঙ্গে আমরা এক হতে যাব কেন? যেহেতু তুমি এ কথা বলছ নিশ্চয়ই তোমার মনে কোন মতলব রয়েছে।

যদি বলি আমরা মুসলমান তখন কথা উঠবে সমস্ত দুনিয়াজোড়া মুসলমান রয়েছে। সমস্ত মুসলমানের স্বার্থ আর আমাদের স্বার্থ এক। কথাটা যুক্তির খাতিরে না হয় সত্য বলে ধরে নিলাম। তারপরও কিন্তু কথা উঠবে তাহলে আমরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াই করে ৩০ লক্ষ জান কোরবাণী দিয়ে বাংলাদেশটি করলাম কেন? মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে যতই অপপ্রচার করা হোক না কেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ একটা বিষয়ের পুরাপুরি ফয়সালা করে ফেলেছে। কথাটি একটু বিশদভাবে বুঝিয়ে বলার অপেক্ষা রাখে।

১৯৭১ সালের আগে ভারতবর্ষের মুসলমানরা বেশির ভাগ মনে মনে বিশ্বাস করতেন [ভারতবর্ষ] সংখ্যাধিক হিন্দুর দেশ। ভারতবর্ষে যদি তারা টিকে থাকতে অক্ষম হন তাহলে পাকিস্তানে হিজরত করবেন। পাকিস্তানটি ভেঙ্গে যাওয়ার পর তাদেরকে সে মনোভাব পুরাপুরি পাল্টাতে হয়েছে। ভারতীয় মুসলমানদের আপন ভূখ-ে গ্রহণ করা দূরে থাকুক পাকিস্তানী নাগরিক বিহারি মুসলমানদেরও গ্রহণ করতে চাইছে না পাকিস্তান। সুতরাং ধর্মের নিরিখে কোন কিছু করতে গেলে তার ফলটা উল্টা ফলার সম্ভাবনাই অধিক। তথাকথিত জাতীয়তাবাদের ধ্বজাধারী অনেক রাজনৈতিক দল এবং ব্যক্তি অভিযোগ করে থাকেন যে সা¤্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্র, মৌলবাদী তৎপরতা এবং বিদেশি হস্তক্ষেপের কারণেই বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদী শক্তির পরাজয় ঘটেছে। এই অভিযোগের মধ্যে কিছু পরিমাণ সত্য আছে কিন্তু যথেষ্ট পরিমাণ নেই।

এই তথাকথিত জাতীয়তাবাদীরা নিজেদেরই জাতীয়তাবাদের একমাত্র শক্তি বলে মনে করেছেন। তারা ছাড়া অন্যরাও এই দেশ এই জাতিকে ভালবাসতে পারে সেটা স্বপ্নেও চিন্তা করতে পারেননি তারা। দলীয় এবং গোষ্ঠীগত স্বার্থ অক্ষুণœ রাখার উদ্দেশ্যে অন্য সবাইকে বাইরে ঠেলে দিয়েছেন তারা। তার নগদ ফল এমনই দাঁড়িয়েছে যে নিজেরা যখন পরাজিত হলেন তখন জাতীয়তাবাদের বোধটিও বিপর্যস্ত অবস্থার মধ্যে পড়ে গেল। জাতীয়তাবাদকে যাদের লালন এবং বিকশিত করার কথা—উন্মুক্ত এবং প্রসারিত করার কথা—তারা জাতীয়তাবাদকে নিজেদের [দলীয়] সম্পদ মনে করে কুক্ষিগত করে রাখলে। জাতীয়তাবাদ শিকড় ছড়িয়ে ডালেমূলে পত্রপল্লবে বিকশিত হতে পারল না। সব ধর্মের সব বর্ণের সব শ্রেণীর জনগণকে কোল দিয়ে নিজের মধ্যে ধারণ করতে পারল না। আমাদের জাতির নানা উপাদান মিলেমিশে একটি নির্দিষ্ট রূপ পরিগ্রহ করতে পারল না। যুদ্ধে জয়লাভ করেও আমাদের সবচাইতে বড় নৈতিক পরাজয় ঘটে গেল।

বিভেদকামী শক্তিগুলো ভেতর থেকে প্রবল হয়ে আমাদের জাতীয়তাবাদের আধারটি ফাটিয়ে ফেলতে উদ্ধত হয়েছে। তারা এর উৎসটি অস্বীকার করতে চাইছেন। সেখানেই আমাদের জাতীয় জীবনের নানা বিপত্তির মূল। এই জাতীয়তার প্রশ্নটি স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত আমাদের রাজনৈতিক সংকট ক্রমাগত ঘনীভূত হবে। জাতি কোন একটা দিকে চলার মত গতি সঞ্চয় করতে পারবে না। আজকে বাংলাদেশের যে রাজনৈতিক সংকট—যা এই জনপদের জনজীবনকে এরকম অনিশ্চিত এবং হতাশার মধ্যে ছুঁড়ে দিয়েছে, জনজীবনকে হতশ্রী এবং হতাশায় গড়িয়ে তুলেছে, নৈতিক অবক্ষয় বাঁধভাঙ্গা প্লাবনের মত মানব চরিত্রের অম্লান মহিমাকে ভাসিয়ে নিয়েছে, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে একটা দুর্দান্ত নৈরাজ্যের সৃষ্টি করেছে—আত্মপরিচয়ের সংকটের মধ্যে তার সবগুলো পরিচয় নিহিত।

আমরা কারা? আমরা হিন্দু কি মুসলমান, উপজাতি কি আদিবাসী, আমাদের একটা সম্মিলিত পরিচয়ের প্রয়োজন। আমরা কি বাঙ্গালি না বাংলাদেশী? আমাদের জাতির এই যে নতুন পরিচয় তার উৎসস্থল কি? ভারত উপমহাদেশে জাতীয় ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্র বাংলাদেশের অভ্যুদয় একটি অনন্য ঘটনা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সে ঘটনাটিকে সম্ভাবিত করেছে।

 

আহমদ ছফা বিদ্যালয়, প্রথম বর্ষ প্রথম সংখ্যা, আষাঢ় ১৪২১ ।। জুন-জুলাই ২০১৪

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*