বাঙ্গালি মুসলমানের মন (মূল পাঠ ১৯৭৬) — ২

এই ধরনের দোভাষী পুঁথিসমূহের বিষয়বস্তুর প্রতি দৃষ্টিপাত করলে কতিপয় বৈশিষ্ট্য পাঠকের চোখে পড়বেই। সেগুলোর মধ্যে অত্যন্ত প্রণিধানযোগ্য কয়েকটি হল: প্রথমত ধর্মের মাহাত্ম্য বর্ণনা করার জন্যই এই সকল কাহিনী লেখকরা বিবৃতি [প্রচার] করতে প্রবৃত্ত হয়েছেন। নায়কের অসাধারণ শৌর্যবীর্য এবং অসমসাহসী ক্রিয়াকলাপের অন্তরালে সত্যধর্মের বিজয়ই স্ফূরিত হচ্ছে। এটা স্বদেশবাসীর কাছে স্বদেশি ভাষায় প্রকাশ করাই বেশির ভাগ লেখকের মনোগত অভিপ্রায়। মহাভারতের বাংলা অনুবাদক যেমন বলেছেন:

মহাভারতের কথা অমৃত সমান।
কাশীরাম দাস কহে শুনে পুণ্যবান!

তার অনুকরণ করে পুঁথিলেখকও পাঠক এবং শ্রোতাদের কাছে লোভনীয় আবেদন রেখেছেন। একটা দৃষ্টান্ত:

অধীন ফকির কহে কেতাবের বাত
যেবা শুনে বাড়ে তার বারেক হায়াত।

এ জাতীয় হৃদয়মনে উচ্চাকাক্সক্ষা সৃষ্টিকারী আশাব্যঞ্জক পংক্তিমালা পুঁথিগুলোর পৃষ্ঠায় [পৃষ্ঠায়] ছড়িয়ে রয়েছে। সুতরাং বিশ্বাস করতে দ্বিধা থাকা উচিত নয় যে মানুষের মনে ধর্মবোধ জাগ্রত করা এবং—ইসলাম ধর্মাশ্রিত মানুষের হাতে যে সাংসারিক সম্পদ, সুন্দরী নারী আপনা আপনি এসে পড়ে এবং পরকালে অনন্ত সুখভোগের লীলাস্থল বেহেশত তো তাদের জন্য অবধারিত, আর শত্রুদের উপর তাঁদের বিজয় অর্জন সে তো একরকম স্বাভাবিকই—এই সকল বিষয় প্রমাণ করাই ছিল পুঁথিলেখকদের অধিকাংশের মনের প্রাথমিক অভিপ্রায়।

দ্বিতীয়ত এই পুঁথিসমূহের প্রতি তীক্ষ্ন বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টি ফেললে একটা জিনিস বারবার চোখে পড়তে থাকে। যে সময়ে ওগুলো রচিত হয়েছিল সে সময়কার মুখ্যগৌণ, বিবদমান, বর্ধিষ্ণু-ক্ষয়িষ্ণু যে সকল সামাজিক ধারা, [সেই] ধারাসমূহের মধ্যবর্তী দ্বন্দ্ব-সংঘাত—কোথাও প্রচ্ছন্নভাবে আবার কোথাও সুস্পষ্টভাবে—পুঁথিসাহিত্যে ছাপ ফেলেছে। পুরানা সমাজের গর্ভ থেকে তুর্কি আক্রমণের ফলে আরেকটি নতুন সমাজ জন্মলাভ করেছে এবং সমাজের জনগণের একাংশের মধ্যে নতুন চলমানতার সঞ্চার হয়েছে। সেই নতুনভাবে চলমানতা অর্জনকারী জনগোষ্ঠীর মধ্যে নতুন আকাক্সক্ষার পরিতৃপ্তি বিকাশ করার উদ্দেশ্যেই পুঁথিলেখকেরা রচনায় মনোনিবেশ করেছেন। তার ফলে তাদের মনেও নতুন এক ধরনের জনপ্রিয় বীরশ্রেণী জন্মলাভ করতে আরম্ভ করে। পুরানা সমাজের যে সকল নায়ক খলনায়ক—রামচন্দ্র, লক্ষ্মণ, সীতা, রাবণ, ভীম, অর্জুন, হনুমান, কর্ণ, ভীষ্ম, দ্রোণ, শ্রীকৃষ্ণ, রাধিকা, দ্রৌপদী ইত্যাদির—কাহিনীতে ধর্মীয় এবং সামাজিক কারণে মুসলমান সমাজ মনোনিবেশ করতে রাজি ছিল না।

এই নতুন সমাজের নিজস্ব নায়ক চাই, চাই নিজস্ব বীর যাঁদের জীবনকথা আলোচনা করে দুঃখে সান্ত্বনা, বিপদে ভরসা পাওয়া যায়, যাঁরা তাদের আপনজন হবেন এবং একটি আদর্শায়িত উন্নত জীবনের বোধ সৃষ্টি করতে পারবেন। এই সকল কারণের দরুন হজরত মোহাম্মদ, হজরত আলী, বিবি ফাতেমা, হাসান, হোসেন, বীর হানিফা, আমির হামজা, হাতেম তাই, রুস্তম ইত্যাদি চরিত্র বাংলা সাহিত্যে নবজন্ম লাভ করে। তাঁদের জন্মপ্রক্রিয়ার মধ্যে দুটি মুখ্য বিষয় মিলমিশ খেয়েছে। এই ঐতিহাসিক মহামানবদের যে সকল কীর্তিকাহিনী লোকশ্রুতি বা জনশ্রুতি আকারে তাঁদের কাছে এসে পৌঁছেছে (পুঁথিলেখকদের অধিকাংশই আরবি-ফারসি ভাষা জানতেন না এবং ইসলামি শাস্ত্রে পারদর্শী ছিলেন না) তার সঙ্গে মহামানব এবং সামাজিক নায়কদের সম্পর্কে প্রচলিত যে ধারণা তৎকালীন সমাজে বলবৎ ছিল তার সংশ্লেষ ঘটেছে।

তাই ইসলামের ইতিহাসের দিকপালদের নিয়ে রচিত পুঁথিসাহিত্যে যেমন চরিত্রের ঐতিহাসিকতা পাওয়া যাবে না তেমনি বাঙ্গালি সমাজে প্রচলিত বীরদের সম্বন্ধে যে ছকবাঁধা ধারণা বর্তমান ছিল তাও পুরাপুরি উঠে আসেনি। দুটি মিলে একটি তৃতীয় বস্তুর সৃষ্টি হয়েছে। আসলে পুঁথিসাহিত্য হল দুটি পাশাপাশি সমাজব্যবস্থা এবং সামাজিক আদর্শের ঘাত-প্রতিঘাতে মুসলমান জনগণ যেভাবে সাড়া দিয়েছে তারই প্রতিফলন। মুসলমান জনগণের মত হিন্দু জনগণও আরেক রকমভাবে এই সামাজিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় সাড়া দিয়েছেন। মঙ্গলকাব্যসমূহ এবং বৈষ্ণবসাহিত্যে ঘটেছে তার প্রকাশ।

এই নবসৃষ্ট সাহিত্যকর্মসমূহের লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হল, তাতে নতুন সামাজিক চাহিদার জবাব রয়েছে। জনগণ যে ধরনের রসাল কাহিনী শুনতে আগ্রহী সে ধরনের কাহিনীই লেখকরা পরিবেশন করেছেন। মুসলমান এবং হিন্দু সাহিত্যস্রষ্টারা আপনাপন সমাজের দিকে লক্ষ্য রেখেই সৃষ্টিকর্মে মনোনিবেশ করেছেন। মুসলমানদের তুলনায় হিন্দু কবিদের অনেকগুলো সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক সুযোগ বিদ্যমান ছিল। প্রথমত আক্রমণমুখী বর্ধিষ্ণু মুসলমান সমাজের সঙ্গে সংঘাতে হিন্দু সমাজের তলা পর্যন্ত কেঁপে উঠেছিল। আত্মরক্ষার প্রয়োজনটাই ছিল তাঁদের কাছে বড় কথা। হিন্দু কবিরা এই সামাজিক ভীতির সঙ্গে একাত্মবোধ না করে পারেননি। আত্মরক্ষার প্রয়োজনে যখনই কোন নতুন সামাজিক পরিবর্তন এবং নবতর মূল্যচেতনা সমাজের অভ্যন্তর থেকে সূচিত হয়েছে তার প্রাণবস্তুটি সাহিত্য-স্রষ্টাদের কণ্ঠে আপনা থেকেই কথা কয়ে উঠেছে।

আর মুসলমান শাসনামলে হিন্দুসমাজের যে সামাজিক রূপান্তর ঘটছিল তাতে সংস্কৃতিগত ব্যবধান ছিল না, নিজেদের সংস্কৃতিকে [তারা] নিজেদের প্রয়োজনে নতুনভাবে রূপদান করেছিলেন। সেখানে বিষয় এবং বিষয়ীর সঙ্গে কোন দূরত্ব বা বিরোধ [ছিল না]। সমাজের পূর্বার্জিত সামাজিক অভিজ্ঞতাসমূহকে পূর্ণ বিশ্বাসে আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে কাজে লাগাতে পেরেছিলেন [তারা]। মুসলমান পুঁথিলেখকদের তুলনায় হিন্দু কবিদের রচিত সাহিত্যকর্মে যে অধিক মানসিক পরিশ্রুতি, গঠনপারিপাট্য এবং কাণ্ডজ্ঞানের পরিচয় পাওয়া যায় তার কারণ তাঁদের সম্পূর্ণ অজানা একটি বিষয়ের প্রতি ধাবিত হতে হয়নি।

তুলনামূলক বিচারে মুসলমান পুঁথিলেখকদের হাতে সে পরিমাণ সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক সুযোগসুবিধা ছিল না। প্রথমত তাদের সম্পূর্ণ অজানা একটি বিষয়কে প্রকাশ করতে হয়েছিল। ইসলাম ধর্মের আসল স্বরূপ, তার দার্শনিক প্রতীতি ইত্যাদি সম্বন্ধে মুসলমানদের আরবি-ফারসিতে লেখা গ্রন্থসমূহের বদলে লোকশ্রুতি এবং দূরকল্পনার উপর নির্ভর করতে হয়েছে [তাঁদের]। একথাও সত্য যে পুঁথিলেখকদের অধিকাংশেরই আরবি-ফারসি সম্বন্ধে কোন জ্ঞান ছিল না। তাছাড়া হিন্দুদের দেবদেবী এবং কাব্যোক্ত নায়ক-নায়িকাদের প্রতি মনে মনে বিদ্বেষের একটি দূরস্মৃতিও সক্রিয় ছিল। কেননা এই দেবদেবী পূজারীদের অত্যাচার এবং ঘৃণা থেকে অব্যাহতি পাবার আশায় তাঁদের পূর্বপুরুষেরা প্রথমে বৌদ্ধধর্ম এবং পরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তাই মুসলমান পুঁথিলেখকেরা তাঁদের রচনায় যখনই সুযোগ পেয়েছেন এই দেবদেবীর প্রতি তাচ্ছিল্য এবং ঘৃণা প্রকাশ করতে কুণ্ঠাবোধ করেননি।

কিন্তু তা সত্ত্বেও হিন্দুসমাজের দেবদেবী, নায়ক-নায়িকার প্রভাব থেকে তাদের মন মুক্ত হতে পারেনি। তাই তাঁরা সচেতনভাবে এই দেবদেবীদের প্রতিস্পর্ধী নায়ক এবং চরিত্র যখন খাড়া করেছেন, এই সৃষ্ট চরিত্রসমূহের মধ্যেই দেব-দেবী নতুনভাবে প্রাণ পেয়েছে। হজরত মোহাম্মদ, হজরত আলি, আমির হামজা, মোহাম্মদ হানিফা, বিবি ফাতেমা, জৈগুনবিবি এই চরিত্রসমূহ বিশ্বাসে এবং আচরণে, স্বভাবে-চরিত্রে যতদূর আরবদেশীয় তার চাইতে বেশি এদেশীয়। তাঁদের মধ্যে যে বুদ্ধিমত্তা এবং হৃদয়াবেগ কাব্যলেখক চাপিয়ে দিয়েছেন তা একান্তভাবেই বঙ্গদেশে প্রচলিত দেবদেবীর অনুরূপ।

বাইরের দিক থেকে দেখলে হয়ত অতটা মনে হবে না। কিন্তু গভীরে দৃষ্টিক্ষেপ করলে তা ধরা না পড়ে যায় না। বিশ্বাস এবং অভিজ্ঞতা সাহিত্যের দুই মুখ্য উপাদান। বিশ্বাস অভিজ্ঞতার নব রূপায়নে সাহায্য করে। আলোকিত বিশ্বাস আলোকিত রূপায়ন ঘটায় এবং অন্ধবিশ্বাস অন্ধ রূপায়ন। মুসলমান পুঁথিলেখকদের বিশ্বাসের যে শক্তি তা অনেকটা অন্ধবিশ্বাস, কেননা ইসলামি জীবনবোধসমৃদ্ধ বিমূর্ত কোন ধারণা তাঁদের ছিল না। তাই তাঁদের শিল্পকর্ম অতটা অকেলাসিত। প্রতি পদে কল্পনা হোঁচট খেয়েছে বলে তাদের রচনার শক্তি নেই। আলাওল, দৌলত উজির প্রমুখ মুসলমান কবি উৎকৃষ্ট কাব্যরচনা করতে পেরেছেন। তার কারণ তাঁদের কতিপয় সুযোগ ছিল। আলাওল নিজে আরবি, ফারসি এবং সংস্কৃত সাহিত্যে সুপণ্ডিত ছিলেন। কাব্যের স্বাভাবিকতা-অস্বাভাবিকতা সম্বন্ধে তাঁর পরিপূর্ণ বোধ ছিল। তদুপরি তিনি রাজসভায় বসে কাব্য রচনা করেছিলেন। রাজসভায় যে রুচিচর্চা এবং জীবনাদর্শের আলোচনা চলতে পারে জনসভাতে তা চলে না। একই কথা দৌলত উজির সম্বন্ধেও কমবেশি প্রযোজ্য।

কিন্তু যে সকল মুসলমান কবিকে জনগণের ধর্মবোধ পরিতৃপ্তি এবং রসপিপাসা মিটাবার জন্য কলম ধরতে হয়েছিল, সেখানে কবি কি বলতে চান, কাদের জন্য বলতে চান এবং যা বলছেন তা অনুধাবণযোগ্য হচ্ছে কিনা এইসব বিবেচনার বিষয় ছিল।

 

আহমদ ছফা বিদ্যালয়, সলিমুল্লাহ খান সম্পাদিত, প্রথম বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা, অক্টোবর-নবেম্বর ২০১৪

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*