পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রক্রিয়া: কতিপয় বিবেচনা—৩

পার্বত্য চট্টগ্রামে যে সংকটটি ঘনীভূত আকার ধারণ করে একটি প্রধান জাতীয় সমস্যা হিশেবে সকলের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তার শুরু উনিশশো একাত্তর সালে। পার্বত্য অধিবাসীরা ভাষা-সংস্কৃতির দিক দিয়ে বাঙ্গালি জনগোষ্ঠির সাথে নিজেদের বিশেষ সম্পর্কিত মনে করেন না। বাঙ্গালি জনগোষ্ঠির সাথে পাশাপাশি অবস্থান করার কারণে তাদের বাঙ্গালিদের সম্পর্কে যে ধারণা জন্ম নিয়েছে সেটা বিশেষ ইতিবাচক নয়। এই রচনার প্রথম দিকে পাহাড়ি-বাঙ্গালি সম্পর্কের তিক্ততার কারণগুলো দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

বাঙ্গালি জনগোষ্ঠির একটা জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে পাহাড়ি জনগোষ্ঠি তাদের ভাগ্যোন্নয়নের কোন ইশারা খুঁজে পাননি। তাদের মনোভাব ছিল অনেকটা এ রকম: ক্ষমতায় পাকিস্তানিরা থাকুক কিংবা বাঙ্গালিরা আসুক আমাদের জন্যে তো সবাই একরকম। আমরা একইভাবে শোষিত হবো। সুতরাং আমরা কেন বাঙ্গালিদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করবো? এ রকম একটা মনোভাব পাহাড়ি জনগোষ্ঠির মনে ক্রিয়াশীল থেকেছে। যদিও এ মনোভাব সকল পাহাড়ির নয়। পাহাড়িদের একাংশ তো রীতিমতো মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন।

মুক্তিযুদ্ধের প্রতি পাহাড়ি জনগোষ্ঠির নেতিবাচক মনোভাব গ্রহণ করার পেছনে আরো একটি প্রভাব কাজ করেছে। রাঙ্গামাটির চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় ছিলেন বার্মায় অর্থাৎ বর্তমান মায়ানমারে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত। পার্বত্য জনগোষ্ঠির ওপর রাজকীয় প্রভাব পার্বত্য জনগোষ্ঠিকে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি বিদ্বেষ মনোভাব পোষণ করতে অনেকখানি সহায়তা করেছে।

মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশে যে সরকারটি ক্ষমতাসীন হয়, পাহাড়ি জনগোষ্ঠির প্রতি তাদের প্রসন্ন মনোভাব ছিল না। পাহাড়ি জনগোষ্ঠিকে মুক্তিযুদ্ধের বৈরি শক্তি মনে করে অনেকখানি সন্দেহের চোখে তাকাতো। মুখ্যত এ কারণেই বাংলাদেশের সরকার প্রধান শেখ মুজিব রাঙ্গামাটির এক জনসভায পাহাড়ি জনগোষ্ঠিকে বাঙ্গালি হয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। উনিশশো একাত্তর সালের পরে পার্বত্য চট্টগ্রামে যে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার জন্ম হয়েছে, শেখ সাহেবের এ ঘোষণা থেকেই তার সূত্রপাত। পার্বত্য জনগোষ্ঠির নেতা মানবেন্দ্র লারমা পাহাড়ি জনগোষ্ঠির কতিপয় প্রতিনিধিসহ সরকারের কাছে একটা ডেপুটেশনের মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছিলেন, তাঁদেরকে বাঙ্গালি হিশেবে চিহ্নিত করা কিছুতেই উচিত হবে না। মানবেন্দ্র লারমা দাবি করেছিলেন, পাহাড়ি জনগোষ্ঠির আলাদা একটা নৃতাত্ত্বিক জাতিতাত্ত্বিক সত্তা রয়েছে, সেটার সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিলে তাঁদের প্রতি সুবিচার করা হবে। সেদিন যদি মানবেন্দ্র লারমার দাবি মেনে নেয়া হতো পার্বত্য চট্টগ্রামের সংকট এ রকম আকার নিয়ে হয়তো দেখা দিতো না।

পার্বত্য চট্টগ্রামের সংকটের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে এখন নানান রাজনৈতিক দল নানাভাবে ব্যাখ্যাদান করতে চেষ্টা করছে। পাহাড়িরা একরকম ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। সরকার একরকম ব্যাখ্যা হাজির করছেন। বিএনপি একরকম। সকলের ব্যাখ্যার মধ্যেই প্রকৃত সত্য একরকম দুর্লভ হয়ে উঠেছে। তাঁরা আপন আপন অবস্থানের যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে চাইছেন।

ভারতের অবসরগ্রহণকারী মেজর জেনারেল জেকবের লেখা বই ‘বার্থ অব এ নেশন-সারেন্ডারে এট ঢাকা’ প্রকাশিত হয়েছে। এটা ঢাকার বাজারে এখন পাওয়া যাচ্ছে। জেকব সাহেব মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতীয় সেনাবাহিনীর আঞ্চলিক অধিনায়ক ছিলেন। তিনি তাঁর ওই গ্রন্থে স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়ার পরও শেখ সাহেবের অনুরোধে ভারতীয় সৈন্য পার্বত্য চট্টগ্রামে থেকে গিয়েছিল। জেকবের বইতে লোম দাঁড়িয়ে যাবার মতো অনেক তথ্য পাওয়া যায়। সেগুলো যদি সত্য হয়, অনেক বিষয়েই নতুন করে চিন্তা-ভাবনা করার খোরাক পাওয়া যাবে। তার একটা উল্লেখ করছি। বাংলাদেশের সকলেই একটা কথা এতোকাল সত্য বলে মনে করে আসছি। শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার থেকে লন্ডন হয়ে ঢাকা ফেরার পথে নয়াদিল্লি বিমানবন্দরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা হওয়ার পরই জিজ্ঞেস করেছিলেন, ম্যাডাম আপনি আমার দেশ থেকে কখন সৈন্য প্রত্যাহার করে নিয়ে আসতে যাচ্ছেন। কিন্তু এখন মেজর জেনারেল জেকব বলছেন ভিন্ন কথা। তাঁর ভাষ্য হলো, শেখ সাহেব ভারত সরকারকে আরো কিছুদিন বাংলাদেশে ভারতীয় সৈন্য রাখার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। ভারত একতরফাভাবে সৈন্য প্রত্যাহার করে নিয়ে গেছে। মেজর জেনারেল জেকবের বই এখন ঢাকায় পাওয়া যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ এখন ক্ষমতায়। জেকব সাহেব যদি অসত্য তথ্য পরিবেশন করে থাকেন, আওয়ামী লীগ সরকারের উচিত ছিল প্রতিবাদ করা। কিন্তু শেখ হাসিনার সরকার উচ্চবাচ্য কিছু করেন নি।

আমার বক্তব্য বিষয়ে ফিরে আসি। শেখ মুজিবের ঘোষনা, মানবেন্দ্র লারমার দাবি প্রত্যাখ্যান, ভারতীয় সৈন্যের দীর্ঘকাল উপস্থিতি পার্বত্য জনগোষ্ঠিকে আতঙ্কিত করে তোলে। তাঁরা মনে করতে আরম্ভ করেন শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার তাঁদের প্রতি সংশয় এবং অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। এ ধরনের পরিবেশ পরিস্থিতিতে চরমপন্থী নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের নেতা এবং কর্মীরা বাস করতে থাকেন পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগোষ্ঠির মধ্যে।

গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার একটি পরিবেশ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সর্বহারা পার্টির প্রয়াত নেতা সিরাজ সিকদার পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের ব্যাপক গেরিলা সংগ্রামে নিয়ে আসার সম্ভাবনা আবিষ্কার করে উদ্দীপ্ত হয়ে উঠেছিলেন। এ কথা তাঁর কবিতার বই ‘জনযুদ্ধের পটভূমিতে’ অপূর্ব কাব্যিক ভাষার প্রকাশ করেছেন। সর্বহারা পার্টির কর্মীরাই প্রথম পার্বত্য জনগোষ্ঠির তরুণদের আগ্নেয়াস্ত্র চালানোর দীক্ষাদান করে। সে সময়ে সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামে চীনপন্থী রাজনীতির একটা জোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল। পার্বত্য জনগোষ্ঠির নেতারা নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্যে যে সমস্ত রাজনৈতিক দল সশস্ত্র সংগ্রামে বিশ্বাস করে সেগুলের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করতেন, প্রয়োজনবোধে সেগুলোতে যোগ দিতেও কৃণ্ঠাবোধ করতেন না। সমগ্র বাংলাদেশের নির্যাতিত জনগোষ্ঠির সাথে তাদের স্বার্থ অবিচ্ছিন্ন, একথা সকলে না হলেও অনেকেই বিশ্বাস করতেন।

শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ায় ক্ষমতার যে পালাবদল ঘটে তা পার্বত্য জনগোষ্ঠির মানসিক ভীতি অনেক গুণে বাড়িয়ে তোলে। সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সমাজতন্ত্র শব্দ দুটো ছেঁটে দেয়া হয়। বাংলাদেশ সৃষ্টি হওয়ার পর পাহাড়ি জনগোষ্ঠি প্রথমবার হোঁচট খায় বাঙ্গালি বনে যাওয়ার ঘোষণা শুনে। তিন বছরের মাথায় তাঁদের শুনতে হলো সংবিধান থেকে সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা কাটা পড়ে গেছে। পাহাড়ি জনগোষ্ঠির প্রগতিশীল নেতৃবৃন্দ পূর্বে যেভাবে নির্যাতিত বাঙ্গালি জনগোষ্ঠির সংগ্রামের সাথে তাদের সংগ্রাম অবিচ্ছিন্ন মনে করতেন, সেই জিনিসটিতে ছেদ পড়ে যায়। বিচ্ছিন্নতাবাদী চিন্তাচেতনা, তাঁদের মধ্যে প্রসার লাভ করতে থাকে। এ পরিস্থিতিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতিতে একটা গুণগত পরিবর্তন ঘটে যায়। এতোকাল যাবত পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতিতে চীনপন্থীদের প্রাধান্য ছিল এবং তাঁদের সাথে বাংলাদেশের প্রগতিশীল রাজনীতির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।

উনিশশো পঁচাত্তর সালে শেখ মুজিব নিহত হওয়ার পরে ভারতের শাসকেরা খুব সম্ভবতো আশা করেছিলেন, বাংলাদেশের জনগণ উনিশশো একাত্তর সালের মতো মুজিব হত্যার প্রতিবাদে আরেকবার বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠবে। এ ধরনের চিন্তার বশবর্তী হয়ে ভারত মুজিবের অনুসারী কিছু রাজনৈতিক কর্মী এবং কবি, সাহিত্যিকদের একাংশকে ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করতে উদ্ভুদ্ধ করেছিল। এই সময়টিতেই ভারতীয় শাসকেরা পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের সম্পর্কে মনোযোগী হয়ে ওঠেন। তার নগদ ফল এই দাঁড়ালো যে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতি চিনপন্থী এবং ভারতপন্থী ওই দুই ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়ে। এই দুই ধারার কর্মীদের প্রত্যক্ষ সংঘর্ষের কারণেই পার্বত্য চট্টগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা মানবেন্দ্র লারমাকে প্রতিদ্বন্দ্বী দলের লোকদের হাতে প্রাণ দিতে হয়।

মানবেন্দ্র লারমার মৃত্যুর পর বিচ্ছিন্নতাবাদী ধারাটিই প্রবল হয়ে ওঠে। তাঁরা সশস্ত্র সংগ্রামের পথ গ্রহণ করেন এবং ভারতে আশ্রয় নেন। সশস্ত্র পার্বত্য অঞ্চলে তৃণমূল পর্যন্ত সংগঠনের বিস্তৃতি ঘটান। দেশ-বিদেশে তাঁদের সংগ্রামের পরিচয় তুলে ধরার জন্যে শক্তিশালী যোগাযোগ কেন্দ্র স্থাপন করেন। ভারত প্রতিটি পর্যায়ে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে তাদের সহায়তাদান করেছে। সংক্ষেপে এটাই হলো পার্বত্য জনগোষ্ঠির সংগ্রামের ভেতরের কথা।

২২ নবেম্বর ১৯৯৭

 

শান্তি চুক্তি ও নির্বাচিত নিবন্ধ (ঢাকা: ইনফো পাবলিকেশনস্, ১৯৯৮)।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*